‘সফল হতে হলে মানসিকভাবে শক্ত হওয়া চাই’

‘সফল হতে হলে মানসিকভাবে শক্ত হওয়া চাই’

ফাহমিদা তাপসী
মাশরুনা এ. চৌধুরী
মাশরুনা এ. চৌধুরী

কথা ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু মাশরুনা এ. চৌধুরী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) চিফ ফিন্যান্স অফিসার (সিএফও) হিসেবে কিছু বুঝে ওঠার আগে থেকেই ‘বড় হয়ে ডাক্তার হব’ এমন ভাবনাই গেঁথেছিল ছোট্ট মেয়েটির মনে। আর হবেইবা না কেন, ডাক্তার বাবাকে দেখে সে পেশার প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে মা ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। সে প্রভাবও ছিল ছোটবেলার চাওয়ায়। মুখে প্রকাশ না করলেও বোনদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে শিক্ষক শিক্ষক খেলাটাই তার বেশি প্রিয় ছিল। মোদ্দাকথা মা-বাবা দুজনের পেশা বেশ গাঢ় প্রভাব ফেলেছিল পরিবারের সবার ছোট মেয়েটির মনে। তবে বিধি বাম। ডাক্তার হিসেবে নয়, বরং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) চিফ ফিন্যান্স অফিসার (সিএফও) হিসেবে। বলছিলাম মাশরুনা এ. চৌধুরীর কথা। আজকের আয়োজনে থাকছে চার্টার্ড অ্যাকাউট্যান্ট এবং বিআইএফএফএলের সিএফও এ নারীর সঙ্গে কথোপকথনের চুম্বক অংশ—

ছোটবেলায় যে লক্ষ্যে পৌঁছতে চেয়েছেন, সেখানে কি পৌঁছতে পেরেছেন?

সে সময় কিছুই বুঝতাম না, কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলতাম বড় হয়ে ডাক্তার হব। অথচ মজার বিষয় হচ্ছে, ডাক্তার বাবার স্টেথোস্কোপ নিয়ে যতটা না খেলেছি, তার চেয়ে বেশি খেলেছি টিচার টিচার খেলা। তাই বলা যায় শিক্ষিকাও হয়তো হতে চাইতাম। এ দুই পেশার কোনোটাই বেছে নিতে পারিনি পরবর্তীতে, তবে দুটো পেশার সঙ্গেই বর্তমান অবস্থানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম মানুষের সেবা করব বলে। বর্তমানে যে পেশায় যুক্ত রয়েছি, সে পেশায় থেকে কিন্তু সাধারণের সেবাই করছি। অন্যদিকে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছি আইসিএবিতে। সব মিলে বলা যায় ছোটবেলায় দেখা স্বপ্ন সরাসরি ছুঁতে না পারলেও একেবারেই পারিনি, বিষয়টি তা নয়।

বিআইএফএফএলে আপনার কাজের ক্ষেত্র নিয়ে যদি বলেন—

২০১৬ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেডে যোগদান করি। এখানে নারী চিফ ফিন্যান্স অফিসার হিসেবে আমিই প্রথম। অ্যাকাউন্টস এবং ফিন্যান্স পুরো বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছি। এ প্রতিষ্ঠানে এর আগে একজনই সিএফও ছিলেন। তিনি বেশিদিন কাজ করেননি বিধায় নতুনভাবেই সব কিছু শুরু করতে হয়েছে।

আপনার মতে বাজেটের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ কী?

আগে থেকে অনুমান করা বা ফোকাস টার্গেট করা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে। কেননা এটা আগে থেকে কিন্তু বোঝা মুশকিল কারা আমাদের গ্রাহক হবেন।

কর্মক্ষেত্রে কীভাবে অন্যদের সহযোগিতা এবং স্বাধীন চিন্তার ভারসাম্য রক্ষা করে থাকেন?

আমাদের কাজটিই হচ্ছে দলবদ্ধ হয়ে করার। আমি সে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছি শুধু। সেদিক থেকে পুরো দলের সহযোগিতা না থাকলে আমার কাজ সম্পন্ন করা কঠিন। সহকর্মীদের সহযোগিতা রয়েছে বলেই হয়তো কাজ করা সহজ হচ্ছে। অন্যদিকে আমি কীভাবে চাচ্ছি, সে বিষয়টি আমার নিম্নপদস্থদের বুঝিয়ে দেয়া কিন্তু আমার দায়িত্ব। একজন সিএফও হিসেবে আমি সে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করি।

প্রাপ্তির খাতায় যা আছে—

প্রতি বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে হয় আইসিএবিতে। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া সেসব প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে একটি ক্রম তৈরি করে। বিআইএফএফএলে যোগদানের পর প্রথমবারের মতো আর্থিক প্রতিবেদন আইসিএবিতে জমা দিই এবং আইসিবিতে পাবলিক সেক্টরে তৃতীয় স্থান অর্জন করি আমরা। এটা বিআইএফএফএলের ইতিহাসে প্রথম। এখানেই শেষ নয়, আমাদের সে বার্ষিক প্রতিবেদনটি কিন্তু আইসিএবি সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস সংক্ষেপে সাফাতেও পাঠিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করা বার্ষিক প্রতিবেদন জমা হয় সেখানে। সেখান থেকে বাছাইকৃতদের অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। তবে আইসিএবি থেকে সাফা অ্যাওয়ার্ডে পাঠানোর আগে আরো একটি বাছাই প্রক্রিয়া চলে। সেখানে পুনরায় আমাদের প্রতিবেদনটি বাছাই করা হয়। এবং আমরা সাফা বিপিএ অ্যাওয়ার্ডে ২০১৬ সার্টিফিকেট অব মেরিট তকমা জিতে নিই।

প্রতিষ্ঠানের চিফ ফিন্যান্স অফিসার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহীদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

আমার জানা মতে, পুরো বাংলাদেশে নারী চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার হিসেবে রয়েছেন দুজন। যারা সিএফও হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তাদেরকে বলব প্রচণ্ড পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকতে হবে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি নিয়ে যারা পড়েন, তাদের প্রচুর পড়াশোনা করে উত্তীর্ণ হতে হয়। সেদিক থেকে বলা যায়, সফল হতে হলে মানসিকভাবে শক্ত হওয়া চাই, ধৈর্য থাকা চাই।

অবসর কাটে কীভাবে?

যান্ত্রিক জীবনে ব্যস্ততার পাল্লাই ভারী। অবসর নেই বললেই চলে। পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসি। এছাড়া প্রাকৃতিক বিষয়গুলো আমাকে খুব টানে। তাই বাসার বারান্দায় বাগান করা আমার শখ। সময় পেলেই সেখানেই ঢেলে দেই পুরোটা সময়। এছাড়া গান গাই কখনো কখনো। আমার মা বাংলাদেশ বেতারে টানা ২০ বছর সেতার বাজিয়েছেন। ফলে আমাদের চার বোনের সবাই মোটামুটি গানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অবসর পেলে গানের চর্চা চালিয়ে যেতে ভালো লাগে।