ব্যাংকিং খাতে সিএসআর ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক

ব্যাংকিং খাতে সিএসআর ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক

ব্যাংকিং খাতে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাংকগুলো সিএসআর বাবদ ব্যয় করেছে ৬২৭ কোটি টাকা, যা এর আগের ছয় মাসে ছিল ৪১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত ছয় মাসে ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় বেড়েছে ২১০ কোটি টাকা।

৬ মাসে ৬০০ কোটি টাকার অধিক সিএসআরের নামে লুটপাট হয়েছে। নির্বাচনী বছর হওয়ায় যত্রতত্র ব্যয় বাড়ছে। এ ব্যয় অস্বাভাবিক। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন ব্যাংকের অর্ধশতাধিক পরিচালক ও চেয়ারম্যান অংশ নিচ্ছেন। তাই প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের ব্যাংকের সিএসআরের অর্থ নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় প্রচার কাজে খরচ করছেন তারা। 

হঠাৎ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খরচের খাত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ টাকার অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি উঠেছে। সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, সংস্কৃতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, আয়বর্ধক কর্মসূচি ও অন্যান্য খাতে সিএসআরের অর্থ ব্যয় করা হয়। কিন্তু এবার নির্বাচনী বছর হওয়ায় মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে সন্দেহ-সংশয় বাড়ছে।

এব্যাপারে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের অনেক চেয়ারম্যান এবং পরিচালক সিএসআরের অর্থ নির্বাচনী প্রচারে ব্যায় করছেন। কারণ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন ব্যাংকের অর্ধশতাধিক পরিচালক ও চেয়ারম্যান অংশ নিচ্ছেন। তাই প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের ব্যাংকের সিএসআরের অর্থ নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় প্রচার কাজে খরচ করছেন তারা।

এব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সিএসআর খাতে ব্যয় বেশি হলে ক্ষতি নেই। তবে খতিয়ে দেখতে হবে এর কোনো অপব্যবহার হয় কি না। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে দেখতে পারে।

একটি ব্যাংকের সাবেক এক এমডি জানান, সিএসআরের নামে লুটপাট হয়েছে। আমার দীর্ঘ এমডি জীবনে ৬ মাসে ৬০০ কোটি টাকার অধিক সিএসআর ব্যয় দেখিনি। নির্বাচনী বছর হওয়ায় যত্রতত্র ব্যয় বাড়ছে। এ ব্যয় অস্বাভাবিক। প্রতিটি ব্যয় নিয়ম মেনে হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক অস্বাভাবিকভাবে সিএসআরের অর্থ ব্যয় করেছে। ব্যাংকটি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যয় করেছে ২৭৫ কোটি টাকা। এর আগের ছয় মাসে এ ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় ছিল মাত্র ৪৭ কোটি টাকা।

অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটির সিএসআর ব্যয় বেড়েছে ২২৮ কোটি টাকা। একইভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকেও হঠাৎ সিএসআরের ব্যয় বেড়ে গেছে। গত ছয় মাসে ব্যাংকটি ১ কোটি ১১ লাখ টাকা সিএসআর বাবদ ব্যয় করেছে, যা রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংক এভাবে ব্যয় করেনি। এমন কি জনতা ব্যাংকেও এর আগের ছয় মাসে সিএসআরে ব্যয় ছিল মাত্র ৫ লাখ টাকা। ব্যাংকটির সিএসআরের টাকা নির্বাচনী প্রচারণায় খরচের অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, অস্বাভাবিকভাবে সিএসআর ব্যয়ের তালিকায় ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬ কোটি ২৯ লাখ থেকে বেড়ে ২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, নতুন একটি ব্যাংকে ২ কোটি ২৪ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ৯ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকে ১১ কোটি ৪০ লাখ থেকে বেড়ে ১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা, এবি ব্যাংকে ৯ কোটি ৫ লাখ থেকে বেড়ে ১৩ কোটি ৯ লাখ টাকা, যমুনা ব্যাংকে ৮ কোটি ৯১ লাখ থেকে বেড়ে ১২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ২ কোটি ৬৫ লাখ থেকে বেড়ে ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ৯ কোটি ৬৭ লাখ থেকে বেড়ে ১০ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং এক্সিম ব্যাংকে সিএসআর ব্যয় ২৫ কোটি ২৭ লাখ থেকে বেড়ে ৩৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা হয়েছে। এছাড়া দুটি ইসলামী ব্যাংকে যথাক্রমে ৩ কোটি ৮৯ লাখ থেকে বেড়ে ১১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং ১২ কোটি ৩৩ লাখ থেকে ২১ কোটি ১০ লাখ টাকা সিএসআর ব্যয় হয়েছে। এর বাইরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় ৪২ কোটি ২৭ লাখ থেকে বেড়ে ৪৯ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং এনসিসি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় ৮ কোটি ৮৭ লাখ থেকে বেড়ে ৯ কোটি ৬ লাখ টাকা হয়েছে।

উল্লেখ্য, সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলোর মোট ব্যয়ের অন্তত ৩০ শতাংশ শিক্ষা ও ২০ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এবার অধিকাংশ ব্যাংক তা মানেনি। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ছয় মাসে নিয়ম মেনে শিক্ষায় ব্যয় করেছে মাত্র ৮ ব্যাংক। আর স্বাস্থ্য খাতে খরচের নিয়মের মধ্যে রয়েছে ৫ ব্যাংক। যদিও ২০১৭ সালের একই সময়ের তুলনায় এবার সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলো প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় করেছে।

কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি বা কোম্পানীর সামাজিক দ্বায়বদ্ধতা  হচ্ছে নৈতিক এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণের অংশ যা রাষ্ট্রের উন্নয়ন চাহিদা পূরণের মাধ্যমে সমাজে বৃহত্তর মঙ্গল সাধন করে। 

ব্যবসায় সামাজিক দায়বদ্ধতা

চাই সমন্বিত নীতিমালা

জামাল উদ্দীন

যে সমাজে ব্যবসায়ীরা পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করে—সে সমাজের প্রতি তথা ভোক্তা/ক্রেতার প্রতি ঐ কোম্পানিরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যদিও ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সর্বোচ্চ মুনাফা করা। কিন্তু যে শ্রেণিকে পণ্য কিংবা সেবা দিয়ে মুনাফা করছে—সেই বিশাল জনগোষ্ঠী যদি সামর্থ্যহীন হয়ে পড়ে—তবে ভবিষ্যত্ মুনাফা এমনকি ব্যবসাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। মানে ক্রেতা/ভোক্তাদের কিছু সুবিধা দিতে হবে। সেটা হতে পারে তার স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য, শিক্ষার জন্য, কিংবা কোনো অবকাঠামো উন্নয়নেও কোম্পানি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তাতে কোম্পানির ব্যাপক প্রচারের সুযোগ হয়। ক্রেতা ভোক্তাদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়। একটি সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। আধুনিক সিইওরা এটাকে দেখছেন ব্যবসা প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে। যেহেতু তার লক্ষ্যই হচ্ছে মুনাফা করা। অ্যাডাম স্মিথ যেমন বলেছিলেন, ভোক্তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ব্যতীত ব্যবসায়ীরা একত্রিত হতে পারে না। এক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র বলতে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে বুঝিয়েছেন তিনি। বর্তমানে কোম্পানিগুলো সিএসআরকে (করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি) দেখছে তাদের ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসাবে। এখাতে বিনিয়োগের চেয়ে বরং রিটার্নই বেশি।

আরেকটি ধারণা রয়েছে যে, কোনো কোম্পানি আস্থা অর্জন করতে পারছে না। আস্থা এমন এক বিষয় যা অর্জিত না হলে যত ভাল পণ্য বা সেবা বাজারে ছাড়ুক না কেন, ক্রেতারা নেবে না। ক্রেতাদের এই আস্থা অর্জনের জন্যও উন্নত বিশ্বে কর্পোরেট হাউজগুলো কিছু ভাল কাজে অর্থ ব্যয় করে। এতে জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে তার ইমেজ বৃদ্ধি করে। নৈতিকতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের জন্য পণ্য/সেবা দেয়া হচ্ছে, সেই জনগোষ্ঠী যদি সুস্থ না থাকে, কিংবা তাদের উত্পাদনশীলতা কমে যায়, তাহলে তাদের আয় কমে যাবে। তখন প্রত্যাশিত হারে পণ্য বা সেবা গ্রহণ করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে কোম্পানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বরং ক্রেতাগোষ্ঠীর জন্য মুনাফার কিয়দংশ ব্যয় করে ভালবাসার যোগ্য হয়ে উঠার সুযোগ তৈরির কৌশল গ্রহণ করা যায়। ক্রেতা তখন সহজে ঐ পণ্যে বিমুখ হয় না।

অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি মঙ্গলজনক হয়েছে। যেখানে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শৈথিল্য, কিংবা সমাজের অনেক প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অর্থায়ন সরকারের পক্ষে সম্ভব হয় না—সেখানে সিএসআর কার্যক্রমের মাধ্যমে সামাজিক চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়। সামাজিক অংশীদারিত্বের এই মডেল ভারসাম্য পরিবেশ গড়তেও সহায়ক হয়। ‘এটি এমন এক ব্যবসায়িক পন্থা যা সকল স্টেকহোল্ডারের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সুবিধাদি প্রদান করে টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখে’।

সিএসআরের সঙ্গে হাল-আমলে নতুন ধারণার জন্ম হয়েছে। তা হচ্ছে সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ইনভেস্টিং বা সামাজিক দায়বদ্ধতা বিনিয়োগ। সেটা বাংলাদেশ পর্যন্ত আসতে সময় লাগতে পারে।

সিএসআরের এই আলোচনা মূলত ব্যবসাকে টেকসই করার জন্যই। এখানেও সূক্ষ্ম ফারাক রয়েছে। মূল পার্থক্যটা হচ্ছে- সিএসআর একটি কোম্পানি সামাজিক অগ্রগতিতে কী অবদান রেখেছে তা যাচাই করা। অন্যদিকে, সাসটেইনেবিলিটি, সামনের নতুন নতুন বাজার তৈরি এবং ব্র্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যত্ নিরাপত্তার জন্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনাই এর মূল বিষয়। যে কারণে উন্নত বিশ্বে আগে থেকেই সিএসআর প্রথা চালু রয়েছে।

আমাদের এখানে অনেকেই ফিলানথ্রপি বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টেনে বলেন, সিএসআর বাংলাদেশে কোনো নতুন ধারণা নয়। ব্যবসা ও ব্যবসায়ীরা সবসময়ই সমাজে অনুদান, স্কুল, হাসপাতাল, সেতু নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার মাধ্যমে তাদের সুনাম সৃষ্টি করতে চায়। যদিও এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে করা হয় না। সে কারণে এই ধারণার বিপক্ষ মতও রয়েছে। এই শ্রেণি আবার ফিলানথ্রপিকে সিএসআরের মধ্যে গণ্য করেন না। তবে বাংলাদেশে সিএসআর কার্যক্রম দেরিতে হলেও হচ্ছে। কোম্পানিগুলো নিজেদের স্বার্থে কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। পুরোপুরি সমাজভিত্তিক না করে তারা কোম্পানির দায়বদ্ধতা মেনে সংশ্লিষ্টদের শুধু সেবা দিতে চায়। অন্যদিকে, আইনি চাপে কোম্পানিগুলো সিএসআরে অর্থ খরচ করে থাকে।

দেশে সিএসআরকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান দেখা যায় তৈরি পোশাক শিল্পে, যা মূলত ক্রেতাদের চাপে হয়ে থাকে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নিয়ম-নীতির কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনা করে।

একথা সত্য যে বাংলাদেশে এখন কোম্পানিগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছে। এই অংশগ্রহণ বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এটারও একটা ব্যয় আছে। আবার না করারও ব্যয় আছে। এখন প্রশ্ন হলো কোম্পানির লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা করা। তাহলে সিএসআর করলে কী পরিমাণ ব্যয় করবে, তাদের মুনাফার কত অংশ হতে পারে, সেটা স্পষ্ট নয়।

আগেই বলেছি, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে মুনাফার জন্য। তারা সিএসআর করবে কেন? আবার অনেকেই বলছেন এটা ব্যবসার অংশ। আবার ইথিকেল বা নৈতিকতার বিষয়টিও এখানে আসে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনৈতিক কাজ করবে সেটাও বাঞ্ছনীয় নয়। সেজন্য আজকের ম্যানেজাররা এ বিষয়ে সচেতন। সেক্ষেত্রে দেখা যায় যারা প্রতিযোগিতায় আছেন, তারাই সিএসআর কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এটা যদি পার্ট অব বিজনেস হয় তবে সবার করা উচিত। আমরা নির্দিষ্ট করে বলতে চাই না। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে রেগুলেটরি চাপে সিএসআরে ব্যয় হচ্ছে। তবে এই ব্যয়র স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক সময় সময় গাইডলাইন জারি করেছে। কিন্তু যারা সরাসরি কোনো সংস্থার অধীনস্থ নয়, তাদের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। জেনারেলি, অনেক ক্ষেত্রে লিগ্যাল কমপ্লায়েন্স নেই, কমিউনিটির চাপও নেই।

২০১৫ সালে ব্যাংকগুলো ৫২৮ কোটি টাকা সিএসআরের নামে ব্যয় করেছে। ২০১৬ সালে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৫১০ কোটি টাকা।

আগেই বলেছি, সিএসআরের অর্থ ব্যয় নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সবাই জানেন, জনতা ব্যাংকের সিএসআর কার্যক্রম নিয়ে অর্থমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে তত্কালীন চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রীর নানা মন্তব্য আমরা পেয়েছি। যদিও জনতা ব্যাংক একটি বই আকারে তার প্রদেয় অর্থের হিসাব প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন ছিল—একজনকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দিলাম— সেটা কি সিএসআর হবে?

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২৩ জুন ২০১৫ সালে এক সার্কুলারে শুদ্ধাচার ও দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক প্রচার কার্যক্রমে ব্যয়কে সিএসআরের ব্যয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সিএসআরের ব্যয় নিয়ে প্রতি ছয় মাস অন্তর বাংলাদেশ ব্যাংককে রিপোর্ট করতে হয়। একটি বিভাগও এখানে খোলা হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে আপডেট করা সিএসআর গাইডলাইনে যে বিষয়গুলো রয়েছে তা হলো— স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সবুজায়ন উদ্যোগে অর্থ ব্যয়, জরুরি দুর্যোগকালীন ত্রাণ, পরিবেশগত খাপ খাওয়ানোর উদ্যোগ ও সুবিধা বঞ্চিতদের জন্য শৈল্পিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, খেলাধূলা ও বিনোদন সুবিধাও সিএসআরের অন্তর্ভুক্ত।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পৃথক ইউনিট গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এখন মনিটরিংয়ে জোর দেওয়া দরকার। এছাড়া, সিএসআরের জন্য কর রেয়াত সুবিধাও রয়েছে। সেখানে সত্যিকারের সিএসআর করে কর রেয়াত নেওয়া হচ্ছে, নাকি সিএসআরের ব্যয় দেখিয়ে কর রেয়াত সুবিধা নেওয়া হচ্ছে— সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি।

সিএসআরের জন্য সমাজের অন্য পেশার লোকদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। যেমন শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এখানে ভূমিকা রাখতে পারেন।

শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন। নৈতিকতা, মুনাফা ও আইনের সামঞ্জস্য রক্ষার আলোচনা তিনি শ্রেণিকক্ষে করতে পারেন। এখান থেকেই ভবিষ্যতের সিইওরা কর্মক্ষেত্রে তা প্রতিপালন করতে পারবেন। ক্লাসরুম থেকেই একটি জেনারেশন গড়ে তোলা সম্ভব— যারা কর্মজীবনে এর চর্চা করবে।

অন্যদিকে, মানুষেরা যখন ভাবে, ব্যবসায়ীরা শুধু মুনাফায় ব্যস্ত, তখন এধরনের নেতিবাচক মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যবসায়ী নেতাদেরও করণীয় রয়েছে। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে এ সত্যিটা অনুধাবন করতে হবে। ব্যবসায়ীরা মূল্যবোধ ও নৈতিকতায় গুরুত্ব দিতে পারেন, নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন করতে পারেন, কমপ্লায়েন্স মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করতে পারেন ও কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান করতে পারেন ইত্যাদি।

মিডিয়ার ভূমিকা বরাবরই এখানে উল্লেখযোগ্য। মিডিয়ায় এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে। সিএসআরের অর্থ খরচে অনিয়মের যে বিষয়টি আসছে, মিডিয়া সেখানে অনুসন্ধান করতে পারে। রেগুলেটরি বডির ওপর এক ধরনের চাপ প্রয়োগ কিংবা নীতি প্রণয়নে সহায়ক ভূমিকায় মিডিয়া অবতীর্ণ হতে পারে। আবার যেসব করপোরেশন ভালো করছে, তাদের নিয়ে ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করা যেতে পারে। তাতে অন্যরা উত্সাহিত হবে। আর যারা সিএসআর কার্যক্রম এখনো চালু করছে না, তাদের সমস্যাদিও সামনে আনতে পারে মিডিয়া।

একদিকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, অন্যদিকে ব্যবসার মুনাফার কিছু অংশ ব্যয় করে সমাজের উন্নয়ন ঘটানোই যখন সিএসআরের উদ্দেশ্য, তখন এর ব্যয় কাঠামোর স্বচ্ছতার জন্য নীতিমালাও জরুরি। আরো কিছু খাত চিহ্নিত করে ব্যয়ের আওতা বাড়াতে হবে। যা টেকসই উন্নয়নের জন্যও সহায়ক হয়।

বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে। এমডিজি অর্জনে যেমন সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ, তেমনি এসডিজি অর্জনেও সফল হতে পারবে যদি সিএসআর খাত থেকে গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থব্যয় করা হয়। এবং সেটি হতে হবে কার্যকর ব্যয়। তাই জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত নীতিমালা থাকলে উন্নয়ন কাঠামোয় সিএসআরের অর্থ ব্যয় সার্থক হবে।

পরিশেষে বলতে হয়—যেহেতু ব্যবসা সমাজের জন্য, তাই সমাজকে বাদ দিয়ে কোম্পানি টিকে থাকতে পারবে না। তাই কোম্পানিগুলোকে এই বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে। আইনী কাঠামো জোরালো করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে।

ব্যবসা পরিচালনায় ম্যানেজারদের নৈতিক হতে হবে। শ্রম অধিকার, শ্রমিকদের সুবিধা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের টিকে থাকার জন্যও সিএসআর খাতের অর্থায়ন দরকার। সর্বোপরি, শুধু অর্থ খরচ করলেই হবে না, যে খাতে সিএসআরের অর্থ ব্যয় করা হবে তার রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা ধারাবাহিকতা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। আরো গুরুত্ব দিতে হবে সিএসআর রিপোর্টিংকে। যদি আইনী কাঠামো করা যায় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে আনা যায়— তবে ঐ সংস্থার কাছে ত্রৈমাসিক কিংবা ষান্মাসিক হারে রিপোর্টিং করার ব্যবস্থা করতে হবে। যা এখন শুধু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি কিংবা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

(১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত সিএসআর বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে পঠিত মূল প্রবন্ধের সার-সংক্ষেপ)।

n লেখক :সাংবাদিক