নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে শেখ হাসিনা!

নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে শেখ হাসিনা!

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে যোগ দিতে গত রবিবার নিউইয়র্কে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিউইয়র্কে আসার দিন থেকে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। প্রথম দিনই তিনি নিউইয়র্কে প্রবাসীদের দেওয়া নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেন। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের সংবর্ধনায় প্রবাসীদের যে কোনো সময়ের উপস্থিতির রেকর্ড ভেঙেছে। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ছাড়াও সাধারণ প্রবাসীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত।

এরপর স্থানীয় সময় সোমবার খুব সকাল থেকে নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একদিনেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যর্থনাসহ জাতিসংঘের ৬টি গুরুত্বপূণ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। এসব কর্মসূচিতে উপস্থিত বিশ্বনেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয়দানের ঘটনায় বিশ্বনেতারা শেখ হাসিনার মহানুভবতার ব্যাপক প্রশংসা করেন।

স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যর্থনায় যোগ দেন। জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদানকারী বিশ্বনেতাদের সম্মানে নিউইয়র্কের অভিজাত প্যালেস হোটেলে এই অভ্যর্থনার আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সোমবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘ইনভেস্টমেন্ট ফর এডুকেশন অব উইমেন অ্যান্ড গার্ল’ শীর্ষক এক আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর উদ্যোগে আয়োজিত এই গোলটেবিল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে তিনটি প্রস্তাব দেন। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে সহায়তা দিচ্ছে এজন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আশ্রয় দেওয়া রোহিঙ্গাদের, বিশেষ করে শিশুদের মানসিক আঘাত লাঘবে এবং সামাজিক প্রয়োজন মেটানোর ওপর জোর দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, সংঘাত ও জাতিগত নিধন থেকে পালিয়ে যাওয়া শিশুরা সাধারণ স্কুলে খাপ খাইয়ে নিতে সমস্যায় পড়তে পারে। তাই তাদের জন্য অনানুষ্ঠানিক এবং দৈনন্দিন জীবনের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এছাড়া বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শিশুরা এখন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে বসবাস করছে। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, জাতিসত্বা এবং ভাষা অনুযায়ী এই শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা শিশুদের বিষয়ে মানবিক মূল্যবোধের বিষয়টি বক্তব্যে গুরুত্ব পাওয়ায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান। এ সময় তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের বিষয়ে শেখ হাসিনার মহানুভবতার কথা উল্লেখ করেন। জাস্টিন ট্রুডো বলেন, কানাডা সরকারও সাধ্যমত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং দিচ্ছে। অন্য দেশগুলোকেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরেন।

সোমবার সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘শরণার্থী বিষয়ক বৈশ্বিক প্রভাবের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক : এ মডেল ফর গ্রেটার সলিডারিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন’ শীর্ষক এক বৈঠকে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে তিন দফা সুপারিশ তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা উল্লেখ করেন, যা বিশ্বনেতাদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। বিশ্বনেতৃবন্দ ব্যাপক করতালির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন জানান।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক মন্ত্রী জেরেমি হান্ট সোমবার নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাতেও গুরুত্ব পায় রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের বিষয়ে শেখ হাসিনার মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন ব্রিটিশ মন্ত্রী। তিনি এসময় রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে সমস্যা কোথায় তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান।

সোমবার জাতিসংঘের সদর দপ্তরে নেলসন ম্যান্ডেলা শান্তি সম্মেলনে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সম্মেলনে তিনি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ সময় তিনি স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী শান্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ বলেও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন অংশে জীবন রক্ষা করছে। শেখ হাসিনা বিশ্বের অন্যতম মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে স্মরণ করে বলেন, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও আমাদেরকে নিপীড়ন থেকে মুক্তি দিয়েছেন এবং আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য উপস্থিত বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। তাদের অনেকেই টেবিল চাপড়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে অভিনন্দিত করেন।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের একটি সূত্র জানায়, অন্যবারের চেয়ে এ বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘ সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্ববাসীর কাছে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি গভীরভাবে তুলে ধরছেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের পর তাদের বাসস্থান, খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রতি সরকার যে মানবিক নজর দিচ্ছে সে বিষয়টিও উল্লেখ করছেন প্রধানমন্ত্রী। একইভাবে বিশ্বনেতারা তাদের বক্তব্যেী ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনা যে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন তার প্রশংসা করে বাংলাদেশকে সবরকম সহায়তার আশ্বাস দিচ্ছেন।

সূত্র জানায়, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে দিতে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন। গত বছর ৭২তম অধিবেশনেও প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশ্বনেতাদের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। এরপর জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসে।