৩২ ধারা বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ – খোলা চিঠি

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চিঠি

৩২ সংখ্যাটিকে কলুষিত করবেন না

সৈকত হাবিব

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

বড় বেদনা নিয়ে এই চিঠি লিখতে বাধ্য হচ্ছি। এ নিয়ে আপনার কাছে লিখতে হবে কখনো দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি! বহুদিন ধরেই কথাটি কানে আসছিল যে, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (২০১৮)’ নামে একটি আইন হতে যাচ্ছে, যার অনেক ধারা কেবল গণঅধিকারবিরোধীই নয়, কিছু কিছু রীতিমতো কালাকানুনের পর্যায়ে পড়ে।

এর মধ্যে ৩২ নম্বর ধারাটি নিয়ে অনেককেই রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত হতে দেখেছি। বিষয়টি তলিয়ে দেখার পর এই আতঙ্ক আমাকেও প্রবলভাবে পেয়ে বসেছে। যেহেতু দল-প্রশাসন-ক্ষমতাসম্পর্কের বাইরে সাধারণ এক নাগরিক আমি, তাই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের চৌকাঠ মাড়ানো আমার সাধ্যের বাইরে। সে জন্যই দল ও আপনার সঙ্গে দূর-সম্পর্কিত বিভিন্নজনকে বলার চেষ্টা করেছি, এটা কী করে সম্ভব যে বঙ্গবন্ধুকন্যা আপনি, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জীবনের সবচে সোনালি দিনগুলো কাটানো আর জাতির জীবনের সবচে বড় অর্জন আর ট্র্যাজেডিস্থল ৩২ নম্বর সংখ্যাটিকে এভাবে ব্যবহৃত হতে দিচ্ছেন! তারা নিজেরাও অনেকেই বিস্মিত হয়ে বলেছেন, আরে তাই তো, এভাবে তো জিনিসটি মাথায় আসেনি! কেউ কেউ বলেছেন, সম্ভব হলে বিষয়টি আপনার কানে পৌঁছাবেন। সম্ভবত তারা আপনার কাছে পৌঁছুতে পারেননি।

সেদিন সংসদে যখন এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল, আপনিও উপস্থিত ছিলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-মহোদয়রা ও আপনি সবাই উজ্জ্বল ও সহাস্য, টেলিভিশনে দেখেছি। আর ভেতরে ভেতরে গুমড়ে উঠেছি। নিশ্চয়ই ৩২ সংখ্যাটিকে আপনার চেয়ে ভালো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গণিতবিদও অনুভব করার যোগ্যতা রাখেন না; ৩২ নম্বরের অস্তিত্ব আপনার চেয়ে বেশি কেউ রক্তে ধারণ করেন না; ৩২ নম্বরের গৌরব ও বেদনা আপনার কণাভাগও অনুভব করার সাধ্য আমাদের নেই। তবু ৩২ নম্বরের অধিকার কেবল কি আপনার, পুরো জাতির নয়? ১৯৭১-এর ৭ মার্চের দুপুরের খাবার সেরে যখন বঙ্গবন্ধু কোটি জনতার সামনে কী বলবেন বলে দ্বিধাগ্রস্ত, যখন আপনার মা বেগম মুজিব বলছেন, ‘তুমি তোমার অন্তরে যা অনুভব করবা তা-ই মানুষকে বলবা; তারা তোমার মুখের দিকে অনেক আশা নিয়ে চেয়ে আছে’ আর তিনি রেসকোর্স ময়দানে এসে নিজের অন্তর থেকে শোনালেন একটি জাতির সবচে কাক্সিক্ষত কবিতা, তারপর থেকে কি ৩২ নম্বর পুরো জাতির ঠিকানা হয়ে উঠেনি! বাঙালির স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে ভরসাস্থল হয়ে উঠেনি! অথচ এই সংখ্যাটির সবচে বড় অপমান ঘটতে চলেছে তারই রক্তে-ঘামে-জীবনে অর্জিত দল আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে! আর আপনার প্রধানমন্ত্রিত্বকালেই যদি এ দেশের লেখক-সাংবাদিক-মানবাধিকারকর্মী-মুক্তমতের মানুষদের (যাদের অনেকেই আবার আপনারও অনুরাগী) আইনি-আতঙ্কে থাকতে হয়, এটা কি খুব হতাশার ঘটনা নয়!

দেশটার ভেতর আসলে কী ঘটছে, কারা ঘটাচ্ছে! যদিও তুচ্ছ-সামান্য কলমজীবী আমি, তবু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অগণন জনগণের রক্তে প্রতিষ্ঠিত এই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এ প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার নিশ্চয়ই আছে। গরিষ্ঠতা কি আমাদের স্বেচ্ছাচারী করে তুলছে? জ্ঞানের মধ্যে পাপ ঢুকে পড়েছে! ক্ষমতা কি বিবেককে অন্ধ করে দিয়েছে আর প্রাচুর্য আমাদের আত্মাকে নরকে নিয়ে চলেছে? কিন্তু একথাটিও বলে রাখি, যদি সংখ্যাটির পরিবর্তন করে ধারাটি অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা হয়, সেটিও হবে ৩২ নম্বরের চেতনাবিরোধী। অন্যদিকে, যদিও আপনার দল অনেকাংশে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-স্লোগানের সাফল্যে সরকার গঠন করেছে এবং অনেক সাফল্য অর্জন করছে, কিন্তু আমার ঘোরতর সন্দেহ দল ও সরকারে বহু ক্ষতিকর ‘অ্যানালগ পদ্ধতি’ এখনো বিরাজ করছে। কারণ জনগণ ও নতুন প্রজন্ম যেভাবে জিজিটালি বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠছে, তাদের ভাষা বোঝার যোগ্য লোকের যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি কী এক চালাকি ও অপজ্ঞান দিয়ে তারা বরং জনগণের পায়ে শেকল পরিয়ে রাখতে চাইছে, যার প্রমাণ এই হাস্যকর ডিজিটালি এনালগ আইন! একুশ শতকের বিশ্বে এই মধ্যযুগীয় চিন্তা দিয়ে আমরা আসলে কোথায় পৌঁছুতে চাই? পৃথিবীর কত সাম্রাজ্য, কত সম্রাট, কত শাসক, কত সরকার কত না কায়দা ও কানুন করেছে নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার কিন্তু যথাসময়ে তারা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে-কোনো ক্ষমতা, শক্তি, আইন বা রাজনীতি তাদের রক্ষা করতে পারেনি! তাই কেন এত টম অ্যান্ড জেরির গেম? তাতে হয়তো গুটিকয় মানুষ, গোটা কয়েক দিনের জন্য কিছুটা সুবিধা লাভ করতে পারবেন, কিন্তু স্থায়ী লাভ বা শেষ রক্ষা হবে কি? তাহলে কেন এত কিছু! বরং ক্ষমতার জোরে আইন দিয়ে চোখ না ঠেরে তাদের নিজেদের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তনই কি বেশি প্রয়োজনীয় নয়?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অনেক রক্ত ও আগুনের নদী পেরিয়ে এসেছেন আপনি, স্বয়ং মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেও দেশকে নতুন নতুন জীবন দিয়ে চলেছেন। বাংলাদেশ আপনার নেতৃত্বের গুণেই বিশ্বে নিজের শক্তি ঘোষণা করতে পারছে। আপনি আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা হিসেবেই নন কেবল, নিজের ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, সাহস আর শ্রমশীলতার কারণেও বিশ্বের অন্যতম শক্তিমান রাষ্ট্রনেতা। তাই আপনার প্রতি আমাদের দাবি ও অধিকারও অনেক বেশি, কারণ আপনি প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন। আপনার সরকারের হাতে যদি গণ ও গণতন্ত্রবিরোধী কোনো কানুন তৈরি হয়, সেটি হবে আত্মঘাতী, যার মাসুল দলমত-নির্বিশেষ নিরীহ জনগণকেও দিতে হতে পারে, যা আপনিও নিশ্চয়ই চান না! আর আমরা তো দেখেছি, নানা সময়ে এসব আইন কীভাবে দুষ্টের পালনে আর শিষ্টের দমনেও ব্যবহৃত হয়! যে দেশে আইনের ফাঁক গলে খুনি-ডাকাতরাও পার পেয়ে যায় আর সামান্য চোরের অসামান্য শাস্তি হয়ে যায়, সে দেশে আইন রচনাতেও আরও সতর্কতা কি দরকার নয়? কারণ এই আইনগুলো কারা-কেন-কীভাবে প্রয়োগ করবে/করতে পারে বা অপপ্রয়োগ কতটা মারাত্মক হতে পারে, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে আপনি তা ভালোভাবেই জানেন। অন্যদিকে, ইতোপূর্বে যেসব সরকার নিজেদের ‘নিরাপত্তা’র স্বার্থে সংবিধান ও মানবাধিকারবিরোধী আইন/বাহিনী তৈরি করেছিল, প্রত্যেকটিই কি বুমেরাং হয়নি! আপনাকে এসব কথা মনে করিয়ে দেওয়ার ধৃষ্টতা করছি বলে ক্ষমা করবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কথিত ‘চাটার দল’ আর নব্যলীগার সরকারি-বেসরকারি চাটুকারদের বাড়-বাড়ন্ত দেখে এসব কথা কলম-ফসকে বেরিয়ে এলো!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি কেবল সরকারপ্রধান নন, একই সঙ্গে আমাদের ভগিনী ও জননী। আমাদের বাবা-মায়েরা যেমন বঙ্গবন্ধুকে তাদের সব আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থল মনে করতেন, আমাদের কাছেও আপনি তাই। আমার নিজের বিশ্বাস, যত দিন আপনি আছেন, তত দিনই বাংলাদেশের ভরসা আছে! মন্দের মধ্যেও সবচে ভালোটুকুর প্রত্যাশা আছে। খুব অন্তর থেকে বলছি, আপনার অবর্তমানে এই দেশ ও দলের কথা ভাবলে রীতিমতো ভয় হয়; সর্বমান্য অভিভাবকের খুব অভাব বোধ হয়। এই আজব-গজব জাতির জন্যই আপনাকে বড় প্রয়োজন। তাই সবসময় আপনার সুস্থ ও দীর্ঘায়ু জীবনের জন্য প্রার্থনা করি। আপনার সুবিবেচনার ওপর সবচে বেশি ভরসা করি।

আপনার জয় হোক।

গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবিকতার জয় হোক।

ঢাকা : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সৈকত হাবিব : কবি ও সাংবাদিক

“৩২ ধারা বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮”

ভাবতেছি, সাংবাদিকতার মত মহান পেশা বাদ দিয়ে ঐ ক্যামেরা দিয়ে কোন সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা বিয়ে বাড়িতে ফটো ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত হয়ে যাবো। নয় ত, বিদেশ থেকে তেল আমদানি করে সরকারি, আধা- সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও জনপ্রতিনিধিদের মাঝে বাহবাহ দিয়ে তৈল মর্দন করে ফেমাস হয়ে যাবো । কেননা, এর উল্টো কিছু করতে যাবো তো ফেঁসে যাবো। সাংবাদিকদের জন্য তৈরি হচ্ছে, আছৌলা বাঁশ ৩২ ধারা বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮। নতুন আইনের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনিভাবে প্রবেশ করে কোনও ধরণের তথ্য-উপাত্ত, যেকোনও ধরণের ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে।’ আইনটিতে এ অপরাধের শাস্তি হিসেবে ১৪ বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। # প্রসঙ্গ: একজন সংবাদকর্মীর প্রধান কাজ হচ্ছে সমাজের অসঙ্গতি, দেশ বিরোধী কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি, অনিয়ম, আত্মসাৎ ও অসহায় মানুষের পক্ষ হয়ে জনসম্মুখে তা প্রকাশ করা। আর এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত প্রমাণাদি। যা সংগ্রহ করতে একজন সাংবাদিককে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়। কিন্তু নতুন এই আইন প্রণোয়নে জাতির কাছে আমার প্রশ্ন (?) ” একজন সাংবাদিক কি তার সঠিক কাজটি করতে পারবে…???”

লেখক: ইখতিয়ার উদ্দীন আজাদ সাংবাদিক ও কলামিস্ট, পত্নীতলা, নওগাঁ।