দুর্দান্ত জয়ে নতুন স্বপ্ন – এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ

মোস্তাফিজ শেষ বলটি করতেই আবুধাবির গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়লো আনন্দ। ক্রিকেট ভক্তরা লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে ততক্ষণে ‘মাশরাফি…বাংলাদেশ’ বলে চিৎকারে মত্ত। আবুধাবি স্টেডিয়ামের ডিজেও চুপ থাকবেন কেন! তিনিও ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ গানটি বাজিয়ে দিয়েছেন। সেই গানের আনন্দে গ্যালারির উচ্ছ্বাস যেন আরও বেড়ে গেল।

এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কজনই বা ভেবেছিলেন এমনটা। কিন্তু বুধবার পাকিস্তান বাধা পেরিয়ে তৃতীয়বারের মতো এশিয়া কাপের ফাইনালে মাশরাফিরা।

২০১২ এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হেরে শিরেপো বঞ্চিত হয়েছিল বাংলাদেশ। মিরপুরের বদলা মাশরাফিরা আবুধাবিতের ষোলো আনায় উসুল করে নিল। টানা দুইবার ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল খেলতে যাচ্ছে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। যদিও আগেরবার টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ছিল এই টুর্নামেন্টটি।

৩২ বছর ধরে এশিয়া কাপ খেলা টাইগারদের সেরা সাফল্য ২০১২ সালে পাকিস্তান এবং ২০১৬ সালে ভারতের বিপক্ষে হেরে রানার্স-আপ হওয়া। এশিয়া কাপেই প্রথমবার পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেছিল বাংলাদেশ। এই টুর্নামেন্টের ৩৪ বছরের ইতিহাসে ১৩ আসরের মধ্যে ১২ আসরে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে ১১বার মুখোমুখি হয়ছে দুই দল। সবকটি ম্যাচেই হারের বেদনা নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল বাংলাদেশ। তবে এবার এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে হারের বৃত্তটা ভেঙে জয়ের সূচনা হলো আবুধাবির শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। সেই মাশরাফির নেতৃত্বেই পেল এশিয়া কাপে পাকিস্তানকে হারানোর স্বাদ।

২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর পাকিস্তানকে পেলেই বাংলাদেশ জ্বলে ওঠে আপন শক্তিতে। ৫০ ওভারের ক্রিকেটে সবশেষ চার মুখোমুখির সবকটিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল পাকিস্তান। হাসান আলী-সরফরাজদের বিপক্ষে পুরনো সুখস্মৃতি নিয়েই মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ।

যদিও পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা বাংলাদেশের জন্য সহজ ছিল না। তামিমকে হারিয়ে এমনিতেই ধুঁকছে বাংলাদেশের টপ অর্ডার। টসের সময় জানা গেল আঙুলের পুরনো ব্যথা বেড়ে যাওয়াতে এশিয়া কাপ থেকেই ছিটকে গেছেন সাকিব। তামিমের পর সাকিবকে হারিয়ে ভঙ্গুর বাংলাদেশের কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হলো। দলীয় ১২ রানে টপ অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে পাঠিয়ে শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় পাকিস্তান। উদ্বোধনী ম্যাচের মতো এ ম্যাচেও ত্রাতার ভূমিকাতে মুশফিক-মিঠুন। মুশফিকের ৯৯ ও মিঠুনের ৬০ মিলে ১৪৪ রানের জুটি বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে লড়াই করার মতো পুঁজি এনে দেয়।

২৪০ রানের লক্ষ্য বেঁধে দিয়ে পাকিস্তানকে আরও একবার আটকে দেয় বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের জয়টা ছিনিয়ে নিতে যাচ্ছিলেন ইমাম-উল–হক। মাহমুদউল্লাহর জোরের ওপর করা বলটির লাইন মিস করেন ইমাম। আর তাতেই উইকেটের পেছনে থাকা লিটন স্টাম্প ভেঙে দেন। বাংলাদেশ ম্যাচ জেতে ৩৭ রানে।

কিন্তু বাংলাদেশকে এই জয়টি পেতে অনেক বাধা পেরেয়ি আসতে হয়েছে। আবুধাবির গরমে প্রত্যেক ক্রিকেটারই পানিশূন্যতায় ভুগছেন। বিশেষ করে দলের সিনিয়ার ক্রিকেটারদের পরিশ্রমটা বেশি হচ্ছে বলে সমস্যাটা তাদেরই বেশি। ২১তম ওভারে মাশরাফি দুর্দান্ত এক ক্যাচে ফর্মে থাকা শোয়েব মালিককে ফেরান। যদিও সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে যেতে হয় মাশরাফিকে। রুবেল ওভার শেষ হতেই দুই আঙুলে ব্যান্ডেজ বেঁধে মাঠে নামেন। ওই ওভারের আগের ওভারে মাহমুদউল্লাহ ছিলেন মাঠের বাইরে। ৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা মাথায় নিয়ে ৯৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন মুশফিক। এরপর কিপিংয়েও দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেন। ফিল্ডিংয়ের শুরু থেকেই মুশফিকের পেশি ক্র্যাম্প করছিল। বেশ কিছুক্ষণ কিপিং করে আর মাঠে নামেননি মুশফিক। তামিম-সাকিব আগেই না থাকায় পাকিস্তানের ইনিংসের ২১তম ওভারটিতে বাংলাদেশের পঞ্চপাণ্ডব ছাড়াই খেলতে হয়েছে টিম বাংলাদেশকে।

পাকিস্তান বধের ইতিহাস শুরু ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ দিয়ে। এরপর আরও ২৫বার মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। কিন্তু জয় তো দূরে থাক লড়াইও করতে পারেনি বাংলাদেশ। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পরই নতুন বাংলাদেশের আবির্ভাব হয়। শুরু হয় একের পর এক বড় দলকে হারানো। সেই তালিকায় যোগ হয় পাকিস্তানও। ঘরের মাঠে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রতিটি ম্যাচেই নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে সৌম্য-মোস্তাফিজ-তামিমদের কাছে।

পাকিস্তানের পেস আক্রমণ, গরম, টপ অর্ডারের ব্যর্থতা, সাকিব-তামিমের ছিটকে যাওয়া- সবকিছু মিলিয়ে চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে ফাইনালের আগে এমন প্রতিকূলতার মধ্যে পাওয়া জয়টা নিশ্চিতভাবেই আত্মবিশ্বাস জোগাবে বাংলাদেশকে। ২০১২ ও ২০১৬ সালের ব্যর্থতা হয়তো ২০১৮ সালে ভুলিয়ে দিতে পারবে মাশরাফির দল। সেই স্বপ্নতেই এখন বুঁদ বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তরা।