সন্দেহবাদিতা

সন্দেহবাদিতা

মো. রফিকুল ইসলাম

(সংবিধিবদ্ধ সতর্কতা: লেখাটি নিতান্তই রম্যকথন। সিরিয়াসলি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। গল্প ও জোকসগুলো সংগৃহীত)

আমার প্রবাসী বন্ধুটি আবারও অনুরোধ করেছে সন্দেহ বা সন্দেহবাদিতা বা সাসপিশন নিয়ে কিছু লিখতে। আগেরবার মনে করেছিলাম বন্ধু হয়ত জ্ঞানের বহর বাড়াতে আমাকে দিয়ে ঘাটাঘাটি করিয়ে কিছু লিখিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এবারে একটু সন্দেহ হল। ঘটনা কি? এতো জ্ঞানার্জন নয়। নিশ্চয় অন্য কোন বিষয় আছে। বন্ধুকে হালকা চেপে ধরতেই স্বীকার করতে বাধ্য হলো সে সন্দেহের আওতায় আছে। কার সন্দেহের আওতায় আছে তা নিশ্চয় আপনাদের বলে দিতে হবে না। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। তিনি ধর্মপত্নীর সন্দেহের ঘেরাটোপে আবদ্ধ আছেন। কিছুতেই এ জাল ছিন্ন করতে পারছেন না। তাই সন্দেহের আদি অন্ত নাড়াচাড়া করে যদি মনে একটু শান্তি আসে তাই এ অনুরোধ। শুধু আমার বন্ধু কেন শতকরা নব্বই ভাগ বিবাহিত পুরুষই নিজ নিজ পত্নীর সন্দেহের তালিকায় থাকেন। পরিসংখ্যান নিয়ে আপনাদের সন্দেহ হচ্ছে? আপনার সন্দেহ যুক্তিসংগত। ঠিক ধরেছেন, এটা কোন জরিপের ফলাফল নয় নিতান্তই আমার অনুমান মাত্র। এ ধরনের কোন জরিপ আছে কিনা সেটাও আমার জানা নেই। জানার দরকারও নেই। আপনি কি বিবাহিত। তাহলে বুক হাত দিয়ে ভাবুন তো একবার, না, বলার দরকার নেই। আপনি কি সন্দেহের বাইরে? যদি হন তাহলে আপনি ভাগ্যবান। না হলে ঐ নব্বই জনের একজন আপনি। দাঁড়ান দাঁড়ান কিসের সন্দেহের আওতায় আছেন তা কিন্তু এখনও বলিনি। উল্টাপাল্টা কিছু ভেবে বসবেন না যেন। একটু ধৈর্য ধরুন সব খোলাসা হবে।

বাংলা ভাষায় সন্দেহকে সংশয়, অবিশ্বাস, অনিশ্চয়তা, দ্বিধা, অপ্রতীতি, খটকা বা অভিশংকা ইত্যাদি নানাভাবে বর্ণনা করা যায়। সন্দেহের ইংরেজি পরিভাষা সাসপিশন শব্দটি ল্যাটিন Suspere শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ To suspect। ইংরেজি ভাষায় সাসপিশন শব্দটি চতুর্দশ শতাব্দীতে ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে ভাষায় এর যেদিনই ব্যবহার শুরু হোক না কেন সন্দেহ অবিশ্বাস যে আদি মানব সন্তানের সৃষ্টিলগ্ন থেকে শুরু হয়েছে সে বিষয়ে কিন্তু কোন সন্দেহ নেই। আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না, সন্দেহ হচ্ছে তাহলে আদি পিতার বেহেশতের সেই নিষিদ্ধ ফল খাবার ঘটনাটি নতুন করে মনে করুন তাহলেই আপনার সন্দেহভঞ্জন হবে।

আমরা প্রতিনিয়ত অন্যের সন্দেহের আওতায় পড়ছি। আবার আমরাও মাঝে মধ্যে অন্যকে সন্দেহের আওতায় আনছি। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য আছে যারা অন্যকে সহজে সন্দেহ করতে চায় না। এজন্য অবশ্য তাদের বিপদে পড়ার সম্ভবনাও থাকে। যাক সে বিষয় পরে বলা যাবে আগের বিষয় আগে। দু’টো শ্রেনির সন্দেহের আওতায় আসলে আমরা সব থেকে বেশি নাস্তানাবুদ হই। এক নিজ স্ত্রী আর দ্বিতীয় পুলিশ। একটিতে আপনি বেইজ্জত হতে পারেন পরিবারের মধ্যে আর দ্বিতীয়টিতে জনসম্মুখে। প্রথমটি নিয়ে হয়ত অনেকের সংশয় বা সন্দেহ হচ্ছে। উদাহরন দিচ্ছি মিলিয়ে নিন। প্রত্যেক স্ত্রীই তার স্বামী সম্পর্কে অতিশয় উচ্চ ধারনা পোষন করে। যেমন স্বামী বেচারা হয়ত সরকারী বা বেসরকারী নির্ধারিত বেতনে চাকুরী করে বা ছোট খাট ব্যবসা করে সংসারের খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। স্ত্রী নিজেও হয়ত চাকুরী করে। সেও জানে তার স্বামীর আয় কত। তবুও সে সব সময় সন্দেহ করবে নিশ্চয় তার স্বামী গোপনে আত্মীয় স্বজনকে টাকা পাচার করে দিচ্ছে। ভাববে স্বামী তার ভাইকে জমি বা বাড়ি কিনে দিচ্ছে বা ভাগ্নে বা ভাস্তেকে পড়ার খরচ দিচ্ছে নিজ সংসারের দিকে না তাকিয়ে। সব স্ত্রীরই ধারনা তার স্বামীর নিশ্চয়ই এক্সট্রা ইনকাম আছে অথবা আছে অফুরান্ত অর্থের ভান্ডার। সে স্ত্রী সন্তানকে বঞ্চিত করে শুধু বাবা মার সংসারে বা আত্মীয়দের অকাতরে অর্থ ঢেলে যাচ্ছে।

এতো গেল টাকা পয়সা নিয়ে। অন্য বিষয়! বেচারা স্বামীর হয়ত কোন কারনে বাসায় ফিরতে দেরি হচ্ছে। তো শুরু হয়ে গেল মুহূর্মুহু টেলিফোন। যদি কোন কারনে মোবাইল অফ থাকে বা ব্যাটারী শেষ হয়ে ফোন বন্ধ হয়ে যায় তাহলে স্বামী বেচারার কপালে দুঃখ আছে। প্রায় প্রত্যেক স্ত্রীই ভাবে তার স্বামীর প্রেমে তাবত সুন্দরীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। তাই দেরি হলে তাদের ধারনা স্বামী প্রবর এতক্ষন নিশ্চয় স্ফূর্তি করে আসলেন। ওই যে বলছিলাম স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের সামর্থ্য সম্পর্কে অতি উচ্চাশা পোষন করে।

তবে কোন কোন বুদ্ধিমান জ্ঞানী ব্যক্তি স্বামী নামের এ আসামীদের এ অবস্থা থেকে উদ্ধারে কিছু কিছু পথ বাৎলে দিয়েছেন। তার দু’একটা টিপস আপনাদের দেই। কাজে লাগাতে পারেন। এতে কাজও হতে পারে। কাজে না লাগলে আমাকে দোষ দেবেন না যেন। এগুলো আমার আবিষ্কারও নয় বা আমার দ্বারা পরীক্ষিতও নয়। যেমন ধরুন, আপনি হয়ত ট্যুরে আছেন। প্রতিদিন নিয়ম করে টেলিফোন করবেন কোথায় কি করছেন তার রানিং কমেন্ট্রি দিয়ে। একে বলা যায় হাজিরা কল। আপনি হয়ত সন্ধ্যার পর বন্ধু বা বান্ধবীদের নিয়ে আসলেই স্ফুর্তি করছেন। এ সময় স্ত্রীর কল। কি করবেন? ঘাবড়াবেন না। খুব পরিশ্রান্তের সুরে জবাব দিন সারাদিন একঘেয়ে মিটিং করে এই মাত্র হোটেলে ফিরলেন। কাজে লাগতে পারে এমনকি সহানুভূতিও পেতে পারেন। অথবা ধরুন, আপনার স্ত্রীও হয়ত জানে আপনি স্ফূর্তির জায়গায় আছেন। তখন প্রেমঘন স্বরে বলুন আই মিস ইউ। তুমি থাকলে ভাল লাগতো। দেখবেন আপনার সাত খুন মাপ হতেও পারে।

তবে অতিশয় বুদ্ধিমান স্বামীরা কিন্তু বুদ্ধি খাটিয়ে দিব্যি স্ত্রীর নাকের ডগায় স্ফূর্তি করে বেড়াচ্ছে। একটা গল্প বলি শুনুন। একদিন কুদরত সাহেব ভুলে মোবাইল বাসায় ফেলে অফিসে গেছেন। অফিস থেকে ফোন করে স্ত্রীকে দুপুরে লাঞ্চের সাথে ড্রাইভারের কাছে ফোন পাঠিয়ে দিতে বললেন। স্ত্রী এ সুযোগে স্বামীর ফোনটি নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করলেন। ফোনবুকে ঢুকে দেখলেন সন্দেহজনক তিনটি নম্বর গর্জিয়াস ওম্যান, প্রেটি লেডি ও মাই লাভ নামে সেভ করা। স্ত্রীর তো মাথায় খারাপ হবার যোগাড়। কুদরত সাহেবকে নিতান্তই গোবেচারা মনে হয় যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। অথচ তলে তলে এত। ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে। আজকেই ধরতে হবে। একেবারে জন্মের শিক্ষা দিতে হবে। ছোক ছোকানির সাধ মিটিয়ে দিতে হবে। আসুক আজ বাড়িতে। তবে তার আগে ধরতে হবে এ তিন শাঁকচুন্নি কারা। কুদরত সাহেবের ফোন থেকে ফোন করলে নিশ্চয় ধরবে। তখনই বুঝা যাবে তারা কারা। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রথমেই গর্জিয়াস ওম্যানকে ফোন করলেন। ওপাশের ফোন কল রিসিভ করলো। হ্যালো বাবাজী, কেমন আছ? আমার মেয়ে কেমন আছে। অসময়ে ফোন করলে? কোন অসুবিধা? মা আমি তোমার মেয়ে বলছি। তোমার জামাই ভুলে ফোন রেখে গেছে। সে ফাঁকে তোমাকে ফোন করলাম। আরও দু’চার কথা বলে ফোন রেখে দিলেন। স্ত্রী ধাক্কা খেলেন। আজকাল মানুষ নিজের মাকেই পাত্তা দেয় না আর সে কিনা শাশুড়ির নাম সেভ করেছে। আসলেই লোকটা নরম মনের মানুষ। তা বলে তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তিনি এবারে ফোন করলেন প্রেটি লেডির নম্বরে। হ্যালো দুলাভাই। আচ্ছালামু আলাইকুম। এতদিনে আপনার একমাত্র শালীর কথা মনে পড়লো। ঋতু, আমি তোর আপা বলছি রে। তোর দুলাভাই ভুলে ফোন বাসায় রেখে গেছে। তুই কেমন আছিস। আরও অল্পকিছু কথা বলে ফোন রেখে দিল। না! তার স্বামীটা তো আসলেই ভাল মানুষ। নিজের বোন নেই তাই শালীকে বোনের মত দেখে। কিন্তু মাই লাভটা কে? খটকা এখনও দূর হয়নি। এবারে রিং দিল মাই লাভের নম্বরে। রিং হচ্ছে। ওমা তার নিজের নম্বরও বাজছে। নিজের ফোন হাতে নিয়ে দেখে তার স্বামীর নম্বর। সে পুরো থ হয়ে গেল। তার ভীষণ কান্না পেল। ফেরেস্তার মত স্বামীকে সে সন্দেহ করলো।

তার খুব অনুশোচনা হল। সে সারাদিন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদলো। বিকেলে কুদরত সাহেব ফিরলে পুরো ঘটনা তাকে খুলে বললো। মাফ চাইলো। আর কুদরত সাহেবের হাতে তুলে দিল দশ হাজার টাকা ইচ্ছেমত খরচ করতে। এ টাকাটা সে অনেক কষ্টে জমিয়েছিল। অথচ একদিন আগে হলে জান থাকতে সে এ টাকা কাউকে দিত না। কিন্তু সে আজ এতটাই অনুতপ্ত আর তার পতিভক্তি ও পতিপ্রেম এতটাই উথলে উঠেছে যে এ টাকা তার কাছে নিতান্তই তুচ্ছ।

কুদরত সাহেব টাকাটা নিলেন। এ টাকায় একটি সুন্দর শাড়ি কিনে গিফট দিলেন বান্ধবী সিনথিয়াকে। ভাবছেন, কুদরত সাহেবের স্ত্রী ফোনে সিনথিয়ার নম্বর পেল না কেন? পাবে কি করে ওটা তো সেভ ছিল গফুর চাচা মোটর মেকানিক নামে।

সন্দেহবাদিতা ২

স্ত্রীর সন্দেহের আসামী হলে কি কি হতে পারে তার ধারনা ইতোমধ্যে পেয়ে গেছেন। এবারে তাদের সন্দেহ যে কখনও কখনও উপকারী হতে পারে তার একটা উদাহরন দেই। ধরুন, আপনি সকালের ঘুমটা খুব পছন্দ করেন তাই সকালে দেরি করে উঠেন। কিন্ত আপনার স্ত্রী চান আপনি সকালে উঠে হাটতে যাবেন যাতে আপনি স্লীম থাকেন। কি আর করা, আপনার কষ্ট হলেও স্ত্রী আজ্ঞা পালনে নিতান্ত অনিচ্ছায় হাটতে বের হন। কিন্তু আপনি সকালের ঘুমটা খুব মিস করেন। এ সমস্যা থেকে বাঁচতে শুধু স্ত্রীর মনে একটু সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবেন। কিভাবে? দিন কয়েক পর হেঁটে বাসায় ফিরে উৎফুল্লভাব দেখান বা চাইলে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জনপ্রিয় কোন গানের কলিও ভাজতে পারেন। ভাব দেখান আপনার হেঁটে খুব ভাল লাগছে। নিশ্চিত আপনার স্ত্রী আপনার উৎফুল্লতার কারন জানতে চাইবে। বলবেন, ” আর বলো না হেঁটে খুব মজা পাচ্ছি। সকালবেলা আমরা যে রাস্তায় হাঁটি সে রাস্তার পাশে বাচ্চাদের স্কুলে সুন্দর সুন্দর মায়েরা বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে আসে। বাচ্চাদের স্কুলে ঢুকিয়ে তারা রাস্তার ধারে আড্ডা দেয়।” ব্যস আর কিছু বলার দরকার নেই। আপনার কথা শুনে স্ত্রীর কথা বন্ধ হয়ে যাবে, মুখ ভার হবে। আপনি সারাদিন চুপটি থাকুন। শুধু ঘুমুতে যাওয়ার আগে সকালে হাঁটতে যাওয়ার কোন প্রসংগ তুলতে পারেন বা নাও তুলতে পারেন। কিন্তু নির্দেশ পাবেন, “কাল থেকে আর তোমাকে হাঁটতে যেতে হবে না।” আঃ! কি শান্তি! নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ুন।

পুলিশের সন্দেহের আসামী হলে কি সমস্যা হতে পারে তার একটু ধারনা দেওয়া যাক এবার। আপনি কপালদোষে পুলিশের সন্দেহের আওতায় যদি এসেই পড়েন তাহলে পুলিশের সন্দেহভঞ্জনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ৫৪ ধারায় আপনি লাল দালানে ঢুকে যেতে পারেন। কপাল ভাল হলে উকিল মোক্তার ধরে বাড়ি ফিরে বাড়ির ভাত খেতে পারবেন। আর যদি কপাল খারাপ হয় তাহলে লাল দালানে ভাত খেতে হতে পারে। কতদিন? তা জানতে জনপ্রিয় জোকটি শুনুন। এক বনের ধারে এক শেয়াল দাড়িয়ে আছে। হঠাৎ সে দেখলো একটা মহিষ ব্যস্ত সমস্ত হয়ে দৌড়ে গভীর বনের মধ্যে ঢুকছে। শিয়াল তাকে জিজ্ঞেস করলো, “এই মহিষ, তুমি এত ব্যস্ত হয়ে কই যাও।” উত্তরে মহিষ বললো, “ও, তুমি জানো না বুঝি। হাতি ধরতে বনে পুলিশ এসেছে।” “আরে বোকা মহিষ তাতে তোমার কি তুমি তো আর হাতি না?” শিয়াল মহিষকে টিটকারি মারলো। মহিষ হেসে জানালো, “এটা এমন দেশ ২০ বছর জেলে থেকেও আমি প্রমান করতে পারবো না আমি হাতি না, মহিষ।” শুনে শেয়াল নিজেও আর দাঁড়ালো না, দৌড় লাগালো।

পুলিশ উকিল মোক্তার কোর্ট কাচারীর কথা যখন এসেই গেল তখন সেখানকার কাজ কারবার সম্পর্কে একটু বিদ্যার্জন করা যাক। আদালতে বাদী পক্ষের সব সময় চেষ্টা থাকে মামলার ঘটনা কিভাবে বিচারক বা জুরিবোর্ডকে বিশ্বাস করানো যায়। অন্যদিকে আসামি পক্ষের কাজ কারবার সন্দেহ নিয়ে। অর্থাৎ বিচারক বা জুরিবোর্ডের মনে ঘটনার বিষয়ে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া। যে যত ভালভাবে এ কাজ করতে পারবে সে তত ভাল উকিল। কখনও কখনও সন্দেহ সংশয়ের জয় হয় কখনওবা নির্ঘাত পরাজয়। এ নিয়ে একটি গল্প হয়ে যাক। এক উকিল এক হত্যা মামলার আসামীর পক্ষে আইনি লড়াই করছে। এক পর্যায়ে সে বুঝতে পারলো যদিও ভিকটিকের লাশ পাওয়া যায়নি কিন্তু আসামীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ এমন যে তার মক্কেলের শাস্তি এড়ানো খুবই কঠিন হবে। তখন সে মামলার জুরি বোর্ডকে বললো, “সম্মানিত জুরিবোর্ড আপনারা আজ যার হত্যাকান্ডের জন্য আমার মক্কেলকে আসামীর কাঠ গড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সে কিছুক্ষনের মধ্যেই হেটে আমাদের এখানে চলে আসবে।” বলেই সে কোর্টরুমের দরজার দিকে তাঁকালো। জুরিবোর্ডও দরজার দিকে তাঁকালো। কিন্তু কিছুই ঘটলো না। কেউ এলো না। তখন উকিল বললো, “এই মাত্র যে কথাটি বলেছিলাম তা ছিল একটা বিবৃতি মাত্র। কিন্তু আপনারা সবাই আমার কথায় দরজার দিকে তাঁকিয়ে ভিকটিমের কোর্টরুমে ঢোকার অপেক্ষা করছিলেন। এর একটাই অর্থ আপনারা হত্যাকান্ডের ব্যাপারে সন্দিহান। সুতরাং আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনীত হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার বিষয়েও আপনাদের সন্দেহ আছে। অতএব আমার মক্কেল হত্যার দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারে।”

এরপর দ্রুত জুরিবোর্ড সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন ও রায় দিয়ে দিলেন। কি আশা করছেন আপনারা, জুরিবোর্ড আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়ে দিলেন। যদি বলি আপনারা ঠিক ধরতে পেরেছেন। কোন সন্দেহ হচ্ছে আপনাদের? সন্দেহ হলে কোন কথা নেই। না হলে একটি কথা আছে। এবারে কিন্তু সন্দেহবাতিকগন জিতে গেছেন। উকিলের যথার্থ সন্দেহ উদ্রেক সত্ত্বেও আসামিকে জুরিবোর্ড সাজা দিয়ে দিয়েছিলেন। কারন জুরিবোর্ড উকিল সাহেবের সন্দেহ উদ্রেকের বিবৃতির উপরই সন্দেহ করেছিলেন। কেন? উকিলের বিবৃতি শুনে বেচারা আসামি যে দরজার দিকে ভ্রক্ষেপই করেনি। কারন তার হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে নিজের কোনই সন্দেহ ছিল না।

জন উইলসন বলেছেন, যে যাকে সন্দেহ করে সে তার ভাল কাজকেও স্বীকৃতি দিতে পারে না। তার মানে সন্দেহবাতিকেরা ভালকাজকেও সন্দেহের চোখে দেখে।আমাদের ধর্মপত্নীগণ ও পুলিশের কাজই হল সন্দেহ করা। সুতরাং এরা ছাড়া জন উইলসন সাহেবের কথামত সাধারন মানুষের সব কাজে সন্দেহ করা মানায় না। তাহলে সে সন্দেহবাতিক নামের ব্যাধিক্রান্ত হতে পারে। আবার একেবারে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির হয়ে সকল কথায় সকলকে বিশ্বাস করলেও অনেক সময় কপাল চাপড়াতে হয়। তাই মাঝে মাঝে কিন্তু সন্দেহবাতিক হওয়ারও প্রয়োজন আছে। এসব পরিস্থিতিতে সন্দেহ না করলে বরং আপনি ঠকে যেতে পারেন । একটা গল্প শুনুন তাহলে বুঝতে পারবেন সন্দেহ না করলে কি বিপদ হতে পারে। নগেন ও যতীন দু’বন্ধু। একদিন যতীন নগেনকে বললো, “জানিস দোস্ত আমাদের পুরোহিতের বৌটা না হেব্বি দেখতে।” নগেন বললো, “বলিস কিরে যতীন?” নগেন : “হা রে! আজ রাতে আমি পুরোহিতের বাড়ি যাব। তুই পুরোহিতকে পাহারা দিবি।” যতীন: “কিভাবে?” যতীন নগেনকে বললো, “আরে পুরোহিত যখন মন্দিরে থাকবে তুই পুরোহিতের সংগে কথা বলে তাঁকে মন্দিরে দু’ঘন্টা আটকে রাখবি।”

নগেন আর পুরোহিত মন্দিরে কথা বলছে। নগেন: “পুরোহিত মশাই, আপনি গ্রামের সবচেয়ে পুরাতন ও ভাল পুরোহিত। আপনি অনেকদিন ধরে এ মন্দিরে পুজা করে আসছেন।” এরকম নানা কথা বলতে বলতে দু’ঘন্টা কেটে গেল। পুরোহিতের নগেনের এ গাল গল্পে সন্দেহ হল। সে বললো, ” আচ্ছা নগেন, আজ তুমি হঠাৎ আমার সাথে এত কথা বলছো কেন? আগে তো কখনই বলোনি।” নগেন আমতা আমতা করে বললো, “না মানে এমনি পুরোহিত মশাই?” পুরোহিত : “মানে মানে না করে আসল কথা বলো তো।” নগেন তখন জানালো যে যতীন তাঁকে দু’ঘন্টা মন্দিরে আটকে রাখতে বলেছিল। কারন তাঁর বউ নাকি হেব্বি সুন্দরী। যতীন আজ তাঁর বাড়িতে যাবে। পুরোহিত নগেনকে জিজ্ঞেস করলো, “নগেন, তুমি বিয়ে করেছো। নগেন: “হ্যাঁ। পুরোহিত মশাই।” পুরোহিত: “আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও। আমার বউ পাঁচ বছর আগে মারা গেছে।”

এবার আপনি ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিন কখন কাকে সন্দেহ করবেন বা কখন কাকে ক্লিন চিট দিবেন। অথবা কিভাবে নিজ পত্নীর সন্দেহ সংশয়কে সামাল দেবেন। পুলিশের সন্দেহ দূর করার চেষ্টা না করাই ভাল। বেশি চেষ্টা করলে পুলিশের সন্দেহকে বরং আরও উসকে দিবেন। (সমাপ্ত)