কোটা কোনও শুদ্ধ সমাধান নয়

ইস্যুভিত্তিক এই আন্দোলনগুলো কখনোই সরকারবিরোধী নয়, সরকার পতনের জন্য নয়। তাহলে ভয়টা কীসের? কোটা কোনও শুদ্ধ সমাধান নয়ঃ

শাকিল রিয়াজ

বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা নিয়ে আমার কিছু সুইডিশ বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা হলো। ঘটনাগুলো বাংলাদেশে ঘটলেও পরিধি ও শক্তির তীব্রতার কারণে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও এদুটো সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। সুইডিশ গণমাধ্যমেও এসেছে ব্যাপকভাবে। বলাবাহুল্য, আলোচনায় আমরা কথা বলেছিলাম কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক নিয়ে। আমার সঙ্গে কথা বলতে বন্ধুরা পড়াশোনা করেই বসেছিল। বুঝলাম এরা আদ্যোপান্ত জানে। তারা আমাকেই বাংলাদেশ সরকার মনে করে নানান ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে চললো। তোমরা কেন এটা করলা, ওটা করলা, এসব সামাজিক দাবির জন্য মাঠে নামা ছাত্রদের উপর বল প্রয়োগ বা রাজনৈতিক ট্যাগ দেয়া ঠিক হয়েছে কী না, এসব।

চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার আন্দোলন সফল না বিফল হয়েছে এই মুহূর্তে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। সরকার এবং সরকারী দল থেকে একেক সময় একেক কথা আসে। দাবী মানা হয়েছে বলা হয়, কিন্তু দাবী আদায়ে সফলতার জন্য আন্দোলনকারী কেউই নায়ক হয়নি। উল্টো খলনায়কের খাতায় নাম লিখিয়েছে। জেল-জুলুম-মামলার শিকার হয়েছে, হচ্ছে। নিরাপদ সড়কের দাবিদার শিক্ষার্থীদের বেলায়ও একই কাহিনী। ওদের দাবিগুলো মেনে নেয়ার কথা বলা হলেও আন্দোলনকারী শিশু-কিশোররা বিষ্ময়করভাবে ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত হলো। এ দুটি আন্দোলন, এর তীব্রতা ও পরিণতি বিবেচনায় আনলে তিনটি মেসেজ পাই। এক, সরকার ভীতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। যে কোনো আন্দোলন, তা যতো অরাজনৈতিকই হোক, দমনে সরকার ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সেটা কোটা হোক, নিরাপদ সড়ক হোক, নারী নির্যাতনবিরোধী হোক, বিদ্যুত-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, চাকুরির বয়সসীমা বৃদ্ধি বা সুন্দরবন বাঁচানোর জন্য হোক। সরকার যেমন হেফাজতের আন্দোলন দমন করেছিল তেমনি দমিয়ে রেখেছে শাহবাগকেও। গণতন্ত্র সুষ্ঠু পথে হাঁটলে এ ধরনের আন্দোলন দমনের জন্য সরকারকে মরিয়া হতে হতো না। ইস্যুভিত্তিক এই আন্দোলনগুলো কখনোই সরকারবিরোধী নয়, সরকার পতনের জন্য নয়। তাহলে ভয়টা কীসের?

দুই, সমাজের নানান অসঙ্গতি, অব্যবস্হাপনা আর অন্যায় দেখেও যখন বড়রা ভয়ে, অসামর্থ্যে বা সুবিধা হারানোর আতংকে চুপ করে থাকছে তখন নতুন প্রজন্ম বারবার মাঠে নেমে আসছে। নতুন প্রজন্মের এই আন্দোলন শুধু সরকারের কাছ থেকে কিছু দাবী আদায়ের জন্যই নয়, এই আন্দোলন জরাগ্রস্ত মানুষের বিরুদ্ধে যারা মূক, বধির, অন্ধ। এই আন্দোলন আইনী ব্যবস্হা ও বাহিনীর বিরুদ্ধে, নিষ্কাম সংসদের বিরুদ্ধে, ভঙ্গুর বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে, সুশীলশ্রেণীর বিরুদ্ধে। দলমত নির্বিশেষে তরুণ শক্তির এই মাঠে নেমে আসা আমাদের অসার সমাজের গায়ে প্রচণ্ড এক আঘাত। এখন না হোক, কোনও একদিন এই ঘা খেয়েই বেঁচে উঠবে আধমরা সমাজ।

তৃতীয় মেসেজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ — সময় হয়েছে নবীনদের দিকে তাকানোর। তাদের আকাঙ্ক্ষাকে মূল্য দেবার, তাদের দাবীকে গ্রাহ্য করার।

নিরাপদ সড়কের দাবীতে শিশুকিশোরদের রাস্তায় নেমে আসা এবং তাদের কঠোর হাতে দমনকে আমার সুইডিশ বন্ধুরা এক ব্যর্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্রিয়াকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেছে যেখানে রাষ্ট্র তার ব্যর্থতা ঢাকতে একের পর এক কন্সপিরেশন থিয়োরি বাজারে নিয়ে আসে। অন্যদিকে অবদমিত, নিঃস্ব বিরোধী শক্তি যেকোনও নড়াচড়ার মধ্যেই সরকার পতনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

চাকুরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। এই সংস্কার সময়ের দাবী। বর্তমান পদ্ধতিতে বহাল থাকা কিংবা বাতিল করা — কোনটাই ভাল সমাধান নয়। বর্তমান কোটা পদ্ধতি বহাল থাকলে বঞ্চিত হবে মেধাবীরা। যোগ্যরা তাদের জায়গায় পৌঁছুতে পারবে না। বিশাল একদল বিমর্ষ, হতাশ, ভাগ্যহীন নাগরিক পাবে দেশ যারা দেশের জন্য কিছু করতে উৎসাহী হবেনা। অন্যদিকে কম মেধার বা মেধাহীন একদল নাগরিক দেশের কর্ণধার হবে। ফলাফল সহজেই অনুমেয়। শিক্ষার্থীদের দাবী ছিল সংস্কার। এই সংস্কার শব্দটি নিয়ে পলিটিশিয়ানরা পানি ঘোলা করে জিতে যেতে চেয়েছে। পলিটিশিয়ানরা জিতে গেলে হেরে যাবে বাংলাদেশ।

কোটা একটি অবমাননাকর শব্দ। বৈষম্য না কমিয়ে বরং বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়। সমাজকে ভাগ করে দেয়, ভেদাভেদ উস্কে দেয়। যোগ্যতরদের প্রতিযোগীমুখী হতে নিরুৎসাহ করে। কোটার সুবিধা দিয়ে কিছু বিশেষ গ্রুপকে কি অমেধাবী, অযোগ্য ও প্রতিযোগিতায় ডিসকোয়ালিফায়েড বলে আগেই ট্যাগ দিয়ে দেয়া হলো না? তাছাড়া কোটা পদ্ধতি কি আমাদের চেতনা, মূলনীতি ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? সংবিধানে সবার জন্য সাম্য ও সমানাধিকারের কথা বলা হয়েছে। এই সাম্য ও সমানাধিকার ইন্ডিভিজুয়াল ব্যক্তির জন্য। কোনও গ্রুপ বা গোষ্ঠীর জন্য নয়। যেটা দরকার, শুরু থেকেই সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা, পিছিয়ে পড়া গ্রুপকে যোগ্যতর করে গড়ে তোলা। তারপর যখন প্রতিযোগিতার সময় হবে, যোগ্যতা দিয়েই তারা পদ জিতে যাবে। সংস্কার শুরু করতে হবে গোড়াতেই। এই মুহূর্তে যেটা করা যেতে পারে, গ্রুপগুলোর প্রকৃত সংখ্যার হিসেবে শতাংশ নির্ধারণ করা এবং চাকুরিতে সেই গ্রুপগুলোর মোট যোগ্য আবেদনকারীর সেই নির্ধারিত শতাংশকে চাকুরিতে নেয়া। অর্থাৎ কোটা নির্ধারিত হতে হবে যোগ্য আবেদকের সংখ্যার উপর, গোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যার ভিত্তিতে নয়।

একটি সফল রাষ্ট্র তো সেটাই যেখানে মেধার ভিত্তিতে কিংবা যোগ্যতার আলোকে নির্ধারিত হবে যার যার স্হান। যেখানে সাম্য ও সমানাধিকার হাত ধরে এগুবে। যেখানে কেউ বঞ্চনার শিকার হবেনা। যেখানে কল্যাণ ও ন্যায় নিশ্চিত হবে ব্যক্তি পর্যায় থেকে।