বর্ণবাদ

বর্ণবাদ

মোঃ রফিকুল ইসলাম
বর্ণবাদ হচ্ছে এমন একটি বিশ্বাস যাতে এক বর্ণের লোকজন নিজেদেরকে অন্য বর্ণের লোকজনদের থেকে উচ্চতর বা অভিজাত মনে করে। ফলে তারা অন্য বর্ণের লোকজনদের উপর বৈষম্য বা শত্রুতামূলক আচরণ করে। তবে জাতিসংঘ বর্ণবাদ শব্দটির পরিবর্তে বর্ণ বৈষম্যকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য হিসেবে সজ্ঞায়িত করেছে। জাতিসংঘের বর্ণ বৈষ্যমেরে সংজ্ঞার মোদ্দা কথা হচ্ছে বর্ণ, গোত্র, জাতি, ভাষা বা ধর্মের কারনে এক জনগোষ্ঠী কর্তৃক অন্য জনগোষ্ঠীর উপর বৈষম্য বা নিপীড়নমূলক আচরন করা। আফ্রিকার কালোদের প্রতি আমেরিকা বা ইউরোপের বৈষম্য বা কালোদের দাস হিসেবে ব্যবহার ও ব্যবসা, জার্মানীর হিটলার কর্তৃক ইহুদি নিধন যা হলোকাস্ট নামে পরিচিত, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ যা এ্যাপার্থেড নামে অভিহিত বা হালের রোহিঙ্গা নিধন ইত্যাদি অসংখ্য বর্ণ বৈষম্যের ঘটনার কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।
বর্ণবাদের আরও গোটা কয়েক হালফিল উদাহরণ দেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সেদিন পর্যন্ত কালোদের প্রতি চরম বৈষম্যমূলক আচরন করা হত। ১৯৬৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদ বিরোধী নাগরিক অধিকার আন্দোলন নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ারকে সেন্ট অগাস্টিন, ফ্লোরিডার সাদাদের জন্য নির্ধারিত এক রেস্তোরাঁয় খাবার চেষ্টার জন্য আটক করা হয় এবং তাঁকে এজন্য এক রাত জেলবাসও করতে হয়। ১৯৬৩ সালেই প্রথম ইউনিভার্সিটি অব এ্যালাবামায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। ভিভিয়ান ম্যালোনি ছিলেন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কালো গ্রাজুয়েট। অর্থাৎ তখনও পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে কালোদের জন্য আলাদা রেস্তোরাঁ, উপাসনালয় ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় এ্যাপার্থেইড নামের রাষ্ট্রীয় বর্ণবাদ এইতো সেদিন ১৯৯৩ পর্যন্তও বলবত ছিল। আর আমাদের দেশে বৃটিশ আমলের বর্ণবাদী আচরণের একটা উদাহরণ দিলেই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছুটা আঁচ পাওয়া যাবে। সে সময়ে বৃটিশদের ক্লাবের তোরণে নাকি লেখা থাকতো “ডগস এ্যান্ড নেটিভস আর নট এ্যালাউড।” অর্থাৎ দেশীয়রা কুকুরের সমগোত্রীয়।

বর্ণবাদ নির্মূল করতে সারা দুনিয়ার বড় বড় নেতারা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু আজতক পৃথিবী থেকে বর্ণবাদ নির্মূল হয়নি। তাই আজও দেখি ফুটবল খেলায় কালো খেলোয়াড়দেরকে ব্যঙ্গ করে কলা দেখানো হয় বানরের উত্তর পুরুষ হিসেবে। সাদা বাবারা তাদের সন্তানদের উপদেশ দেয়, “বর্ণবাদী হইও না, বর্ণবাদ একটি অপরাধ এবং অপরাধ শুধু কালোদের জন্য।” অর্থাৎ সাদারা সব ধোয়া তুলসীপাতা।

কখনও কখনও বর্ণবাদকে উসকে দেয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত বর্ণবাদী নেতারা। এসব বর্ণবাদী নেতাদের জন তুষ্টিমূলক কথা-বার্তা ও কার্যকলাপের জন্য অনুপ্রাণিত হয় সাধারণ মানুষ। তাই তো ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিমা দুনিয়ায় দেশে দেশে মুসলিম নারী পুরুষ নানারকম নাজেহালের শিকার হয়। মেক্সিকানদের যুৃক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ট্রাম্প সরকার সীমান্তে দেওয়াল তুলে দিচ্ছে। তাতেও ক্ষান্ত নয় ট্রাম্প সরকার। তারা দেওয়ালের খরচও মেক্সিকান সরকারের নিকট থেকে আদায় করতে বদ্ধপরিকর। মেক্সিকানদের উপর মার্কিনীদের ক্ষোভের মাত্রা বুঝাতে এবারে একটা গল্প বলা যাক। এক কালো আফ্রিকান, এক সাদা আমেরিকান ও এক মেক্সিকান বেলুনে আকাশে ভ্রমণ করছে। হঠাৎ করে ফুটো হয়ে যাওয়াতে বেলুনটি দ্রুত নীচে নেমে আসতে লাগলো। সবাই বুঝতে পারলো বেলুনের ওজন কমাতে না পারলে দূর্ঘটনা অনিবার্য। তাই তারা তাদের জিনিসপত্র নীচে ফেলতে লাগলো। কালো আফ্রিকান তার পায়ের জুতা ফেলে দিয়ে বললো, “আমার দেশে এরকম জুতা অনেক আছে।” মেক্সিকান তার ল্যাপটপটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললো, “এ আমার দেশে অনেক আছে।” আমেরিকান তার জিনিসপত্র সরিয়ে রেখে মেক্সিকানকে দু’হাতে ধরে বেলুন থেকে ছুঁড়ে নীচে ফেলে দিয়ে বললো, “আমাদের দেশে এ জিনিস অনেক আছে।”বলে হাত ঝেড়ে শান্ত হয়ে বসলো।

বর্ণবাদের বিষবাষ্পে নিপীড়িত নিষ্পেষিত নির্যাতিত কালো মানুষেরা কতটুকু ক্ষুব্ধ তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আমেরিকার নিউিইয়র্ক শহরের এক উঁচু দালানে এক ভারতীয়, এক সাদা আমেরিকান, এক কালো আফ্রিকান ও এক মেক্সিকান আলাপ করছে। আলোচনার বিষয় কে তার স্বজাতির জন্য কতটুকু আত্মত্যাগ করতে পারে তা করে দেখাতে হবে। ভারতীয় দালানের কানায় গিয়ে আমার জনগনের জন্য বলেই সে দালান থেকে লাফিয়ে পড়লো। পরবর্তীতে মেক্সিকান আমার স্বজাতির উদ্দেশ্য বলে দালান থেকে লাফিয়ে পড়লো। এবারে কালো আফ্রিকানের পালা। সেও দালানের কানায় গেল। এটা আমার প্রিয় জনগনের জন্য বলেই সে সাদা আমেরিকানকে ছাদ থেকে ফেলে দিল।

কালো ও ইহুদিদের উপর বর্ণবাদী আচরণ করে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী সাদারা কালদের অপরাধী ও ইহুদিদের কৃপণ তকমা এটে দিয়েছে। তাইতো কালো ইহুদি শিশু আত্মপরিচয়ের দ্বিধায় পড়ে। যেমনটা পরের ঘটনায় দেখা যায়। এক কালো ইহুদী ছেলে একদিন স্কুল থেকে এসে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করছে, “বাবা, আমার পরিচয় কালো হিসেব গুরুত্বপূর্ণ নাকি ইহুদী হিসেবে।” বাবা জানতে চাইলেন, “কেন বাছা। তুমি কেন এসব জানতে চাইছো।” ছেলে বললো, “আমাদের স্কুলে একটা ছেলে একটা সাইকেল ৫০ ডলারে বিক্রি করতে চাচ্ছে। এখন আমি ৪০ ডলারে কিনতে তার সাথে দরাদরি করবো নাকি চুরি করবো।”

একটা সময় ইহুদিরা বর্ণবাদের শিকার হত। কিন্তু পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বর্ণবাদী হিটলারের জার্মান বাহিনীর নির্দয় ইহুদি নির্মূল ও ব্রিটিশ ও মার্কিনীদের ইহুদি তোষণের ফলে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিদের অবস্থা কেমন ছিল তার একটা আভাস পাওয়া যাবে পরের ঘটনায়। ১৯২৬ সালের শীতকাল। শিকাগোর থেলমা গোল্ডস্টেইন আনন্দ ভ্রমণে ফ্লোরিডা গেছেন। এলাকা সম্পর্কে ধারনা না থাকায় তিনি উত্তর মায়ামির একটি সংরক্ষিত হোটেলে ঢুকে পড়লেন। সে ম্যানেজারকে বললো, “আমার নাম মিস গোল্ডস্টেইন এবং আমার দু’সপ্তাহের জন্য ছোট্ট একটা রুম প্রয়োজন।” “আমি অত্যন্ত দূঃখিত।” ম্যানেজার জবাব দিল, “আমাদের কোন রুমই খালি নেই।” ম্যানেজার কথা বলতে বলতেই একজন লোক নেমে এসে চেক আউট করলো। “কি সৌভাগ্য”, মিস গোল্ডস্টেইন বললেন, “যাক এখন রুম ফাঁকা হল।” “মিস এখনই এত খুশী হবেন না। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, এটা একটা সংরক্ষিত হোটেল। ইহুদীরা এখানে থাকার অনুমতিপ্রাপ্ত নয়।” ‘ইহুদী? কে ইহুদী? আমি একজন ক্যাথোলিক।” মিস গোল্ডস্টেইন জানালেন। “আমার এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। বলুন তো খোদার পুত্র কে?”
“যীশু, মাতা মেরীর ছেলে।”
“তিনি কোথায় জন্মেছিলেন।”
“একটা আস্তাবলে।”
“কেন তিনি আস্তাবলে জন্মেছিলেন?”
“আপনার মত একজন মাথা মোটা বলদ একজন ইহুদীকে তার হোটেলে রুম ভাড়া দেয়নি।”

ইহুদিরা যেমন এক সময় বর্ণবাদের শিকার হত তেমনি নিজেরাও কিন্তু কম বর্ণবাদী নয়। আজ তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে ফিলিস্তিনি ভাইয়েরা। না, আপনাদেরকে মধ্যপ্রাচ্য সমস্যায় টেনে নিচ্ছি না। তারচেয়ে চলুন আমেরিকার এক বারে। না আপনাকে সেখানে পান করতে হবে না। বরঞ্চ দেখি ইহুদি সেখানে কি কান্ড ঘটায়। এক ইহুদি বারে গিয়ে কয়েক পেগ মদ গিললো। সে লক্ষ্য করলো একজন চাইনিজ এক কোনায় বসে চুপচাপ মদ খাচ্ছে। সে সেখানে গিয়ে হঠাৎ চাইনিজের মুখে এক ঘুষি মেরে বসলো। হতভম্ব চাইনিজ জিজ্ঞেস করলো কেন সে তাকে ঘুষি মারলো? ইহুদি উত্তর দিলো, “পার্ল হারবার ধ্বংসের জন্য।” চাইনিজ উত্তর দিলো, “কিন্তু আমি তো চাইনিজ।” “চাইনিজ জাপানিজ কোন পার্থক্য আছে?” বলে ইহুদি তার সীটে ফিরে গেল। কিন্তু চাইনিজেরতো আর মার্কিনীদের মত ইহুদি তোষণ করতে হয় না। সে কেন চুপচাপ ঘুষি হজম করবে। তাই কয়েক মিনিট পর চাইনিজ উঠে গিয়ে ইহুদির মুখে মারলো এক রাম ঘুষি। হতবাক ইহুদি জানতে চাইলো কেন তাকে ঘুষি মারা হল। চাইনিজ বললো, “এটা টাইটানিকের জন্য।” “কিন্তু টাইটানিক তো ডুবেছে আইসবার্গের সাথে ধাক্কা লেগে।” জানায় ইহুদি। চায়নাম্যান বললো, “আইসবার্গ, স্পিলবার্গ, গোল্ডবার্গ জাকারবার্গ কোঁই ফারাক নেহি।” বলে সে গট গট করে বেরিয়ে গেল। সকল বার্গেরা যে ইহুদি তা নিশ্চয়ই বুদ্ধিমান পাঠক বুঝতে পেরেছেন।

বর্ণবাদ কি আদৌ কোনদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে? দেখা যাক কি বলেন বাঘা বাঘা বর্ণবাদ বিরোধী নেতারা। বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রামী নেতা, জিম্বাবুয়ের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে বর্ণবাদ নিয়ে জটিল এক বক্তৃতা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ততদিন পর্যন্ত বর্ণবাদ পৃথিবী থেকে বিদায় হবে না যতদিন সাদা গাড়ি কালো টায়ার ব্যবহার করবে, যতদিন লোক মন্দভাগ্যের প্রতীক হিসেবে কালো রং এবং শান্তির প্রতীক হিসেবে সাদা রং ব্যবহার করবে। বর্ণবাদ শেষ হবে না ততদিন যতদিন বিয়েতে সাদা গাউন পরা হবে এবং শবযাত্রায় কালো পোষাক পরা হবে। ততদিন বর্ণবাদ শেষ হবে না যতদিন বিল শোধ না করায় সাদা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত না করে কালো তালিকাভূক্ত করা হবে। এমনকি স্নুকার খেলায় জিততে সাদা বল টেবিলে রেখে কালো বলকে গর্তে ফেলা হবে।

অবশেষ তিনি শান্তনা খুজেছেন এভাবে, “আমি এসব থোড়াই কেয়ার করি। ততদিন পর্যন্ত আমি সুখী যতদিন আমার কালো নিতম্ব সাদা টিস্যু পেপার দিয়ে পরিস্কার করবো।”

রবার্ট মুগাবে যত শান্তনাই খুজুন পৃথিবী থেকে কোনদিনই হয়ত বর্ণবাদ নির্মূল হবে না। বর্ণবাদের দেখা মিলবে হয়তোবা ভিন্ন নামে ভিন্নরূপে।