খুচরা ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন বছরে ৫০ হাজার নতুন ব্যবসায়ী

-প্রতি ১০ জনের তিনজন স্মার্টফোন ব্যবহার করেন
-ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বয়স ১৬-৩০ বছরের মধ্যে
-মাসিক আয় ৪৩৬ থেকে ৩ হাজার ১৯৫ ডলারের মধ্যে
-বার্ষিক ১ হাজার ৮৪২ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য কেনাবেচা

দেশে এখন বিভিন্ন ধরনের পণ্য কেনাবেচা করেন, এমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সংখ্যা ১৩ লাখের বেশি। মূলত দ্রুতবর্ধনশীল ভোগ্যপণ্যের (এফএমসিজি) খুচরা ব্যবসায় যুক্ত তারা। আর প্রতি বছর এ খাতে যুক্ত হচ্ছেন ৫০ হাজার নতুন ব্যবসায়ী। সম্প্রতি জাতিসংঘের ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইউএনসিডিএফ) পরিচালিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। সার্ক অঞ্চলে ইউএনসিডিএফের শেপিং ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স ট্রান্সফরমেশনস প্রোগ্রামের (শিফট সার্ক) আওতায় এ গবেষণা পরিচালিত হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে বার্ষিক ১ হাজার ৮৪২ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য কেনাবেচা হচ্ছে। ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিদিনের সংযোগের মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট ও অন্যান্য আর্থিক সেবার বাইরে রয়ে গেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ।

গুণগত ও পরিমাণগত পদ্ধতির সমন্বয়ে গবেষণাটি করা হয়। এজন্য সারা দেশে ২ হাজার ১০০ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ওপর জরিপ চালায় ইউএনসিডিএফ। গবেষণায় শিল্পনীতির মানদণ্ডে যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এফএমসিজি খাতের খুচরা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তাদেরই বিবেচনায় নেয়া হয়।

প্রসঙ্গত, জাতীয় শিল্পনীতি ২০১৬ অনুযায়ী, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মীসংখ্যা ১৫ জনের কম এবং ভূমি ও স্থাপনাসহ ১০ লাখ টাকার নিচে সম্পদ থাকলে তাকে ক্ষুদ্র ব্যবসা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উল্লেখযোগ্য অংশ বয়সে তরুণ। প্রতি ১০ জনের চারজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বয়স ১৬-৩০ বছরের মধ্যে। আর ১০ জনের মধ্যে ছয়জন কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। সাধারণত ছোট একটি টেবিল, দোকান বা গুদামের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাসিক আয় ৪৩৬ থেকে ৩ হাজার ১৯৫ ডলারের মধ্যে। আগে ছাত্রদের মধ্য থেকে এ ধরনের ব্যবসায় আসার প্রবণতা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে সে চিত্র পাল্টেছে। এখন অন্যান্য খাত থেকে খুচরা ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। খাতটির সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাইরে আরো প্রায় ২০ লাখ মানুষ জড়িত। এদের কেউ ব্যবসায় অর্থ লগ্নিকারী বা মালিক আবার কেউ কর্মী বা শ্রমিক।

জরিপে দেখা গেছে, ব্যবসা শুরুর পর একপর্যায়ে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ। ১০ জনের মধ্যে ছয়জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মধ্যে এ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে ব্যাংকঋণের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। এমনকি তাদের পণ্য ও সেবা সম্প্রসারণের জন্য অন্য কোনো খাত থেকেও সহায়তার বিষয়টি সীমিত।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরই সেলফোন রয়েছে। এদের প্রতি ১০ জনের তিনজন স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। আগের তুলনায় স্মার্টফোন সুলভ ও সহজলভ্য হওয়ায় এ সংখ্যাও বাড়ছে। বর্তমানে তাদের স্মার্টফোনের প্রধান ব্যবহারোপযোগিতা ইন্টারনেট ব্রাউজ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সীমাবদ্ধ। তবে আগামী দিনে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ, ক্রয়াদেশ, মূল্য পরিশোধ, আর্থিক লেনদেনসহ আরো বিভিন্ন কাজে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইউএনসিডিএফের গবেষণার তথ্য বলছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্রেডিট মার্কেটের আকার ৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারের মতো। ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো। এ খাতে অর্থায়নের চাহিদাও রয়েছে উল্লেখযোগ্য। গত বছর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ১০ জনের মধ্যে ছয়জনই বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়েছেন। গড়ে ১ হাজার ১১৬ ডলার করে ঋণ রয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর। আর ব্যক্তিঋণের আকার গড়ে ৮৭২ ডলার। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ব্যাংকের গ্রাহক হলেও বেশির ভাগই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ নিয়েছেন। ১০ জনের নয়জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনে করেন, ঋণ পাওয়ার জটিলতাই তাদের প্রধান বাধা।

সেলফোনে আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্ট রয়েছে প্রতি ১০ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মধ্যে তিনজনের। তবে তাদের সামান্য অংশই এ সেবা ব্যবহার করে পণ্য সরবরাহকারীর বিল প্রদান করেন। কারণ সরবরাহকারীদের অনেকেই এখনো এ পদ্ধতিতে আর্থিক লেনদেনে অভ্যস্ত নন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।