সামাজিক কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত বিষয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষের মাত্রা অনেক বেশি

দেশের স্বনামধন্য একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন আলাউদ্দিন মিয়া (ছদ্মনাম)। হেলপার হিসেবে যোগদানের পর তিনি টানা ১২ বছর কাজ করেছেন একটি কারখানায়। এ সময় তিনি কোনো ছুটি ভোগ করেননি। প্রতিদান হিসেবে কোম্পানি তাকে প্রতি বছর পুরস্কৃত করেছে।

আইনত প্রাপ্য ছুটি ভোগ না করার এমন উদাহরণ পোশাক শিল্পে অনেক। কারখানায় নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজ করাই এ খাতে স্বাভাবিক বিষয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পোশাক খাতের ৯৬ শতাংশ কর্মীই দৈনিক নির্ধারিত ৮ ঘণ্টার বেশি সময় কারখানায় কাজ করেন। বিনিময়ে তারা পান বেতনের অতিরিক্ত অর্থ।

ছুটি না নেয়া ও অতিরিক্ত কাজ করা পোশাক কারখানায় স্বাভাবিক হলেও খাতসংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় কমপ্লায়েন্স চ্যালেঞ্জ মনে করছেন। পণ্য জাহাজীকরণের জন্য স্বল্প সময় পাওয়া ও সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় বলে তারা জানান।

দেশের পোশাক শিল্পের সামাজিক কমপ্লায়েন্স নিয়ে এক সমীক্ষায় খাতটির এসব চ্যালেঞ্জ ও দুর্বলতার দিক উঠে এসেছে। ‘রেডিমেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ ইন বাংলাদেশ: এ স্টাডি অন সোস্যাল কমপ্লায়েন্স’ শীর্ষক সমীক্ষাটি করেছেন এ খাতেরই অন্যতম প্রতিষ্ঠান ব্যাবিলন গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ হাসান। পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্ট গবেষকের পরিচালিত সমীক্ষায় খাতটির অন্দরমহলের কর্মী-ব্যবস্থাপকদের তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি উঠে এসেছে বিশেষজ্ঞ মতামত ও বিশ্লেষণ। বই আকারে প্রকাশিত সমীক্ষাটির মোড়ক উন্মোচন হয়েছে গতকাল।

২০১৫ সালে পরিচালিত মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষায় দেখা যায়, কর্মঘণ্টার বিষয়টি পোশাক শিল্পের বিরাট চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এ খাতের ৯৬ শতাংশ কর্মীই নির্ধারিত সময়ের পরও কারখানায় কাজ করেন। ৬২ শতাংশ শ্রমিক দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজ করেন। ২৩ শতাংশ শ্রমিক কাজ করেন ১০ ঘণ্টা। ১২ শতাংশ শ্রমিক দৈনিক ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করেন। যদিও শ্রম আইনের ১০২ ধারায় প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কোনো অবস্থাতেই সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না বলে উল্লেখ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকের কাজের সন্তুষ্টি ও ব্যবসার প্রবৃদ্ধিই সামাজিক কমপ্লায়েন্সের মাধ্যমে কারখানায় প্রতিফলিত হয়। জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত বিষয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষের মাত্রা অনেক বেশি। ব্যবসা ও রফতানি প্রবৃদ্ধি ঘটলেও শ্রম ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে অসন্তোষ রয়ে গেছে।

জরিপে উত্তরদাতাদের সবাই বলেছেন, ৮ ঘণ্টা কাজের মজুরি জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট নয়। মজুরি কম হওয়ায় তারা অতিরিক্ত কাজ করতে আগ্রহী থাকেন। জীবনধারণের মৌলিক চাহিদাগুলো নির্ধারিত মজুরিতে মেটানো সম্ভব নয় বলে তারা উল্লেখ করেন। তবে অতিরিক্ত সময়ের কাজ বা ওভারটাইমের জন্য আইনত প্রাপ্য পারিশ্রমিক পোশাক শ্রমিকরা পান না।

দেখা গেছে, ওভারটাইমের জন্য দ্বিগুণ পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না। বড় কারখানাগুলো অতিরিক্ত সময়ের কাজের জন্য আইনত নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী ভাতা দিয়ে থাকে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নে উত্তরদাতা শ্রমিকদের ২২ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ওভারটাইমের জন্য আইন অনুযায়ী দ্বিগুণ পরিমাণ ভাতা পান না। কারখানাপ্রধানদের কাছে অতিরিক্ত সময় কাজের প্রয়োজনীয়তার যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেছেন, মূলত দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা ও রফতানির জন্য প্রাপ্ত সময়স্বল্পতার অতিরিক্ত সময় কাজ করাতে হয় শ্রমিকদের।

শ্রমিকের অতিরিক্ত কাজের কারণ সম্পর্কে পোশাক কারখানার কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপক ও কারখানাপ্রধানরা সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা ও পণ্য জাহাজীকরণের জন্য লিড টাইমের স্বল্পতাকে দায়ী করেছেন। তাদের ২১ শতাংশ জানিয়েছেন, অতিরিক্ত কাজের মূল কারণ দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা। ২০ শতাংশ বলেছেন, শর্ট লিড টাইম বা রফতানির জন্য বেঁধে দেয়া নির্ধারিত স্বল্প সময় অতিরিক্ত কাজের কারণ। ১৯ শতাংশ ব্যবস্থাপক শ্রমিকের অদক্ষতাকেই নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজের কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন। ১৭ শতাংশ বলেছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। এছাড়া পণ্যের নকশা পরিবর্তন ও বিভিন্ন উপকরণ অনুমোদন-সংক্রান্ত কারণে শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় বলে জানিয়েছেন যথাক্রমে ১০ ও ১৫ শতাংশ উত্তরদাতা।

সরবরাহ চেইনের দুর্বলতার বিষয়ে ব্যবস্থাপকরা জানান, বিভিন্ন ক্রেতার নিজস্ব শর্ত ও চাহিদা থাকে। যেমন একেকটি শার্ট তৈরিতে ছোট-বড় প্রায় ২০টি উপকরণ প্রয়োজন হয়। এসব উপকরণের জন্য কমপক্ষে ২০ সরবরাহকারকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এভাবে পাঁচটি অর্ডার থাকলে একটি কারখানাকে একই সময়ে ১০০ সরবরাহকারকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।

এ প্রসঙ্গে সমীক্ষা পরিচালনাকারী মোহাম্মদ হাসান বলেন, পোশাক শিল্পের কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলো বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন হয়েছে। যেমন— যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ারের ঘটনার পর সিকিউরিটি কমপ্লায়েন্স যুক্ত হয়, রানা প্লাজার পর যুক্ত হয়েছে ভবন ও অগ্নিসংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স। গবেষণায় দেখা গেছে, পোশাক কারখানায় সামাজিক কমপ্লায়েন্সের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শ্রমঘণ্টা। আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী একজন কর্মী বছরে ৩৫ দিন বিভিন্ন ছুটি ভোগ করার অধিকার রাখেন। তবে ৯৫ শতাংশ কর্মী আমাদের বলেছেন, তারা এ ছুটিগুলো পান না। কারণ উৎপাদনের চাপ ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা থাকে।

মোহাম্মদ হাসান বলেন, আইনেই এমন ধারা আছে, যার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে শ্রমিকদের ছুটি না নিতে প্রণোদিত করা হচ্ছে। ছুটির পরিবর্তে শ্রমিককে টাকা নিতে আগ্রহী করা হচ্ছে। এছাড়া নানা রকমের বাধা-বিপত্তির কারণেও শ্রমিকরা ছুটি নিতে পারেন না। আমি দেখেছি, যিনি ছুটি নেন না তাকে পুরস্কৃত করা হয়।

পোশাক কারখানায় প্রচলিত ট্রেড ইউনিয়ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা কম বলে সমীক্ষার সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে। এজন্য বিকল্প হিসেবে অংশগ্রহণমূলক কমিটির কার্যকারিতা বৃদ্ধির পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিও পোশাক শিল্পের সামাজিক কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে সমস্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি সংস্থা, কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা চাপানো হয়েছে উল্লেখ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ফায়ার সার্ভিস এবং নিপসমের মতো সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে প্রকাশনায়।

শ্রমিকদের ঘন ঘন কারখানা বদল ঠেকাতে সার্ভিস বুক কার্যকর করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া কমিউনিটি রেডিওর ব্যবহার করতে সুপারিশ করা হয়েছে শ্রমিক অধিকারবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে। বিদেশী কর্মীর আধিক্য কমাতে স্থানীয়দের দক্ষতা উন্নয়নের পরামর্শ উঠে এসেছে সমীক্ষার ফলাফলে। সামাজিক কমপ্লায়েন্স রক্ষণাবেক্ষণে একটি সমন্বিত মানদণ্ড তৈরির তাগিদও দেয়া হয়েছে এতে। ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক কারখানাগুলোতে যেসব অঞ্চলের শ্রমিক বেশি, সে জেলাগুলোয় কারখানা স্থাপনের পরামর্শও দেয়া হয়েছে প্রকাশিত সমীক্ষায়।