এখনই পছন্দের পদে যাওয়ার উপযুক্ত সময়

নির্বাচনের আগে ব্যস্ততা বেড়েছে সচিবালয়ে

ফাইল ছাড়াতে দৌড়ঝাপ মন্ত্রী-এমপিদের ॥ পদোন্নতি ও বদলির তদবিরে কর্মকর্তারা

 একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি মাত্র তিন মাস। ফলে সরকারের শেষ সময়ে এসে কর্মব্যস্ততা বেড়েছে সচিবালয়সহ সরকারি দফতরগুলোতে। ফাইল ছাড় করাতে মন্ত্রী-এমপিসহ দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিশেষ করে প্রকল্প পাস করানো বা বদলির ফাইলগুলো নিয়ে তৎপর সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনকালীন সরকার গঠন ও তফসিল ঘোষণার আগেই প্রকল্প অনুমোদন এবং সংশোধনের হিড়িক পড়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। তার মধ্যে বেশির ভাগ প্রকল্পই ভোটাদের খুশি করার নির্বাচনি প্রকল্প। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো তেমন যাচাই-বাছাই না করেই প্রকল্প পাঠাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশনে। আর পরিকল্পনা কমিশনও অতিরিক্ত চাপে তেমন বেশি যাচাই না করেই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) পাঠাচ্ছে। এতে করে প্রকল্পের মান রক্ষা ও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া অনেক প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে, যা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প বেশি আসছে। কারণ জনপ্রতিনিধিরা চায় তাদের এলাকার প্রকল্প বেশি অনুমোদন পাক। এ জন্যই প্রকল্পের একটু চাপ আছে। তবে এসব প্রকল্পের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। বছরের এই সময়ে সাধারণত প্রকল্প চাপ একটু বেশি থাকে।

জানা গেছে, অক্টোবর মাসের শেষ দিকে অথবা নভেম্বরের শুরুতে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। আর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে নভেম্বরে। এই সময়ে সরকার তার ?রুটিন কাজের বাইরে কিছুই করতে পারবে না। ফলে অপেক্ষমাণ ফাইলগুলো এই সময়ের মধ্যেই ছাড় করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মন্ত্রী-এমপি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিশেষ করে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প, বিগত নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুত প্রকল্প এবং কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতির কাজটি চলতি মাসের মধ্যেই সম্পন্ন করতে চাচ্ছেন সবাই।

জানা গেছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। উন্নয়নমূলক কাজ জনগণের সামনে তুলে ধরতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। আর এসব প্রকল্পের বেশির ভাগই রাস্তা-ঘাট, গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের। যেহেতু সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর, ফলে তাদের মাধ্যমেই এসব প্রকল্পের অর্থ ব্যয় হবে। এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবেই কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়গুলো।

সচিবালয় ঘুরে দেখা গেছে, ফাইল ছাড় করানো নিয়ে কর্মব্যস্ততার শীর্ষে রয়েছে শিক্ষা, প্রাথমিক গণশিক্ষা, বাণিজ্য, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, জনপ্রশাসন, এলজিআরডি, ভূমি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও খাদ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়াও অন্য মন্ত্রণালয়েও কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রিসভায় উত্থাপনের জন্য অপেক্ষায় থাকা বিলগুলো নিয়ে ব্যস্ততা লক্ষ্য করা গেছে। এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০১৮ (সংশোধন) বিলটি সংসদে উত্থাপন করতে হবে। ইতিমধ্যে এটি মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়া উন্নয়ন মেলায় আমাদের ১০ বছরের উন্নয়ন কাজগুলো উপস্থাপন করেছি। ফলে মন্ত্রণালয়ে কাজের বেশ তোড়জোড় আছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের শেষ সময়ে পদোন্নতির আবেদন আসছে বেশি। অনেকের ধারণা এখনই পছন্দের পদে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। নতুন সরকার আসার পর প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হতে সময় লাগবে। ফলে তখন পছন্দের পদ নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই অনেকে পদোন্নতির আবেদন করছেন। সচিলায়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরু থেকে অপেক্ষমাণ ফাইলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তোড়জোড় বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তদবির ও সুপারিশ আসছে। এছাড়াও বদলি ও প্রশাসনিক কাজগুলো শেষ করার তাগিদ রয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব বলেন, সরকারের শেষ সময়ে কাজের চাপ থাকবেই। তফসিল ঘোষণা হলে অনেক কিছুতে বাধ্যবাধকতা থাকে। আমরা এখন কোনো ফাইল অপেক্ষমাণ রাখছি না। এখন কিছু বদলির সুপারিশ আছে, তবে এক্ষেত্রে গত পোস্টিংয়ের মেয়াদ বিবেচনা করে বদলি করা হবে। অন্যদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজের বেশ চাপ লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বদলির চাপ রয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এছাড়াও পদোন্নতির জন্য তদবিরও করছেন অনেকে। তবে নির্বাচনের আগে কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় গণপূর্ত, ভূমিসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের আগে শিক্ষা প্রশাসনে বড় ধরনের নিয়োগ ও পদোন্নতির তোড়জোড় চলছে। ইতিমধ্যে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে বড় ধরনের নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। আরো কয়েকটি নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশনার পর অপেক্ষমাণ যত পদোন্নতি ও নিয়োগ রয়েছে সব শেষ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষা ক্যাডারে সহযোগী অধ্যাপক থেকে রেকর্ড সংখ্যক ৪০৯ জনকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। পদ না থাকার পরও ৪০৯ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। একইভাবে সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়ার জন্য আগামী ১৪ অক্টোবর বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি (ডিপিসি) সভা ডাকা হয়েছে। পদ না থাকার পরও এ পদে হাজারের বেশি পদোন্নতি দেয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। এরপর চলতি মাসেই প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপকে আরো বড় ধরনের পদোন্নতি দেয়ার প্রস্তুতি সেরে রেখেছে মাউশি। ইতিমধ্যে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪২০ জন শিক্ষককে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৭১ জন সহকারী প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকা এবং ৫২ জন সহকারী মাধ্যমিক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা) ৩৮ হাজার ৮০০টি শিক্ষকের শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর পদোন্নতি তালিকায় আছে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকরা।
গত কয়েকদিনে সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে দেখা গেছে, মন্ত্রণালয়গুলো নতুন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর কাজে সব থেকে বেশি ব্যস্ত। কারণ সরকারের শেষ সময়ে প্রকল্পের তেমন যাচাই-বাছাই হয় না। সহজেই পাস হয়ে যায়। শিক্ষা, গণপূর্ত, ভূমি, বিদ্যুৎ, সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগ, কৃষি, স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, সড়ক ও সেতু এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে  প্রায় অর্ধশতাধিক  প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর জন্য কাজ চলছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রায় ২০০ প্রকল্প একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তার মধ্যে ১০০’-এর মতো প্রকল্প প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে, আর বাকিগুলো প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অথবা অ্যাপ্রেইজাল সভা পর্যায়ে রয়েছে। আরও প্রকল্প আসতেই আছে। প্রতিদিনই কয়েকটি করে প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে আসছে। আর এসব প্রকল্প অনুমোদনের জন্য তদবির করছেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও মেয়রসহ প্রকল্প পরিচালকরা। এদিকে চলতি সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অনুমোদন পেয়েছে ৩৭টি প্রকল্প। গত মঙ্গলবার নরসিংদীর পলাশে নতুন একটি ইউরিয়া সার কারখানা; চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল আনতে পাইপলাইন স্থাপন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপনসহ ২০টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৫২৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ১৫ হাজার ৪৯৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা থেকে আসবে ১১ হাজার ৬৫৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং বিদেশি সহায়তা থেকে আসবে ৫ হাজার ৩৭৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অপরদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরে-বাংলা নগরে এনইসিতে একনেক সভায় ফরিদপুর-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণসহ ১৭ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনের আগে সরকারের শেষ সময়ে প্রকল্প পাসের হিড়িক পরে যায়। নির্বাচন সামনে থাকায় সবাই চাচ্ছেন তাদের প্রকল্প অনুমোদন করাতে। স্বাভাবিকভাবেই সংসদ সদস্যরা তাদের এলাকার প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যস্ত হয়ে উঠেন। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় নিয়মনীতিও মানতে নারাজ তারা।