কে এই খাসোগি কেন এই জিঘাংসা

৭ মিনিটেই খাসোগিকে শেষ করে দেয় ঘাতকেরা

৭ মিনিটেই খাসোগিকে শেষ করে দেয় ঘাতকেরা

সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের সাত মিনিটের মধ্যে ঘাতকরা সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে টুকরো টুকরো করে হত্যা করে বলে জানিয়েছে মিডল ইস্ট আই পত্রিকা।

খাসোগির জীবনের শেষ মুহূর্তের অডিও রেকর্ডিং পুরোটা শুনেছেন এমন একজন তুর্কি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে একথা জানায় পত্রিকাটি।

খবরে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নয় খাসোগিকে হত্যার জন্যই ইস্তাম্বুলে গিয়েছিল সৌদি ঘাতকেরা।

খাসোগিকে সৌদি এজেন্টরা জিজ্ঞাসাবাদের সময় ভুলক্রমে তিনি নিহত হন, সৌদি আরব এমন রিপোর্ট তৈরি করছে বলে খবর প্রকাশ হওয়ার পর মিডল ইস্ট আই হত্যাকাণ্ডের বিশদ বিবরণ প্রকাশ করল।

বীভৎস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় তুরস্কের সূত্রটি জানায়, খাসোগিকে কনসাল জেনারেলের অফিস থেকে টেনে-হিঁচড়ে পাশের একটি কক্ষের টেবিলের ওপর নিয়ে ফেলা হয়।

এসময় নিচের তলায় উপস্থিত একজন ব্যক্তিও ভয়ঙ্কর চিৎকারের শব্দ শুনতে পান বলে জানায় সূত্রটি।

‘স্বয়ং কনসালকেও তার কক্ষ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ঘাতকরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই গিয়েছিল,’ মিডল ইস্ট আইকে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

একসময় খাসোগিকে কোনো ধরনের চেতনানাশক দিয়ে তার চিৎকার বন্ধ করা হয়। গত ২ অক্টোবর খাসোগি ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর থেকে তার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওইদিন খাসোগি তার আগের বিয়ের তালাকের কাগজপত্র আনতে সৌদি কনস্যুলেটে গিয়েছিলেন।

এর আগের দিন একটি ব্যক্তিগত বিমানে ১৫ জন ঘাতকের একটি দল সৌদি থেকে ইস্তাম্বুলে গিয়ে পৌঁছান। এদের মধ্যে সৌদি নিরাপত্তা বিভাগে ফরেনসিক প্রধান সালাহ মুহাম্মদ আল-তুবাইগিও ছিলেন।

খাসোগি জীবিত থাকতেই তাকে টেবিলের ওপর টুকরো টুকরো করতে শুরু করে তুবাইগি, জানায় তুরস্কের সূত্রটি।

হত্যাকাণ্ড শেষ করতে সাত মিনিট সময় লাগে, যোগ করে সূত্রটি।

খাসোগির দেহ কাটার সময় তুবাইগি কানে ইয়ারফোন দিয়ে গান শুরু করে এবং দলের অন্যান্যদেরও একই কাজ করতে বলে।

‘আমি কাজ করার সময় গান শুনি। তোমাদেরও একই কাজ করা উচিৎ,’ অডিও রেকর্ডিং-এ তুবাইগিকে বলতে শোনা যায়।

মিডল ইস্ট আই জানায়, অডিও রেকর্ডিং-এর তিন মিনিট অংশ তুরস্কের সাবাহ পত্রিকাকে দেয়া হয়েছে তবে তারা সেটি এখনও প্রকাশ করেনি।

তুরস্কের একটি সূত্র মার্কিন পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানায়, তুবাইগি সৌদি ফেলোশিপ অফ ফরেনসিক প্যাথলজির প্রেসিডেন্ট।

২০১৪ সালে লন্ডনভিত্তিক সৌদি পত্রিকা আশারাক আল-আসওয়াত তুবাইগির একটি সাক্ষাৎকার নেয়। সেখানে সে একটি মোবাইল ক্লিনিকে কিভাবে সাত মিনিটের মধ্যে মৃত হজ যাত্রীদের অটোপসি করার বিষয়ে কথা বলে। এই মোবাইল ক্লিনিক ক্রাইম সিনেও ব্যবহার করা সম্ভব বলে জানায় সে।

গত ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে খাসোগি তার আগের আগের তালাকের কাগজপত্র আনতে যান। এসময় কনস্যুলেটের বাইরে তার বাগদত্তা হাতিস চেঙ্গিজের কাছে তিনি তার ফোনটি রেখে যান। তিনি ফিরে না এলে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের এক উপদেষ্টা ফোন করার নির্দেশও হাতিসকে দিয়ে যান খাসোগি। ওই দিন মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষার পর হাতিস তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেন।

খাসোগি সৌদি যুবরাজ তথা রাজপরিবারের সমালোচনা করায় সৌদি পত্রিকায় তার কলাম বন্ধ করে সতর্ক করে দেয়া হয়। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে গিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় লেখালেখি করছিলেন।

খাসোগির পরিচিত একজন গণমাধ্যমকে জানান, তাকে প্রলোভন দেখিয়ে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যও চেষ্টা করেছিল সৌদি সরকার।

তুরস্কের কর্মকর্তারা বলছেন খাসোগিকে কনস্যুলেটের ভিতর হত্যা করা হয়েছে তার অডিও এবং ভিডিও প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। কিন্তু, সৌদি কর্তৃপক্ষ খাসোগি নিখোঁজের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে।

বিশ্বব্যাপী এ মুহূর্তে তুমুল আলোচিত নাম সাংবাদিক জামাল খাসোগি। এমকি তাকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিশ্ব রাজনীতিও। সৌদি আরবের স্বেচ্ছানির্বাসিত ভিন্নমতালম্বী এ সাংবাদিক গত ২ অক্টোবর তুরস্কে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটে যাওয়ার পর থেকে লাপাত্তা। তবে ইতোমধ্যে প্রায় নিশ্চিত, খাসোগি খুন হয়েছেন।

তুরস্ক শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, ভিসা সংক্রান্ত কাজে সৌদি কনস্যুলেট কার্যালয়ে প্রবেশ করার পর আর বের হননি খাসোগি। অন্যদিকে প্রথমে সৌদি দাবি করেছিল, মূলদ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেও খাসোগি বের হয়ে গেছেন পেছনের গেট দিয়ে। কিন্তু তুরস্ক পাল্টা দাবি করেছে, সিসিটিভি রেকর্ডে তা নেই। এরপরই বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে, খাসোগি খুন হয়েছেন। সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, অবশেষে জামাল খাসোগির মৃত্যুর কথা স্বীকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। সৌদির রাজপরিবারের প্রতিনিধিদের তদন্তের সময় মারা গেছেন খাসোগি-তাদের বিবৃতিতে এমনটা থাকতে পারে।

তুর্কি পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, খাসোগিকে কনস্যুলেট ভবনের ভেতরে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যা মিশনে অংশ নেয় রিয়াদ থেকে ইস্তাম্বুলে আসা ১৫ সদস্যের সৌদি স্কোয়াড। এ সদস্যের একজন সৌদি ফরেনসিক বিভাগের লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালাহ মুহাম্মদ আল-তুবায়গি। এদিকে নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক খবরে বলা হয়েছে, সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান খাসোগিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও অপহরণের অনুমোদন দেন। তবে সৌদি সরকার এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

খাসোগির মৃত্যু নিয়ে তুরস্কসহ পশ্চিমা বিশ্বের অভিন্ন দাবির পেছনে আছে সিসিটিভি ফুটেজ। এ ছাড়াও বলা হচ্ছে, সাংবাদিক জামাল খাসোগি বন্দি, নির্যাতন ও ‘হত্যা’র ঘটনা নিজেই রেকর্ড করেছিলেন। সৌদি কনস্যুলেটে ঢোকার আগে তিনি নিজের অ্যাপল ওয়াচে রেকর্ডিং চালু করেন। পরে কনস্যুলেট ভবনে প্রবেশের পর তাকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন ও সবশেষে ‘হত্যা’র ঘটনা সবই ওই অ্যাপল ওয়াচে রেকর্ড হয়। পরে সেগুলো তার ব্যবহৃত আইফোন ও তথ্য সংরক্ষণের অনলাইন স্টোরেজ ‘আইক্লাউডে’ জমা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাদশা সালমানের সঙ্গে খাসোগির বিষয়ে ফোনে কথা বলেছেন। ট্রাম্প এই ঘটনাকে ‘ভয়ঙ্কর’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া এ বিষয়ে জানতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া তুরস্কসহ এ নিয়ে সরব পশ্চিমা বিশ্ব। সব মিলিয়ে জামাল খাসোগি ইস্যুতে ক্রমাগত চাপ বাড়ছে সৌদি আরবের ওপর।

প্রশ্ন উঠেছে, কে এই খাসোগি। কেনই বা তার ওপর সৌদি আরবের এত ক্ষোভ। এক কথার উত্তর-সৌদি যুবরাজের মোহাম্মদ বিন সালমানের কড়া সমালোচক ছিলেন খাসোগি। ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কলাম লিখতেন তিনি। সঙ্গত কারণেই রাজপরিবারের রোষে পড়ে গ্রেপ্তার আতঙ্কে এক বছর আগে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন।

যুবরাজ সালমানের শাসনে সৌদি আরবের পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে খাসোগি একবার লিখেছিলেন, ‘যখন আমি ভয়, হুমকি, মনের কথা অকপটে বলার মতো দুঃসাহসী বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় নেতাদের গ্রেপ্তার ও প্রকাশ্যে অপমান করার বিষয়ে কথা বলি এবং ওই সময়ে যদি আমি আপনাকে জানাই যে আমি সৌদি আরবের মানুষ, তখন কি আপনি বিস্মিত হবেন?’ এই একটি বাক্যেই তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, সৌদিতে ভিন্নমত পোষণকারীদের প্রতি কতটা দমন-নিপীড়ন চলে।

আল-জাজিরার এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ও আরব বিশ্বে নিজের প্রজন্মের সবচেয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একজন ছিলেন খাসোগি। প্রায় ৩০ বছর ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত তিনি। ১৯৫৮ সালে সৌদি আরবের মদিনায় জন্ম। একসময় তিনি সৌদি রাজপরিবারের ক্ষমতাবৃত্তের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু যখন থেকে সৌদি আরবের অনেক নীতিমালার সমালোচনা করতে শুরু করলেন তখন থেকেই তিনি রাজপরিবারের টার্গেট। বিশেষ করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই তার জীবন আরও সংশয়ের মুখে পড়ে।

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর লেখা তার কলামের শিরোনাম ছিল, ‘সৌদি আরব সব সময় এমন দমনকারী ছিল না, এখন সেটা অসহনীয়’। এতে তিনি লেখেন, ‘তরুণ ক্রাউন প্রিন্স (পরবর্তী শাসক) মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতায় আসার পর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিনি আমাদের দেশটিকে আরও উদার, সহিষ্ণু করে গড়ে তুলবেন। কিন্তু এখন আমি দেখতে পাচ্ছি, সেখানে একের পর এক গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন আমার ভালো বন্ধু। আমার দেশের নেতৃত্বের ব্যাপারে যারা দ্বিমত প্রকাশের দুঃসাহস দেখিয়েছেন, সেই বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে।’