জামানতবিহীন ঋণ, নামমাত্র জামানতের বিপরীতে দেয়া ঋণের বড় একটি অংশ বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়েছে

নামমাত্র জামানতে বড় ঋণ

জুন পর্যন্ত এ ধরনের ঋণ আড়াই লাখ কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের খতিয়ে দেখা উচিত – খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

-হামিদ বিশ্বাস

ব্যাংকিং খাতে কর্পোরেট ঋণের ছড়াছড়ি। বড় অঙ্কের এসব ঋণের জামানত নেই বললেই চলে। জুন পর্যন্ত এ ধরনের বড় ঋণ আড়াই লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। জামানতবিহীন ঋণগুলো এখন খেলাপি হয়ে পড়ছে। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম শীর্ষ খেলাপির তালিকায়ও চলে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একশ্রেণীর অসাধু গ্রাহক ও ব্যাংকার কর্পোরেট গ্যারান্টির অপব্যবহার করছেন। কর্পোরেট গ্যারান্টির এগেইনিস্টে লোন বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি জামানত হিসেবে ব্যবহার করে ঋণ, ন্যাম গ্যারান্টির এগেইনিস্টে লেন্ডিং বা নাম পরিচিতি জামানত হিসাবে ব্যবহার করে ঋণ এবং পার্সোনাল গ্যারান্টির এগেইনিস্টে লেন্ডিং বা ব্যক্তি পরিচিতি জামানত হিসেবে ব্যবহার করে ঋণ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া জামানতবিহীন এসব ঋণ ছাড়ে কিছু অসাধু ব্যাংকার গ্রাহকের সঙ্গে যোগসাজশ করে কমিশন গ্রহণেরও অভিযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, কোনো কর্পোরেট ঋণে সরকার গ্যারান্টার হলে অসুবিধা হবে না। তবে কর্পোরেট গ্যারান্টির বিপরীতে বেসরকারি খাতে অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে খতিয়ে দেখা উচিত।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার ও একটি ব্যাংকের সাবেক এমডি যুগান্তরকে বলেন, এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংকের পরিচালকের সঙ্গে যে ঋণ ভাগাভাগি করেন সেক্ষেত্রে কর্পোরেট গ্যারান্টি ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ সোজা কথা- ব্যাংকের পরিচালককে দেয়া বিপুল অঙ্কের ঋণের কোনো জামানত নেই। জামানতবিহীন এসব ঋণের বেশির ভাগই আদায় হয় না। ভবিষ্যতে এসব ঋণই খেলাপি দেখানো হবে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ বিতরণ করা হয় প্রায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর্পোরেট গ্যারান্টির বিপরীতে (ফান্ডেড-নন ফান্ডেড) ঋণ দেয়া হয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, কর্পোরেট গ্যারান্টির বিপরীতে দেয়া ঋণ এবং জামানতবিহীন ঋণের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। যদিও এটি বৈশ্বিকভাবে চর্চিত একটি ফর্মুলা। তবে আমাদের দেশে এর অপব্যবহার বেশি হচ্ছে। সে কারণে ফর্মুলাটি নানাভাবে পরিহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, কর্পোরেট গ্যারান্টির বিপরীতে দেয়া ঋণের বেশির ভাগই গেছে মাত্র ছয় ব্যাংকের মাধ্যমে। প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ১ লাখ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ১৮ হাজার কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংকের ১৮ হাজার কোটি টাকা, একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ১৩ হাজার কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১১ হাজার কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া কর্পোরেট গ্যারান্টির বিপরীতে বাকি ঋণ গেছে ৫১ ব্যাংকের মাধ্যমে।

ব্যাংকাররা বলছেন, রূপপুর প্রকল্পের সব ঋণপত্র (এলসি) সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে খোলা হয়েছে। এ প্রকল্পের গ্যারান্টার সরকার নিজেই। এছাড়া সরকার আরও যেসব প্রকল্পে গ্যারান্টার রয়েছে সেসব প্রকল্পে সমস্যা হবে না।

কিন্তু ব্যক্তিমালিকানার প্রকল্পে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে যেসব অসাধু গ্রাহক, যারা আগে থেকে ব্যাংকিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি; তাদের কর্পোরেট গ্যারান্টির বিপরীতে ঋণ সুবিধাকে জামানতবিহীন ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব অসাধু চক্রের ঋণ কখনও ফিরে আসবে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকগুলোকে জামানতযুক্ত ঋণ বিতরণে নির্দেশনা দেয়া আছে। তবে বর্তমানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বা এসএমই খাতে ঋণ বিতরণে বেশি উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। কারণ এ খাতে ঋণ গেলে মানুষ এবং দেশের উন্নতি সমানভাবে হবে।

সূত্র জানায়, জামানতবিহীন ঋণ, কর্পোরেট গ্যারান্টির বিপরীতে ঋণ বা নামমাত্র জামানতের বিপরীতে দেয়া ঋণের বড় একটি অংশ বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম শীর্ষ খেলাপির তালিকায়।

একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ চট্টগ্রাম ভিত্তিক কোম্পানি ইলিয়াস ব্রাদার্সের। ১৩টি ব্যাংকে প্রায় ৯১৫ কোটি টাকা ঋণখেলাপি এই প্রতিষ্ঠান। কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেমস লিমিটেডের ঋণখেলাপি প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে কোনো ধরনের জামানতও রাখা হয়নি। আর জামানত না থাকায় খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় সম্ভব নয়। অর্থাৎ সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমেই নেয়া হয়েছে ঋণ।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সৈকত ঘেঁষে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইলিয়াস ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড। কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই ২০০৯ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে ২৩৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ঋণ দেয়। এক্ষেত্রে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা এবং শর্তও মানা হয়নি। পরবর্তী ২ বছরে মাত্র ৩৩ কোটি টাকা পরিশোধ করে ইলিয়াস ব্রাদার্স।

বাকি ২০৫ কোটি টাকা পরিশোধ না করে লোকসানি দেখানো হয় প্রতিষ্ঠানকে। বর্তমানে সুদ-আসল মিলিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকটির পাওনা প্রায় ২৯০ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, একই প্রতিষ্ঠান আরও ১২টি ব্যাংকে ঋণখেলাপি। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকে প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকে ৭৩ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকে খেলাপি প্রায় ৬৩ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংকে ৫৮ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংকে ৫৫ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ৫৪ কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংকে ৫৩ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংকে ৪০ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়ায় ৩৪ কোটি টাকা, ওয়ান ব্যাংকে ২৮ কোটি টাকা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংকে ইলিয়াস ব্রাদার্সের সাড়ে ৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। নিয়ম অনুসারে এক ব্যাংকে খেলাপি ঋণ থাকলে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার কথা নয়। কিন্তু এসব নিয়ম-কানুনের কোনো তোয়াক্কা করেনি ব্যাংকগুলো।

এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে ম্যাক্স স্পিনিং মিলের খেলাপি প্রায় ৫৩০ কোটি টাকা, বেনে টেক্সের ৫০১ কোটি টাকা, ঢাকা ট্রেডিং হাউসের ৪৯০ কোটি টাকা, আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের ৪৮৫ কোটি টাকা, সিদ্দিক ট্রেডার্সের ৪৪০ কোটি টাকা, ইয়াসির এন্টারপ্রাইজের ৪১৬ কোটি টাকা, আলফা কম্পোজিট টাওয়েল ৪০৮ কোটি টাকা, হলমার্ক ফ্যাশন ৩৪৬ কোটি, ম্যাক ইন্টারন্যাশনাল ৩৪০ কোটি, মন্নো ফেব্রিকস ৩৩৬ কোটি টাকা, ফেয়ার ট্রেডার্স ৩২৫ কোটি, সাহারিশ কম্পোজিট ৩১৫ কোটি, সালেহ কার্পেট মিলস ২৮৮ কোটি এবং ফেয়ার ইয়ার্ন প্রসেসিংয়ের ২৭৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। নামমাত্র জামানতের কারণে এসব খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা। সরকারি ৬ ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটি জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত ফান্ডেড (নগদ) ও নন-ফান্ডেড (এলসি ও ব্যাংক গ্যারান্টি) মিলে ১১ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এছাড়া সোনালী ব্যাংক ৫ হাজার ৮৫ কোটি, অপর একটি সরকারি ব্যাংক ৪ হাজার ৩০৭ কোটি, রূপালী ব্যাংক ২ হাজার ৩৮১ কোটি, বেসিক ব্যাংক ১ হাজার ৬২৮ কোটি এবং বিডিবিএল ৩৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। বেসরকারি ৪০টি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণ দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক।

ব্যাংকটি জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত ঋণ দিয়েছে ৩৬ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এছাড়া এক্সিম ব্যাংক ১৪ হাজার ৫৫৩ কোটি, সাউথইস্ট ১৩ হাজার ৯১১ কোটি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ১৩ হাজার ৪০৯ কোটি, ব্যাংক এশিয়া ১২ হাজার ৮৫৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক ১১ হাজার ৬৬৯ কোটি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ১১ হাজার ২২৪ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১১ হাজার ১৮০ কোটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ১০ হাজার ৭৮৯ কোটি, যমুনা ব্যাংক ১০ হাজার ৩৪৯ কোটি, এনসিসি ব্যাংক ৮ হাজার ৮১৭ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংক ৭ হাজার ৮৭৯ কোটি, প্রাইম ব্যাংক ৭ হাজার ৮০৮ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৭ হাজার ৬৭৭ কোটি এবং ঢাকা ব্যাংক ৬ হাজার ৩৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। বাকি ঋণ দিয়েছে অন্যান্য ব্যাংক।

সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে ইসলামী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের এমডির কাছে অতিমাত্রায় ঋণ দেয়ার ব্যাখ্যা তলবের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জবাব সন্তোষজনক না হলে উভয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।