গার্মেন্টসের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের আওতায় ৩৭ লাখ শ্রমিক

বিভিন্ন এলাকায় গার্মেন্টস কারখানায় শ্রম অসন্তোষ হয়। এর সঙ্গে কারা জড়িত, এই তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে। ফলে কোনো শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা, শ্রম আইন বিরোধ কর্মকাণ্ড কিংবা শ্রম অসন্তোষে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে মালিকপক্ষ এর মাধ্যমে সহজে তথ্য জানতে পারবে। ফলে অন্য কারখানায় গিয়েও ওইসব শ্রমিকের কাজ পাওয়া কঠিন হবে।


গত তিন বছরে ২ হাজার গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকের তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে পেরেছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। তাতে দেখা গেছে, এসব কারখানায় শ্রমিক সংখ্যা ৩০ লাখের কিছু বেশি। সেই হিসেবে প্রতিটি কারখানায় গড়ে দেড় হাজার শ্রমিক কাজ করে। বিজিএমইএ’র সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। পোশাক শিল্প মালিকদের আরেকটি সংগঠন বিকেএমইএ সূত্র জানিয়েছে, তাদের তথ্যভাণ্ডারে এসেছে আরো সাত লাখ শ্রমিক। একই কারখানা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ— উভয় সংগঠনের সদস্য হলেও আলোচ্য সাত লাখ শ্রমিক বিজিএমইএ’র তালিকায় আসেনি। সেই হিসেবে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে ৩৭ লাখ শ্রমিকের তথ্য পাওয়া গেছে।

এর বাইরে বিজিএমইএ’র সদস্যভুক্ত চলমান আরো প্রায় ৭শ’ কারখানা এখনো তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আসেনি। এ কারখানাগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের। অন্যদিকে বিকেএমইএ’র আরো প্রায় ১ লাখ শ্রমিক তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আসবে। সব কারখানা হিসাবভুক্ত হলে এ খাতে শ্রমিক সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি বলে মনে করেন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি ফজলে শামীম এহসান ইত্তেফাককে বলেন, সদস্যভুক্ত কারখানার মধ্যে ৮১০টি’র শ্রমিকের তথ্য নেওয়া হবে। এর মধ্যে ৭ লাখ শ্রমিক তথ্যভাণ্ডারের আওতায় এসেছে। এই সংখ্যা বিজিএমইএ’র তথ্যের বাইরে। আরো এক লাখ শ্রমিক যুক্ত হবে।

অন্যদিকে এ দুটি সংগঠনের সদস্য নয়— এমন কারখানার শ্রমিক সংখ্যা যুক্ত হলে এ সংখ্যা ৪৫ লাখ পার হওয়ার কথা ।

এটি মূলত শ্রমিকের আঙ্গুলের ছাপসহ (বায়োমেট্রিক) তথ্যভাণ্ডার। এতে শ্রমিকের মৌলিক তথ্য, ঠিকানা, চার আঙ্গুলের বায়োমেট্রিক ছাপ, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, কোন প্রতিষ্ঠানে এবং কোন গ্রেডে চাকরি করে— এসব তথ্য পাওয়া যাবে। বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, সরকারের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এ তথ্যভাণ্ডার তৈরিতে সহযোগিতা করেছে। এ জন্য প্রতিটি কারখানাকে আকারভেদে ৬০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে।

তাজরীন ফ্যাশন ও রানা প্লাজা ধসের পর এ খাতের শ্রমিকদের তথ্যভাণ্ডারের প্রয়োজনটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসে। কেননা নিখোঁজ শ্রমিক, শ্রমিকের ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এ খাতের শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার তৈরির জন্য সরকারকে চাপ দেয়। এরপর ২০১৪ সাল থেকে এ কার্যক্রম শুরু করে বিজিএমইএ। তবে শুরুতে কারখানাগুলোর আগ্রহ না থাকায় এ কার্যক্রম গতি পায়নি। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে ফের উদ্যোগ নেয় বিজিএমইএ। এরপর গত তিন বছরে এ পর্যন্ত ৩ হাজার কারখানার শ্রমিককে তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি এস এম মান্নান কচি ইত্তেফাককে বলেন, শ্রম আইনে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে কারখানা মালিকরা রপ্তানি মূল্যের উপর শূন্য দশমিক শূন্য তিন শতাংশ (০.০৩%) হারে অর্থ জমা দিচ্ছেন। এসব অর্থে শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে বীমাসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে। এ জন্য কারখানাভিত্তিক শ্রমিকের প্রকৃত তথ্য জানা জরুরি।

অবশ্য সূত্র জানিয়েছে, এই তথ্যভাণ্ডার তৈরির পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্য কাজ করেছে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন এলাকায় গার্মেন্টস কারখানায় শ্রম অসন্তোষ হয়। এর সঙ্গে কারা জড়িত, এই তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে। ফলে কোনো শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা, শ্রম আইন বিরোধ কর্মকাণ্ড কিংবা শ্রম অসন্তোষে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে মালিকপক্ষ এর মাধ্যমে সহজে তথ্য জানতে পারবে। ফলে অন্য কারখানায় গিয়েও ওইসব শ্রমিকের কাজ পাওয়া কঠিন হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন তাদের গবেষণায়ও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গার্মেন্টসে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে বলে ইঙ্গিত রয়েছে। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, এই তথ্য যাতে নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন কারখানা চালু হলে সেই তথ্য যুক্ত করার পাশাপাশি বন্ধ হওয়া কারখানার শ্রমিকদের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। সেই সঙ্গে এই তথ্যভান্ডারের ব্যবস্থাপনা এককভাবে কোন পক্ষের হাতে না রেখে ত্রিপক্ষীয় কমিটির মাধ্যমে করা যেতে পারে।