গণতন্ত্র মানে যা ইচ্ছা তা নয়। সংবিধানে এমন ক্ষমতা কাউকে দেওয়া হয়নি। যে যা ইচ্ছা তা করতে পারবে।

কোনও প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন না, সবাই মামলা করো: ড. কামাল


‘জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ড. কামাল হোসেন
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেফতারের নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বলছি, কোনও দেশের প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন না, সবাই মামলা করো। আইনমন্ত্রী, তুমি যার চাকরি করছো, তাকে বোঝাও, এভাবে কথা বলা যায় না। তাকে বোঝানোর ক্ষমতা না থাকলে আমরা সাহায্য করবো। বই খুলে চোখে আঙুল দিয়ে তোমাকে দেখাবো।’ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় (২৫ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে ‘জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৭ বছরে এসে এসব দেখতে হচ্ছে। আমি মনে করি, এটা আমার জন্য বড় শাস্তি। এটা আমাকে দেখতে হচ্ছে, শুনতে হচ্ছে। একজন সিনিয়র আইনজীবী-বন্ধু আমাকে বলেছেন, আওয়ামী লীগের নামে যা হচ্ছে, তাতে কি বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে?’

ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে যেভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাতে আমি নিন্দা জানাই। একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি এখান (হাইকোর্ট) থেকে জামিন নিয়ে গেছেন। আমি অবাক হয়েছি, তাকে সন্ধ্যায় নেওয়া (গ্রেফতার) হয়েছে, পরে তাকে অন্তরীণ করা হয়েছে। ঢাকায় এসে দেখি তার এখনও মুক্তি হয়নি। এটা কী শুরু করেছে? একটা সভ্য দেশকে সুন্দরবন বানাতে চাচ্ছে নাকি? না, সুন্দরবনকেও অপমান করা হয়। এটা জঙ্গল বানানো হচ্ছে। সরকার যা করছে, তা তো জানোয়াররাও করে না। বিনা কারণে কেন সরকার এসব করছে? মাথা খারাপ হয়ে গেছে এদের।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সংবিধানে আছে, দেশ শাসন করার সময় যাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়, তাদের দ্রুত পরীক্ষা করাতে হয়। আমি বলি, বোর্ড গঠন করে সাইকিয়াট্রিক দিয়ে এদের পরীক্ষা করা হোক।’

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে রাতে গ্রেফতারের কঠোর সমালোচনা করে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘মানহানির মামলায় রাতে গ্রেফতার করতে হবে, এমন কোনও নিয়ম আছে? জামিনযোগ্য মামলা। আইনমন্ত্রী অন্য কিছু না জানলেও তুমি তোমার বাবার সঙ্গে ক্রিমিনাল প্র্যাকটিস তো করেছো? জামিনযোগ্য অপরাধ কী, তা তুমি জানো। তুমি যার চাকরি করো, তাকে বোঝাও যে জামিনযোগ্য অপরাধ এটা। আইনমন্ত্রী চোখ খোলো। দেশের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করো। অন্ধকারে থাকা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘কী আশ্চর্য! মইনুল হোসেন আইনজীবী। এই সরকার খুব ভালোভাবে তাকে চেনে। গতকাল রাতে সিলেটে শুনে আমি অবাক। তাকে জেলে নেওয়া হয়েছে। এখানে এসে দেখি তিনি এখনও জেলে। তিনি কেন জেলে? কেন, কেন, কেন? এর উত্তর চাই।’

গণফোরাম সভাপতি বলেন, ‘এ সরকারের নাকি তথাকথিত একজন আইনমন্ত্রী আছেন। তোমার কাছে আমি উত্তর চাই। তুমি আমাদের একজন জুনিয়র ল’ইয়ার। তোমার বাবা আমার সহকর্মী ছিলেন, সিরাজুল হক বাচ্চু ভাই, তিনি আইনজীবী ছিলেন। তুমি কী হয়ে গেছো? তুমি আইন সব ভুলে গেছো? আসো, তোমার সঙ্গে আমরা আইনের বই দেখবো। কোন গ্রাউন্ডে মইনুল হোসেনকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে? কৈফিয়ত চাই। গণতন্ত্র যখন দাবি করে, তখন জনগণের কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে। দায়িত্ব আছে তোমার। বলতে হবে তোমাকে।’ তিনি বলেন, ‘মইনুলকে গ্রেফতারের ঘটনা চরম স্বৈরতন্ত্রের পরিচয় দিয়েছে সরকার। এটা গণতন্ত্র নয়। তুমি বোঝাও, গণতন্ত্র মানে যা ইচ্ছা তা নয়। সংবিধানে এমন ক্ষমতা কাউকে দেওয়া হয়নি। যে যা ইচ্ছা তা করতে পারবে। মইনুলকে অপমান করে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে? কী অপরাধ করেছেন তিনি? এটা মানহানির মামলা। মানহানির মামলায় তো তিনি জামিন নিয়েছেন। আর কত মামলা করবে? এটা অত্যন্ত লজ্জাজনক।’

আইনমন্ত্রীর উদ্দেশে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘তুমি মনে হয় সব ভুলে বসেছো। তুমি সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনার শপথ নিয়েছো। তুমি যার চাকরি করছো, তিনিও শপথ নিয়েছেন। তোমাদের শপথের প্রত্যেকটা শব্দের ব্যাখ্যা আমাকে বোঝাও। আইনমন্ত্রী আমাকে তুমি বোঝাও। আমি তোমার কাছে সময় চাই। আমাকে বোঝাও, দেশে হচ্ছেটা কী? পার্লামেন্ট নাকি আছে। তথাকথিত একটা পার্লামেন্ট নাকি আছে। আরও দুইদিন পার্লামেন্ট আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে তোমরা কৈফিয়ত দাও। পার্লামেন্টের কিছু দায়িত্ব কর্তব্য আছে। সেখানে বলো, যেন মানুষ জানতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে তা সংবিধানের কোথায় আছে? আমি সিলেটে যা দেখেছি, অবাক কাণ্ড। আমাদের হোটেলের সামনে থেকে আটটা/দশটা করে ছেলে ধরে নিয়ে গেছে। কেন নিয়ে গেছে? কী শুরু হয়েছে, এটা বাংলাদেশ?’

জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সুব্রত চৌধুরী, নিতাই রায় চৌধুরী, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, এস এম কামালউদ্দিন, শাহ আহমেদ বাদল, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গোলাম মোস্তাফা খান প্রমুখ।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক খান, মহসিন মিয়া, ইকবাল হোসেন, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, গোলাম রহমান ভুইয়া, গোলাম মোস্তাফা, গাজী কামরুল ইসলাম, সাখাওয়াত হোসেন, ব্যারিস্টার একেএম এহসানুর রহমান, কাজী জয়নাল, মির্জা আল মাহমুদ, গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী আলাল, সগীর হোসেন লিয়ন, শরীফ ইউ আহমেদ, শেখ তাহসীন আলী, মাহবুবুর রহমান প্রমুখ।