‘মি-টু’ ঝড়: ভয় পাচ্ছেন?

‘মি-টু’ ঝড়: ভয় পাচ্ছে?

তপন মাহমুদ

যত বড় ঝড়ই হোক, একদিন ঠিকই থেমে যায়। হয়তো আবার আসবে বলে খানিক বিরতি নেয় কখনও। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে যে ‘মি-টু’ ঝড় উঠেছে, তা থেমে না থেকে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। আর এর ফলে, অনেকেরই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠতে শুরু করেছে। চোরের মনে কি তাহলে পুলিশ পুলিশ ডাকতে শুরু করে দিয়েছে? পুরুষতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার ভাঙতে শুরু করেছে নারীরা। আর তাতেই খোলস বের হতে শুরু করেছে অনেকের। যেসব পুরুষ যৌন হেনস্থা করে এতদিন নিশ্চিন্ত দিন যাপন করতেন, আরও শিকার খুঁজতেন, তাদের দিন মনে হয় শেষ হতে চললো। যারা ভাবতেন, আর যাই হোক এমন লজ্জার কথা বাইরে বলতে পারবেন না, তারা এবার উল্টো দিকে মুখ করে থাকলেও কালি এড়াতে পারবেন না।

‘মি-টু’ আন্দোলন নিয়ে কিছু বিতর্ক হতেই পারে। যারা অভিযোগ করছেন, তার সত্যতা কী? তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে করছেন কিনা? আগে বলেননি কেন? হ্যাঁ, ঠিক আছে। ধানের মধ্যে চিটা থাকতেই পারে। কিন্তু ধানকে ছাড়াতে পারে কি কখনও? তার মানে এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে, দুনিয়াব্যাপী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী যৌন হয়রানির শিকার। আর পুরুষ তার মূল শিকারি। এই সত্যটাই, যা এতদিন ট্যাবু আকারে নারী বয়ে বেরিয়েছে নিচের ভেতরে, গোপন করেছে চাপা কষ্ট নিয়ে, সেটা ভাঙতে শুরু করেছে। ভাঙতে শুরু করেছে এই ধারণা যে, কোনও কিছুই গোপন নয়।

উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের একটা কথা আমার খুব পছন্দ। তিনি বলেছেন, ‘গোপনীয়তা মানেই ষড়যন্ত্র’। আমরা যেটা গোপনে করতে পারবো, কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে পারবো না, বুঝতে হবে সেখানে ‘ঘাপলা’ আছে। সতীত্ব, সম্ভ্রম, পর্দা, লজ্জা-শরম, ইত্যাদি নারীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলে চালিয়ে দিয়ে সেই গোপনীয়তার ফল এতদিন ভোগ করেছে পুরুষ সমাজ। এবার আয়নায় মুখ দেখার পালা।

আর একটা কথা পুরুষতন্ত্র যে তারই সৃষ্ট ট্যাবুকেই ব্যবহার করেছে, তা নয়। বরং পুরুষতন্ত্র পেশীশক্তি ও ক্ষমতাকেও ব্যবহার করেছে। ‘মুখ খুললে বিপদ হবে’– বলে হুমকিটাও দরকারে দিয়ে রেখেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশি মডেল প্রিয়তি ‘মি-টু’ শিরোনামে তার সঙ্গে হওয়া যৌন হয়রানির কথা জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এতদিন এই ঘটনার বিরুদ্ধে কিছু না বলতে না পারার পেছনে যতটা না ট্যাবু ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল ক্ষমতার ভয়।

বলা যায়, এই ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনায় সমাজের তথাকথিত ট্যাবু, পুরুষতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার এতদিন নারীকে স্পাইরাল অব সাইলেন্সের খাঁচায় বন্দি করেছিল। সেই নীরবতা যখন একবার ভেঙেছে, তখন আদতে সব নারীই ভয়ের শৃঙ্খল খুলে নিজের কষ্ট আর যন্ত্রণা বলতে শুরু করেছে। এটি শুধু তাদের হালকাই করছে না, অনেক বড় সত্যকে সামনে হাজির করছে। পুরুষতন্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে। এমন ঘটনায় অনেকে নারীকেও হয়তো বলতে শোনা গেছে, ‘চেপে যাও লোকে কী বলবে?’

সেই ‘চাপিয়ে দেওয়া লোক-লজ্জার ভয়’ জয় করা নারীরা আগামী দিনের নারীর পথচলা কতটা মসৃণ করে দিচ্ছেন, তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। কিন্তু নারীর লড়াইয়ে এটি যে মাইলফলক ঘটনা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই সাহসী নারীদের স্যালুট।

কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আসলে কেমন? আমাদের সমাজ বিষয়টাকে কীভাবে দেখছে? নাকি সমাজ এখনও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিচার করছে ‘মি-টু’ আন্দোলন। বিভিন্ন জন-পরিসরে এই নিয়ে আলোচনাটা খেয়াল করতে হবে আমাদের। তাহলে হয়তো বিষয়টা ধরতে পারা যাবে। এ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের জন্য আরও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

তবে, এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে। অন্য দেশের ‘মি-টু’ আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যম যতটা সরব, বাংলাদেশের কোনও নারীর অভিযোগ নিয়ে ততটা পারবে কি? অন্তত এখন পর্যন্ত সেটা দৃশ্যমান নয়। যদিও বড় আঘাত আসেনি এখনও। কিন্তু অভিযোগ ছোট করে দেখা উচিত কি?

মূলধারার গণমাধ্যম এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকলে, তাদের নৈতিকতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। হয় তাদের এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ করতে হবে, নয়তো এ নিয়ে আগে যেসব খবর প্রকাশ করেছে, তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। আর কেন এটি সংবাদ নয়, তারও ব্যাখ্যা দিতে হবে। তারা যদি এসব সংবাদ ব্ল্যাক আউট করে দেয়, তা হবে তাদের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। অথবা এটাও হতে পারে প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্ট কারও চাপে চেপে যাওয়া। যে ভয়টাই মডেল প্রিয়তি করেছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মি টু হ্যাশ ট্যাগ করেছেন সীমন্তি নামের একজন নারী। জানিয়েছেন, তার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন তিনি। যখন আমাদের মূলধারার গণমাধ্যম ভারতীয় ‘মি-টু’ আন্দোলন নিয়ে অনেক সংবাদ পরিবেশন করলো, তখন নিজদেশে ঘটে যাওয়া ‘মি-টু’ কেন মূলধারার গণমাধ্যমে প্রচারিত হলো না, এটাও একটা বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

তাহলে বিষয়টা কি এমন যে, দেশের বেলায় এক নিয়ম, ভিনদেশিদের বেলায় আলাদা? এ কেমন সংবাদমূল্য নির্ধারণপদ্ধতি? সূত্র অনুযায়ী দেশের ঘটনা তো নৈকট্যের কারণে আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা।

আমরা আশা করবো, গণমাধ্যমও ‘মি-টু’ আন্দোলনের সঙ্গে তাদের নৈতিক সমর্থন জানাবে। অন্তত সংবাদমূল্য আগে যেমন দিয়েছে, দেশের ঘটনায় সে রকমই দিক। খালি নাটক সিনেমার লোকদের নয়, কাঠগড়া সবার জন্য!

মনে রাখা ভালো, ঝড়ের পর একটা সুন্দর ঝলমলে রোদ আসে। সেই আলো হোক মুক্তির আলো। পারস্পরিক শ্রদ্ধায় বিশ্বাসে গড়ে উঠুক নারী পুরুষের সম্পর্ক–যা প্রকাশে কোনও ভয় থাকবে না, ভালোলাগা থাকবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।