৫০ শতাংশ মানুষের মতে কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল: সিপিডির জরিপ

সিপিডির গবেষণা : আয়কর দেন না ৬৮% সামর্থ্যবান ব্যক্তি

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করে, এনবিআরের কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। বৃহস্পতিবার(৮ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে সিপিডির সংলাপে এই তথ্য জানানো হয়।

সংলাপে সিপিডির সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, ‘কর ব্যবস্থা নিয়ে এক হাজার দুইশ’ মানুষের মধ্যে জরিপ চালিয়েছে সিপিডি। জরিপে অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এনবিআরের কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। আর ৬৫ শতাংশ মানুষ মনে করে, এনবিআরের কর ব্যবস্থায় দুর্নীতি রয়েছে। সিপিডির জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ আয়ের ২৫ শতাংশ মানুষের এক তৃতীয়াংশ গত বছর আয়কর দেয়নি। যারা দিয়েছেন, তারাও পুরোপুরি দেননি। কর ফাঁকি দিয়েছেন। ’

দেশের কর ব্যবস্থায় অনুবর্তী অংশগ্রহণের মূল নির্ণায়কগুলো যাচাইয়ের জন্য সিপিডি ২০১৮ সালে বাংলাদেশের ২১টি জেলায় কর প্রদানে সমর্থ ১২০০ ব্যক্তির ভেতরে একটি জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বমূলক ধারণা জরীপ চালিয়েছে। জরীপে অংশগ্রহণকারী ৮৫% অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি মনে করেন সরকারি সেবার সরবরাহ এবং তার গুণগত মান বৃদ্ধি পেলে জনগন কর প্রদানে উৎসাহী হবেন। ৭৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন কর ব্যবস্থায় ধনী-গরিবের মধ্যে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করা হয়। ৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এনবিআরের সেবা ও তার গুণগতমান বাড়ালে জনগণ কর দিতে উৎসাহিত হবে।

সিপিডির সুপারিশে বলা হয়, কর অফিসকে একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ধনী অথচ কর ফাঁকি দেন এমন ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সমতাভিক্তিক কর ব্যবস্থা বিকশিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে অধিকতর ন্যায্য এবং আধুনিক সম্পত্তি ও সম্পদ কর চালু করতে হবে।

সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘কর আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করছে এনবিআর। এর অংশ হিসাবে ঢাকার ফ্ল্যাট বাসায় খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। সারাদেশে এখন ই-টিনের সংখ্যা ৩৫ লাখের বেশি। কিন্তু তার মধ্যে ২০ লাখ রিটার্ন দিচ্ছে না। অন্যতম কারণ কর নিয়ে এক ধরনের ভয় আছে। তাই করদাতাবান্ধব এনবিআর গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।’

সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দেশে সুশাসন জরুরি। সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন নেই, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেখানে এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্ব খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না।’

তিনি বলেন, বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে করছাড় দেওয়া হয়। এছাড়া কেউ অপরাধ করেও শাস্তি পায় না।

বাংলাদেশে নিযুক্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আবাসিক প্রতিনিধি রাগনার গুডমান্ডসন বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বিপরীতে বাংলাদেশে কর আদায় একেবারে কম। জিডিপির অনুপাতে মাত্র ৯ শতাংশ কর আদায় হয়। দক্ষিণ এশিয়াতে এটি সর্বনিম্ন।

প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। বাড়ছে মানুষের আয়। কিন্তু সে অনুযায়ী বাড়ছে না আয়কর প্রদানের হার। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপ বলছে, দেশে মাত্র ৩২ শতাংশ সামর্থ্যবান ব্যক্তি আয়কর দেন। সে হিসাবে সামর্থ্যবানদের ৬৮ শতাংশই কর দেন না।

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ক্যাটালাইজিং ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স ফর বাংলাদেশ: মবিলাইজেশন অ্যান্ড ইউটিলাইজেশন চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য উপস্থাপন করে সিপিডি। অনুষ্ঠানে দুটি নিবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ‘পটেনশিয়াল অব ইনকাম ট্যাক্স ইন বাংলাদেশ: অ্যান এক্সামিনেশন অব সার্ভে ডাটা’ শীর্ষক নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

২০১৮ সালের ধারণা জরিপের ফল উপস্থাপন করে বলা হয়, জরিপের তথ্য অনুযায়ী কেবল ৩২ শতাংশ সামর্থ্যবান ব্যক্তি আয়কর প্রদান করেছেন, বাকিরা করেননি। এমনকি সবচেয়ে উচ্চ আয়ের ২৫ শতাংশ ব্যক্তির মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই আগের বছর আয়কর দেননি, তার মানে এই নয় যে, যারা কর প্রদান করেছেন তারা কোনোরূপ কর ফাঁকি দেননি।

সিপিডির এ জরিপে কর ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৫ শতাংশ ব্যক্তি মনে করেন, কর ব্যবস্থা ধনীদের পক্ষপাতদুষ্ট। আর ৫০ শতাংশ ব্যক্তি মনে করেন, বর্তমান কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। গত বছর কর দিয়েছেন এমন ব্যক্তিদের ৫৪ শতাংশই এ ধারণা পোষণ করেন। এছাড়া জরিপে অংশগ্রহণকারী ৮৫ শতাংশ ব্যক্তি মনে করেন, সরকারি সেবার সরবরাহ ও তার গুণগত মান বৃদ্ধি পেলে জনগণ কর প্রদানে উৎসাহী হবে। কর দিচ্ছেন এমন ৬৫ শতাংশের মত হলো, কর ব্যবস্থায় দুর্নীতি বিদ্যমান। অপেক্ষাকৃত ধনীদের ৬৯ শতাংশের মনে এমন ধারণা কাজ করছে।

এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের প্রতি বেশকিছু সুপারিশ করেছে সিপিডি। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে— আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, তুলনামূলক নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা সহজতর করা, কর অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত করা ও কর ফাঁকি দেয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া। এছাড়া স্কুল পর্যায় থেকেই কর ব্যবস্থায় অংশ নেয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা দেয়ার সুপারিশও করেছে সিপিডি।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এনবিআর চেয়ারম্যান মোশররফ হোসেন ভূঁইয়া। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, আইএমএফের বাংলাদেশ কার্যালয়ের আবাসিক প্রতিনিধি রেগন্যার গুডমুন্ডসন ও এমসিসিআইয়ের সভাপতি নিহাদ কবির।

অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, করদাতারা এখনো কর প্রদানের ক্ষেত্রে ভয় পান। তাদের এ ভয় দূরীকরণে কর কর্মকর্তাদের জনকল্যাণমুখী হওয়ার নির্দেশনা দেয়া আছে। সেটি বাস্তবায়নও করা হচ্ছে। বর্তমানে ৩৫ লাখ টিআইএনধারী রয়েছেন। কিন্তু কর দিচ্ছেন ২০ লাখের কম। এ অবস্থায় করজাল বাড়াতে উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। জনবলসহ নানা ক্ষেত্রে আমাদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। তবে সেটি কাটিয়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তিনি জানান, অগ্রিম আয়করের মাধ্যমে করজাল বাড়ানো হচ্ছে। আমদানি করছেন এমন ব্যবসায়ী কিংবা ব্যাংকে যাদের সঞ্চয়পত্র আছে, তারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন না। কিন্তু অগ্রিম করের মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছে। আবার বাড়ির মালিকরা রিটার্ন দাখিল করছেন কিনা তা তদারকিতে ছয় মাসের মধ্যে তথ্যভাণ্ডার করা হবে। আমাদের কাস্টমস ও আয়কর বিভাগে জনবল বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সেটি বৃদ্ধি পেলে কার্যক্রমে আরো গতি আসবে। সামনের দিনে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ১০ থেকে ১৩ শতাংশে উন্নীত হবে।

বৈদেশিক সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি ভোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈদেশিক সহায়তার মাধ্যমে প্রকল্প করলে অনেক বেশি সুশাসন ও গুণগত মান রক্ষা করা যায়। তবে আমরা এখন নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সক্ষমতাকে ব্যবহার করছি।

অনুষ্ঠানে ‘ক্যান বাংলাদেশ ডু উইদাউট ফরেন এইড?’ শীর্ষক নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। উপস্থাপনায় তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ আকারে বৃদ্ধি পেলেও তা জিডিপির অনুপাতে কমেছে। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তার খুব বেশি প্রভাব নেই। মাইক্রো লেভেলে শুধু স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে এর প্রভাব রয়েছে।

তবে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তার খুব বেশি প্রভাব নেই— এ তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, মধ্যম আয়ের দেশে যেতে, এসডিজি বাস্তবায়ন করতে এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশে রূপান্তর প্রক্রিয়ায় বৈদেশিক সাহায্য দরকার রয়েছে। তবে এটি সতর্কতার সঙ্গে দক্ষভাবে ব্যবহার জরুরি। সমাজে এখনো নানা ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। আয়-বৈষম্যের তুলনায় সম্পদ-বৈষম্য এখন বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই আয়করের পাশাপাশি সম্পদ করের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। দেশের কর ব্যবস্থাপনা ধনীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট কিনা সেটি দেখতে হবে। আর কর ব্যবস্থাপনায় সুশাসন আনার ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন সঙ্গতিপূর্ণ করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে সুশাসনে ঘাটতি রেখে কর ব্যবস্থাপনায় সুশাসন আনা সম্ভব নয়।

এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, জিডিপি অনুপাতে দেশে রাজস্ব সংগ্রহ ও কর আহরণ কোনো ক্ষেত্রেই তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় রাজস্ব আদায়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। নেপালের মানুষের জনপ্রতি আয় আমাদের চেয়ে অর্ধেক হলেও তারা আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ রাজস্ব প্রদান করে। দেশে এখন শ্রম ও মূলধনবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। আর বাংলাদেশ এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছে যায়নি যে, এখনই বলতে হবে বৈদেশিক সাহায্য প্রয়োজন নেই। কেননা এখনো আমাদের দেশে রাজস্ব জিডিপি অনুপাত অনেক কম। তবে বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর প্রকল্প আমাদের দেশে কতটুকু প্রভাব ফেলছে সেটি গবেষণার দাবি রাখে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ঢালাওভাবে ট্যাক্স হলিডে দেয়া হচ্ছে। এর প্রভাবও দেখতে হবে। এটিতে পরিবর্তন আনা দরকার। একেবারে মুক্ত না করে প্রথম বছর অব্যাহতি দিয়ে পরবর্তী বছরগুলোয় তা ধারাবাহিকভাবে আরোপ করা যেতে পারে। [সূত্রঃ বণিক বার্তা]