আয়করের ৭ শতাংশ আসে রিটার্ন থেকে : কর আদায়ে সক্রিয় হোক এনবিআর

রাজস্ব আয়ে আয়করের অংশ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও কেন যেন তা স্থবির হয়ে আছে। নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও আয়করের মাত্র ৭ শতাংশ আসছে রিটার্ন থেকে, ৬৭ শতাংশ আসছে উেস কর থেকে। বিশ্বব্যাপী আয়করের বড় অংশই আসে রিটার্নের মাধ্যমে। বছর শেষে রিটার্ন জমা দেয়ার মাধ্যমে আয়কর পরিশোধ করেন বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা। করযোগ্য নাগরিকদের কাছ থেকে আয়কর রিটার্নের মাধ্যমেই সম্পদের হিসাব ও কর আহরণ করা হয়। আমাদের এখানে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়করের পরিমাণ কম হওয়ায় করদাতা বাড়লেও এ খাত থেকে রাজস্ব আহরণ খুব একটা বাড়েনি। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়ের উৎস থেকে কেটে নেয়া করই আয়করে মূল অবদান রাখে।

আয়কর ফাঁকির মহোৎসবে পেশাজীবীদের এক বড় অংশ জড়িত বলে মনে করা হয়। এক্ষেত্রে আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী সবাই যেন একাট্টা। এনবিআরের তদন্তে পেশাজীবীদের কর ফাঁকির বিষয়টি ধরা পড়েছে। কর ফাঁকিবাজের তালিকায় রয়েছেন রাজনীতিবিদরাও।

আয়ের উৎস পেশাজীবীরা প্রকাশ করতে চান না। সরকার চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণ করে দিলেও নির্ধারিত ফির চেয়ে তারা বেশি নেন। একইভাবে আইনজীবীরা তাদের মক্কেলের কাছ থেকে কত টাকা নেন, এরও হিসাব অন্য কেউ রাখে না। শিক্ষকরা স্কুল-কলেজের বাইরে প্রাইভেট পড়ালেও সে আয়ের তথ্য প্রকাশ করেন না। দেশের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এনবিআরের যে সাফল্য, তা ব্যবসায়ীনির্ভর। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আয়কর আদায়ে তারা যতটা সক্রিয়, ততটাই নিষ্ক্রিয় পেশাজীবীদের কাছ থেকে আদায়ে। ফলে দেশের লাখ লাখ পেশাজীবী এখনো আয়করের আওতায় আসেননি। তাদের নেই করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা ই-টিআইএন। এমনকি দেশে কতজন পেশাজীবী করদাতা আছেন, কোন পেশার করদাতা কী পরিমাণ আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন, এরও সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। পেশাজীবীদের আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা থাকায় সরকার প্রতি বছর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশে এমন অসংখ্য কোটিপতি রয়েছেন, যাদের নাম আয়করদাতার তালিকায় নেই। যাদের নাম তালিকায় আছে তারা প্রকৃত আয় অনুযায়ী আয়কর দেন কিনা, সেটিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। দেশের উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থে আয়কর ফাঁকির বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অন্তত এক কোটি ব্যক্তিকে করজালের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাছাড়া ২০২০-২১ সালের মধ্যে এ খাত থেকে মোট রাজস্বের ৫০ শতাংশ (বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ দশমিক ৪১ শতাংশ) আহরণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জন হওয়া উচিত এবং সম্ভবও। কারণ দেশের আর্থিক অবয়ব অনুযায়ী মোট রাজস্ব আয় খাতে আয়করের (২৭ শতাংশ) অবস্থান মূল্য সংযোজন কর বা মূসক (৩৮ শতাংশ) ও শুল্ক (৩৩ শতাংশ) খাতের নিচে থাকার কথা নয়। কারণ যে সমাজে ভোগ্যপণ্য ও বিলাসবহুল সামগ্রী আমদানি বাবদ ব্যয় বেশি, সে সমাজে আয়কর দেয়ার মানুষের সংখ্যা সামান্য, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এনবিআরের চেয়ারম্যানের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনামের ৯ কোটি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৯০ লাখ কর দেয়। আমাদের ১৭ কোটি মানুষের দেশে এক কোটি মানুষকে কেন আয়করের আওতায় আনতে পারবে না এনবিআর, তা এক বড় প্রশ্ন।

জাতীয় কর দিবসের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী স্বেচ্ছায় করদাতাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি কর দেয়ার উপযুক্ত অনিচ্ছুক নাগরিকদের আইনের আওতায় আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সংকল্প ব্যক্ত করেছিলেন। বর্তমান বাস্তবতায় এটি একটি জরুরি সিদ্ধান্ত, যা রাষ্ট্রের কল্যাণকামী সব নাগরিকের প্রত্যাশার প্রতিফলন। তাই করজাল সম্প্রসারণ নীতির সুফল পেতে হলে সরকারকে অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সতর্কতার সঙ্গে এমনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে আয়কর দেয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিরা একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির ভেতর দিয়ে আয়কর দিতে বাধ্য হন। সাধারণভাবে মনে করা হয়, আয়করদানের যোগ্য ব্যক্তিদের সর্বাধিক ২৫ শতাংশ আয়করদাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। পদ্ধতিগত জটিলতা ও আয়কর বিভাগের হয়রানির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই করদাতাদের পকেট থেকে আয়কর খাতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা ভোগ করেন আয়কর আইনজীবী ও কর বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বর্তমান সরকারের আমলে আয়কর ব্যবস্থায় গতি আনতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও পদ্ধতিগত জটিলতা রয়েই গেছে।