শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিল : মাত্র তিন কোম্পানি দিয়েছে ৫৫% অর্থ

বদরুল আলম

দেশে প্রচলিত শ্রম আইনে গঠিত শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অর্থ জমা শুরু হয় ২০১৩ সালে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ তহবিলের আকার দাঁড়িয়েছে ৩১১ কোটি টাকা। এ অর্থ জমা দিয়েছে দেশী-বিদেশী ১২১টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ ও ইউনিলিভার বাংলাদেশই দিয়েছে মোট তহবিলের ৫৫ শতাংশ। শ্রমিকদের কল্যাণে গঠিত ফাউন্ডেশনে জমা দেয়া এ তিন প্রতিষ্ঠানের অর্থের পরিমাণ ১৭০ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই বহুজাতিক। শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠানেরও সবগুলোই বহুজাতিক। এর মধ্যে তহবিলে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা দিয়েছে টেলিকম খাতের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন। সর্বোচ্চ অর্থ প্রদানকারী পরের দুই কোম্পানি হলো তামাক খাতের ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ ও এফএমসিজিখাতের পণ্যের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড।

শ্রমিকদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠানের মুনাফার অংশ জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে ২০০৬ সালের শ্রম আইনে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির মূলধন ২ কোটি টাকার বেশি অথবা মোট সম্পদ ৩ কোটি টাকার উপরে হলে বছর শেষে তারা যে মুনাফা ঘোষণা করে, তার ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় করতে হয়। এ ৫ শতাংশের এক-দশমাংশ প্রদান করতে হয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন গঠিত শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিলে।

আইন মেনে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে এখন পর্যন্ত ৯৪ কোটি ২ লাখ ৫৮ হাজার ২৮ টাকা জমা দিয়েছে গ্রামীণফোন। এটাই একক কোম্পানি হিসেবে তহবিলে জমা দেয়া সর্বোচ্চ অর্থ।

গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটারনাল কমিউনিকেশনস সৈয়দ তালাত কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, আইন মেনে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে সরকারের প্রাপ্য অর্থ নিয়মিত পরিশোধ করে আসছে গ্রামীণফোন।

গ্রামীণফোনের পরই এ তহবিলে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা দিয়েছে তামাকজাত পণ্যের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ। এ প্রতিষ্ঠানের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ৪০ কোটি ৭১ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫৬ টাকা।

তহবিল সংগ্রহ শুরুর সময় থেকেই তারা শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলে অর্থ জমা দিয়ে আসছেন বলে জানান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব আজিজুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দেশের অন্য সব আইনের মতোই শ্রম আইনও যথাযথভাবে পরিপালন করছে আমাদের প্রতিষ্ঠান। দেশী বা বিদেশী যে প্রতিষ্ঠানই হোক আইন সবার জন্যই সমান। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থা আইনটি পরিপালনের তদারকি বাড়ালে তহবিলে আরো সাড়া পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি।

শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে তৃতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমা দিয়েছে আরেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, যার পরিমাণ ৩৫ কোটি ৯৫ লাখ ৬৭ হাজার ১৩২ দশমিক ২৮ টাকা।

তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। প্রতিষ্ঠানটির জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ১১ কোটি ৮০ লাখ ৫২ হাজার ৫৩৩ টাকা।

ওয়ালটন গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (পলিসি, এইচআরএম অ্যান্ড অ্যাডমিন) এসএম জাহিদ হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের মুনাফার একটি অংশ সরকারের তহবিলে জমা দেয়ার বিধান আছে। নিয়মিতই আমরা এ তহবিলে অর্থ জমা দিচ্ছি। এটি ব্যবহারের দায়ভার আমাদের নয়। তবে প্রত্যাশা থাকবে, তহবিলটি যেন যথাযথভাবে শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় হয়।

টেলিকম খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান রবি আজিয়াটা লিমিটেড রয়েছে তালিকার পঞ্চম স্থানে। প্রতিষ্ঠানটির জমা দেয়া অর্থের পরিমাণ গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ কোটি ১০ লাখ ৪৫ হাজার ২৬৩ টাকা। রবির পরই সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা দিয়েছে খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেড, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যার পরিমাণ ৯ কোটি ৯০৪ টাকা।

জমা দেয়া অর্থের পরিমাণে দেশীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে ওয়ালটনের পরই আছে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড। তহবিলে প্রতিষ্ঠানটি জমা দিয়েছে মোট ৬ কোটি ৪৬ লাখ ১৮ হাজার ৩৪৯ টাকা। এছাড়া মেঘনা পেট্রোলিয়াম জমা দিয়েছে ৫ কোটি ৯২ লাখ ৬৬ হাজার ১২৫ ও পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ৫ কোটি ৬০ লাখ ৩৩ হাজার ২৮ টাকা। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে উল্লেখযোগ্য অর্থ জমা দিয়েছে বহুজাতিক ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড ৫ কোটি ১৫ লাখ ৭৫ হাজার ৭৪ ও হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড ৪ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৩৪ টাকা।

দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেয়া এ তহবিল পরিচালনার জন্য তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন ২০০৬। শ্রমিক কল্যাণে কীভাবে এ তহবিল ব্যবহার হবে, তা-ও বলে দেয়া আছে এ আইনে। আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিক ও তার পরিবারের কল্যাণ সাধন, অসুস্থ বা অক্ষম কিংবা অসমর্থ শ্রমিকদের আর্থিক সাহায্য প্রদান, দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারকে সাহায্য দেয়া হবে এ তহবিল থেকে। পাশাপাশি তহবিলটি থেকে শ্রমিকদের জন্য যৌথ বীমা ব্যবস্থার প্রবর্তন করাসহ শ্রমিকের পরিবারের মেধাবী সদস্যের শিক্ষার জন্য বৃত্তি প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. এএমএম আনিসুল আউয়াল বণিক বার্তাকে বলেন, তহবিলে জমা হওয়া অর্থের এক-তৃতীয়াংশই দিয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। আর ৭০ শতাংশই দিয়েছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর কারণ হয়তো তাদের কমপ্লায়েন্স মেনে চলার মানসিকতা। দেশী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বর্তমানে খুব ধীরগতিতে হলেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আইন অনুসরণে সচেতন হচ্ছে। আমরাও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। ক্রমেই এ তহবিলের আকার ও এ থেকে সহায়তা প্রদান অনেক বাড়বে বলে আশা করছি।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফাউন্ডেশনের তহবিল থেকে এ পর্যন্ত শ্রমিকদের ২৫ কোটি টাকারও বেশি সহায়তা দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তহবিল থেকে সহায়তা প্রাপ্তির আবেদন প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও দ্রুত করার জন্য সহায়তার আবেদন প্রেরণ ও গ্রহণ অনলাইনে করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সহায়তার অর্থ মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রদান করা হবে। এজন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজও চলমান রয়েছে।