কেন আমাদের সুপারহিরো প্রয়োজন?

কেন আমাদের সুপারহিরো প্রয়োজন?

অর্ণব সান্যাল

মার্ভেল কমিকসের সৃষ্ট সুপারহিরোরা। ছবিটি মার্ভেল কমিকসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
মার্ভেল কমিকসের সৃষ্ট সুপারহিরোরা। ছবিটি মার্ভেল কমিকসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
অসংখ্য ভক্তকে কাঁদিয়ে মার্ভেল কমিকসের প্রতিষ্ঠাতা স্ট্যান লি কিছুদিন আগে মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে পুরো পৃথিবীকে একগুচ্ছ কাল্পনিক ‘সুপারহিরো’ দিয়ে গেছেন তিনি। শুধু মার্ভেল নয়, ডিসি কমিকসও অনেক সুপারহিরো চরিত্র সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশেও তৈরি হচ্ছে কমিক হিরো। কমিকসের পাতা বা রুপালি পর্দাতেই এসব সুপারহিরোর রাজত্ব। কিন্তু এই পৃথিবীর ৭০০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনে সুপারহিরোর প্রয়োজন কতখানি? আদতেই কি সুপারহিরোর দরকার আছে?

বিশ্বজুড়েই ইদানীং হুলুস্থুল খুব বেশি। কোথাও যুদ্ধ হচ্ছে, কোথাও সাংবাদিককে হত্যার পর লাশ গায়েব করে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার জোট (যেমন ব্রেক্সিট) থেকে বের হয়ে যাওয়া নিয়ে বাহাস হচ্ছে, কোথাও আবার বিরুদ্ধ মতকে বলপ্রয়োগ করে দমন করা হচ্ছে। শেষেরটি কম-বেশি বিশ্বের সব দেশেই দেখা যাচ্ছে। কখনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট সহ্য করতে পারছেন না, কখনো বা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট। শুধু দেশের নামই পরিবর্তন হয়, রাষ্ট্রীয় পদ সেই ঘুরেফিরে মোটামুটি একই থাকে।

প্রশ্ন আসতে পারে, সুপারহিরোরা এ ক্ষেত্রে কী করতে পারবে? কিছুদিন আগের কথা মনে করিয়ে দিই। বক্তব্য পছন্দ না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক সাংবাদিককে হোয়াইট হাউসে পা রাখতে না করে দিয়েছিলেন। একেবারে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই সাংবাদিককে নিষিদ্ধ করেছিল হোয়াইট হাউস কর্তৃপক্ষ। পরে আদালতের আদেশে সেই সাংবাদিক ফের প্রবেশাধিকার পান। অভিবাসী বিষয়েও নির্বাহী আদেশ দিয়ে বিপাকে পড়েছেন ট্রাম্প। আদালত সেই আদেশে স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিষয়ে আমার এক প্রিয়জনের মন্তব্য মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, ট্রাম্পকে দেখলেই তাঁর নাকি একটি কবিতার লাইন মনে পড়ে। তা হলো, ‘আসছে আমার পাগলা ঘোড়া…’! এমন মন্তব্যের হেতু জিজ্ঞেস করায় তাঁর বক্তব্য, এই মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘পাগলাটে’ কর্মকাণ্ডই যত নষ্টের গোড়া। ট্রাম্প আজ সৌদি যুবরাজকে মাথায় তুলছেন, তো পরদিনই খাসোগির হত্যার ক্রীড়নক বানাচ্ছেন। এহেন প্রেসিডেন্টের কার্যকলাপ আগে থেকে আঁচ করার জন্য কিন্তু একজন সুপারহিরো বেশ কাজে আসত। সেই চরিত্রটি হলো, ‘প্রফেসর এক্স’ বা প্রফেসর চার্লস ফ্রান্সিস জেভিয়ার। মার্ভেল কমিকসের সৃষ্টি ‘এক্স-ম্যান’ সিরিজে মিউট্যান্টদের প্রধান এই প্রফেসর এক্স। তার একটি অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা আছে। তার টেলিপ্যাথ অত্যন্ত শক্তিশালী। এই চরিত্রটি অন্যের মনের কথা যেমন জানতে পারে, তেমনি নিয়ন্ত্রণও করতে পারে। একবার ভেবে দেখুন তো, যদি সত্যিই প্রফেসর এক্স বলে কেউ থাকত মার্কিন মুলুকে, তবে কত সহজেই না ট্রাম্পের সদা অস্থির মনের নাগাল পাওয়া যেত! আবার উল্টাপাল্টা আদেশ দেওয়ার সময় ট্রাম্পের মনের গতিপথও পাল্টে দেওয়া যেত।

কী মনে হচ্ছে, পাগলের প্রলাপ? আসলে শান্তি তো সবাই চায়, তা যেভাবেই হোক। একটু কল্পনাবিলাসী হলে যদি সমাধান মেলে, তবে ক্ষতি কি—বলুন তো?

একবার যখন কল্পনা ডানা মেলেছে, তখন আসুন একটু উড়েই বেড়াই। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ ইয়েমেন। উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের হিসাব বলছে, দেশটিতে শুধু খাবারের অভাবেই প্রাণ গেছে প্রায় ৮৫ হাজার শিশুর। এই শিশুদের সবার বয়স পাঁচ বছরের নিচে। তাহলে গুলি-বারুদে কতজনের মৃত্যু হয়েছে? সেই অঙ্কটি কত বড়?

এখন যদি ইয়েমেনে ‘ব্যাটম্যানের’ মতো কেউ থাকত, তবে কতই না ভালো হতো! ডিসি কমিকসের অমর সৃষ্টি ব্যাটম্যান। অন্যান্য সুপারহিরোর মতো ব্যাটম্যানের কোনো অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা নেই। কিন্তু কোনো অপরাধীকে ছাড় দেয় না ব্যাটম্যান। অপরাধের গন্ধ পেলেই হাজির এই সুপারহিরো তথা ব্রুস ওয়েইন। সব অপরাধীকে নিকেশ করে তবেই তার শান্তি। হাজার হাজার শিশুকে হত্যা নিশ্চয়ই মাত্রার দিক থেকে অনেক অনেক বড় অপরাধ। কিন্তু সুপারহিরোবিহীন এই বিশ্ব চরাচরের তাতে থোড়াই কেয়ার। চোখে ঠুলি পরে বসে আছেন সবাই। অন্তত ব্যাটম্যান এসব অপরাধের বিচার করত নিশ্চয়ই। আবার আফগানিস্তানে অস্ত্রের ঝনঝনানি ঠেকাতে ভালো ভূমিকা রাখতে পারত মার্ভেলের ‘আয়রন ম্যান’। হুট করে উড়ে এসে সন্ত্রাসীদের ‘শুট’ করতে পারত কল্পিত স্টার্ক ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক।

এবার আসি উপমহাদেশে। শ্রীলঙ্কায় এক অদ্ভুত সংকট চলছে। সংকটের হোতা বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। সাংবিধানিক ও সংসদীয় জটিলতায় এখন দেশটিতে দুজন প্রধানমন্ত্রী—রনিল বিক্রমাসিংহে ও মাহিন্দা রাজপক্ষে। দুজনেই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাজনৈতিক এই জটিলতায় শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সংকটে ভুগতে পারে পুরো দেশ! কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের অধিকর্তাদের কিছু যাবে-আসবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ সংকটের সমাধানের চেয়ে, তা আরও পাকানোতেই তাঁদের মনোযোগ যেন বেশি। এ নিয়ে পার্লামেন্টে ঢিসুম ঢিসুমও করে ফেলেছেন আইনপ্রণেতারা। সেই মারামারি ঠেকাতে কিন্তু পেশিবহুল ‘সুপারম্যান’, ‘থর’ অথবা ‘হাল্ক’-এর বিকল্প নেই।

ওদিকে ভারতে নোট বাতিলের জনদুর্ভোগ এড়াতে ভালো ভূমিকা রাখতে পারত জাদুকর ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’। এক তুড়িতেই হয়তো সমস্যার সমাধান করে ফেলত সে, উড়িয়ে দিত সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প।

বাংলাদেশেও সুপারহিরো প্রয়োজন। সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে এ দেশে রাস্তায় নেমেছিল শিশু-কিশোরেরা। কিন্তু মাস গেলে পরে দেখা যাচ্ছে, অবস্থা যে কে সেই। আজও রাস্তায় হাঁটার সময় ফুটপাত খালি পেলাম না। সেখানে বসেছে দোকান, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গাতেও ভ্রাম্যমাণ দোকান। গাড়িগুলো দাঁড় করানো রাস্তায়। আর আমি, হতভাগ্য পথচারী বাধ্য হয়ে হাঁটছি গাড়ি চলা রাস্তায়। কারওয়ান বাজার মোড়ে এলে দেখা যাবে, ঠিক রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছেন যাত্রীরা। গাড়ির ধাক্কা খাওয়ার কোনো আশঙ্কা যেন নেই!

বলতে গেলে, আরও আছে। দুর্নীতিতে হয়তো আমরা চ্যাম্পিয়ন নই, কিন্তু নাগরিক সুবিধা কতটুকু পাই? স্পিড মানি কোথায় নেই? ট্রেনের টিকিট থেকে পাসপোর্ট—অনিয়ম, দুর্নীতি সবখানেই। সামনে আবার নির্বাচন। বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। পরিবেশ ঠান্ডা করতে একজন সর্ব গুণে গুণান্বিত সুপারহিরো খুব প্রয়োজন। যদি সে অনিয়ম-দুর্নীতি ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে পারত, কী ভালোই না হতো!

শেষ করছি, স্পাইডারম্যান কমিকসে বলা উক্তি দিয়ে। স্রষ্টা স্ট্যান লি তাঁর এই কমিক হিরোর চাচাকে দিয়ে বলিয়ে নিয়েছিলেন, ‘উইথ গ্রেট পাওয়ার কামস গ্রেট রেসপনসিবিলিটি’। এই কথাটিই শেষে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে স্পাইডারম্যানের মূলনীতি হয়ে দাঁড়ায়। আর ঠিক এখানেই সুপারহিরোদের সঙ্গে আমাদের তফাত। আমাদের অনেক ‘পাওয়ারফুল’ মানুষ আছেন, কিন্তু তাঁদের ‘গ্রেট রেসপনসিবিলিটি’ নেই। তাই তাঁরা ‘হিরো’ থেকে ‘সুপারহিরো’ হতে পারেন না।

মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ না থাকাটাই আসলে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন ‘ক্ষমতা’ কারও কল্যাণে আসে না। হম্বিতম্বি বাড়লেও, মানবজাতির মঙ্গল হয় না। ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের মিশেল হলেই একমাত্র একজন ‘হিরো’ হতে পারেন ‘সুপারহিরো’। তা যখন আর হচ্ছে না, তখন সুপারহিরো ছাড়া গতি কি!

অর্ণব সান্যাল: সাংবাদিক