বছরে জিডিপি ক্ষয় ৪০ হাজার কোটি টাকা

ব্যক্তির অদক্ষতায় ক্ষতি রাষ্ট্রের

বছরে জিডিপি ক্ষয় ৪০ হাজার কোটি টাকা * বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা * অদক্ষতার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না

কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিতে বড় বাধা অদক্ষতা
অসতর্কতায় গতি হারাবে অর্থনীতি * গতানুগতিক শিক্ষায় কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই * কারিগরি দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে * জাহাজ নির্মাণ শিল্পসহ ২৬টি খাতে দক্ষ লোকের অভাব * সংকট উত্তরণের কার্যক্রম চলছে খুব ঢিমেতালে

অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেঃ দক্ষ শ্রম পাঁচ ভাগ বাড়লে উৎপাদন বাড়ে চার ভাগ * দরকার মানবসম্পদের বিকাশে অগ্রাধিকার


ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট।’ বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় যোগ্যরাই টিকে থাকে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও এর যোগসূত্র টেনে বলছেন, কোনো দেশে দক্ষ উদ্যোক্তা, দক্ষ শ্রমিক ও মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনা এবং সুদক্ষ দেশপ্রেমিক সরকারের সমন্বয় থাকলে বৈশ্বিক উত্থান-পতনের মধ্যেও সেদেশে ঊর্ধ্বগতির প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে।

তবে এ ক্ষেত্রে সেই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। যেখানে বেসরকারি খাত ও অন্য সংস্থাগুলো সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। এর উদ্দেশ্য সর্বস্তরে দক্ষতা বৃদ্ধি করা।

এ প্রসঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক যুগান্তরকে বলেন, দিনবদল হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নে দেশে প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আইটিতে ক্যারিয়ার গড়তে এগিয়ে আসছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষ করে তুলছে। বর্তমান সরকার তরুণদের জন্য এ প্লাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে। এ লক্ষ্যে তাদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ ও বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সারা দেশে ৬৪টি আইটি পার্ক গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে সেদিন বেশি দূরে নয়। যেদিন প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত এ দেশের তরুণরা একদিন বিশ্ব জয় করবে।

সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করেন, দক্ষতা এমন অমূল্য সম্পদ যা মূল্যায়নের বিচারে প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান সর্বদাই এগিয়ে থাকে। এর সুবিধাও ভোগ করে দক্ষতা অর্জনকারী। তবে এ দক্ষতার মানদণ্ড ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণ অর্থে শ্রমিকের কাজ করার ক্ষমতা বা উৎপাদন ক্ষমতাকে শ্রমের দক্ষতা বলা হয়। অর্থাৎ দ্রব্যের গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রেখে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একজন শ্রমিকের অধিক উৎপাদন করার ক্ষমতাকে শ্রমের দক্ষতা বলা হয়। আবার ব্যবস্থাপনাগত কৌশল দিয়ে অপচয় রোধ করাকেও কৌশলগত দক্ষতা বলা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, শ্রমের দক্ষতা বাড়লে শ্রমিকের উৎপাদন শক্তি বাড়ে। এতে সময় ও সম্পদের অপচয় রোধ হয় এবং দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিভিন্ন পেশায় শ্রম সরবরাহ নিশ্চিত হয়। মজুরির হারেও সমতা আসে। কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মেলে। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হয়, দামস্তরে সমতা আসে, শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে এবং দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতা লাভ করে।

কিন্তু পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শ্রমের উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে। কারণ এখানে প্রবৃদ্ধি সহায়ক কোনো ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে সরকারের যে ভিশনারি চিন্তা ও পরিকল্পনা করছে- তা আমলা দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় সেটি আর যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অন্যদিকে মননশীল উদ্যোক্তারও যথেষ্ট অভাব আছে। তারা শ্রমিককে দিয়ে যেনতেন উপায়ে কাজ আদায় করে নিতে চায়। কিন্তু শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়ন ঘটালে যে তার প্রতিষ্ঠানেরই লাভ সেদিকটি বিবেচনায় আনে না অধিকাংশ উদ্যোক্তা। ফলে শ্রমের অদক্ষতার কারণে অপচয়ও বাড়ছে, যা প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।

এ বিষয়ে ইউকে কমিশন ফর এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড স্কিলস (ইউকেসিইএস-২০১০) বিষয়ক গবেষণায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, উচ্চ দক্ষতা উৎপাদনশীলতার ওপর ধনাত্মক প্রভাব ফেলে। অপরদিকে নিু দক্ষতার প্রভাব ঋণাত্মক হয়। এজন্য দক্ষতা অর্জনে গুরুত্বারোপ করে প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে বলা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতাপূর্ণ শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে চার শতাংশ পর্যন্ত। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে মজুরিও এক দশমিক পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। কারণ উৎপাদন বাড়লে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নিট মুনাফা বেড়ে যায়।

ইউকেসিইএস ২০১০-এর অপর এক গবেষণায় বলা হয়, প্রশিক্ষণের পর উৎপাদনশীলতার ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটে। যেখানে মজুরি বৃদ্ধি পায় তিন দশমিক তিন শতাংশ। আর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকের সঙ্গে অদক্ষ শ্রমিকের উৎপাদনশীলতার পার্থক্য আট শতাংশ পর্যন্ত ঘটে। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিবিদ ব্যালট গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রশিক্ষণের কারণে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন শতাংশ বেশি হয়ে থাকে।

বাংলাদেশেও এ ধরনের জরিপ পরিচালিত হয়েছে। ২০১৭ সালে ব্র্যাকের উদ্যোগে ‘দি পাওয়ার অব অ্যাপ্রেন্টিসশিপস’ শীর্ষক এক জরিপে উল্লেখ করা হয়, দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ নেয়ার পর কর্মসংস্থানে প্রবেশ করলে কিশোর-কিশোরীদের মাসিক গড় আয় বাড়ে প্রায় ছয়গুণ। এর ফলে তাদের সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ে সাড়ে সাতগুণ। ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয় বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের খাদ্য খাতে ব্যয় ৯ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়।

তবে দক্ষতার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আয় অন্য দেশের তুলনায় কম। সেটি দেশে কিংবা প্রবাসে একই চিত্র। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিবাসন বিষয়ক প্রতিবেদন মতে, ২০১৫ সালে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের মাথাপিছু আয় ছিল দুই হাজার ৭৮ দশমিক ৯৫ ডলার। অন্যদিকে একজন ভারতীয় অভিবাসীর মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার ১৯৪ দশমিক ২৪ ডলার, ফিলিপাইনের চার হাজার ৯৫০ ডলার, নেপালের তিন হাজার ৩০০ ডলার ও পাকিস্তানের একজন অভিবাসীর মাথাপিছু আয় হচ্ছে তিন হাজার ২৪১ দশমিক ৯৪ ডলার। অথচ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অন্তত এক কোটি বাংলাদেশি প্রবাসে কাজ করছে। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র দুই শতাংশ পেশাজীবী হওয়ায় রেমিটেন্স কম আসছে। বাকিরা স্বল্প দক্ষ ৫২ শতাংশ, ৩১ শতাংশ দক্ষ, ১৪ শতাংশ আধাদক্ষ।

অন্যদিকে অদক্ষতার কারণে অপচয়ের বিভিন্ন দৃষ্টান্তও আছে ভূরি ভূরি। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ : শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা উন্নয়নে সুযোগ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক জরিপ তথ্যে এর একটি বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো ১৬ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানির ব্যবহার কমাতে পারে, পাশাপাশি জ্বালানির খরচ ২১ শতাংশ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। দেখানো হয়, এ প্রকল্পে অংশ নেয়া ৩৬টি কারখানার মাধ্যমে বার্ষিক গড়ে এক লাখ ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার করে ৫২ লাখ ডলারের জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব, যদি সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো যায়। এছাড়া দক্ষতা উন্নয়নে ইতিমধ্যে বিজিএমইএ ‘ট্রিস’ নামে একটি প্রকল্প চালু করেছে। এর মাধ্যমে প্রতি বছর ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫২৭ কিলোওয়াট আওয়ার পাওয়ার সঞ্চয় হচ্ছে। বাজার মূল্যে এর আর্থিক পরিমাণ হবে এক কোটি ৯ লাখ ৭২ হাজার ১৬৮ টাকা।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি ও অপচয় রোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এর অনুপস্থিতির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার অনেক কম। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০১৭ সালে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৬২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ হার সবচেয়ে বেশি ছিল ভিয়েতনামে (৭৮ দশমিক ২২ শতাংশ)। অথচ তিন দশক ধরে বাংলাদেশে এটা ৫৬ থেকে ৫৮ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উদ্যোক্তা আবদুস সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, সস্তা শ্রমের ওপর এক সময় বাংলাদেশে শিল্পের বিকাশ হলেও এখন দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে উদ্যোক্তাদের টিকে থাকতে হবে। পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, বাজার সম্প্রসারণ ও নিজস্ব ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এজন্য দরকার দক্ষতা অর্জন। সেটা শ্রমশক্তি এবং ব্যবস্থাপনা উভয় জায়গাতেই দরকার আছে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে শিল্পের অগ্রগতি একটা সময়ে গিয়ে আর বেশিদূর এগিয়ে নেয়া যাবে না। কাজেই এ অবস্থায় শ্রমিকের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে তোলার জন্য সরকার ও মালিকদের উদ্যোগ নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, বাংলাদেশের বেকার সমস্যা সমাধান ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় হলেও অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা মোটেও ভালো নয়। কারণ এর অর্থনৈতিক কাঠামোয় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল দক্ষ শ্রমিকের অভাব। মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর ঘাটতিও ব্যাপক। এক কথায় দেশের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও সেবা খাতসংশ্লিষ্ট সার্বিক ব্যবস্থাপনার কোনোটিতেই প্রত্যাশিত দক্ষ কর্মী নেই।

আশঙ্কার কারণ হল কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৮৬ শতাংশ অদক্ষ। আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। অর্থাৎ অদক্ষতার ভারে দিন দিন দুর্বল হচ্ছে অগ্রসরমান অর্থনীতি।

২০১৫ সালে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৮ সালে এসেও সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও, আইএমএফ, এডিবি ও আইডিবিসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষণে তা সুনির্দিষ্ট করেছে।

সেখানে অগ্রসরমান অর্থনীতির প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে কয়েকটি কারণের মধ্যে প্রথমে রেখেছেন দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টি।

কর্মক্ষম শ্রমশক্তির এ বেহাল দশা নিয়েই বাংলাদেশ এখন মোটা দাগে তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এক. ২০২৪ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি আদায়। দুই. ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং তিন. ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পৌঁছানো।

এ পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সবার আগে দরকার মানবসম্পদের উন্নয়ন। মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাই পারে এর নিশ্চয়তা দিতে। এটাই দক্ষতা উন্নয়নের কার্যকর উপায়।

দক্ষতা থাকলে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্থায়ী আয়-উপার্জন এবং শ্রমের বিনিময়ে ভালো অর্থপ্রাপ্তিরও নিশ্চয়তা মেলে। এর প্রভাবে পরিবারের সমৃদ্ধি ঘটে। এর সার্বিক প্রভাবে অর্থনীতি কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধির দিকে চালিত হয়।

অর্থনীতিতে দক্ষ লোকের সংখ্যা যত বেশি হবে সার্বিক প্রবৃদ্ধিও তত দ্রুত হবে। পাশাপাশি সেটি টেকসইও হবে।

এ প্রসঙ্গে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন শিকদার বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারলে বিশেষ করে কর্মক্ষম যুবশক্তিকে অদক্ষ রেখে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। তাই সরকার দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক মোট ৭৫টি ট্রেডে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ৯ বছরে ২২ লাখ ৩৭ হাজার ৮৬ জনকে এসব ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ যুবক ও যুব মহিলাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু দক্ষতা উন্নয়ন নয়, পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবেও তাদের গড়ে তোলার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে যুগোপযোগী ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং, হাউজকিপিং, ট্যুরিস্ট গাইড, ফ্রন্ট ডেস্ক, ম্যানেজমেন্ট, সেলসম্যানশিপ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ই-লার্নিং, কোয়েল পালন কোর্সে প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তৈরি পোশাক খাতসহ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পসহ ২৬টি খাতে দক্ষ লোকের ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। অথচ সংকট উত্তরণের কার্যক্রম চলছে খুব ঢিমেতালে। সরকার, আমলা, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা এবং রাজনীতিকদের কাছে এটি গুরুত্বহীন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষতা উন্নয়নের কার্যক্রমে গতি না পেলে ডাবল ডিজিটে প্রবৃদ্ধি অর্জন তো দূরের কথা, কাঙ্ক্ষিত তিনটি লক্ষ্যের কোনোটির দ্বারপ্রান্তেই পৌঁছানো যাবে না।

এ প্রসঙ্গে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক আবদুস সালাম যুগান্তরকে বলেন, কর্মক্ষম ও দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে তরুণদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। সবার আগে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।

ব্যবসায়ীদের অন্যতম সংগঠন ডিসিসিআই সূত্রমতে, ২০১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৬ শতাংশ হারে হয়েছে। এ সময় মাত্র ২৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ তখন দেশে চাকরিরত মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি সাত লাখে। এ হিসাবে কর্মসংস্থানের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১.১২ শতাংশ, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধির এক-ষষ্ঠাংশেরও কম।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) ‘লেবার মার্কেট অ্যান্ড স্কিল গ্যাপ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় দাবি করা হয়, দক্ষ জনশক্তির অভাব বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বড় বাধা। কেননা উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং দক্ষ শ্রমশক্তির মধ্যে পারস্পরিক আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার দক্ষ শ্রমশক্তি। আবার শ্রমশক্তির চাহিদা বাড়ার জন্য দরকার উচ্চ প্রবৃদ্ধি। তবে চাহিদা হবে দক্ষ শ্রমিকেরই।

এতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, শিগগিরই দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারলে প্রবৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে আটকে থাকবে। একপর্যায়ে সেটিও আর ধরে রাখা যাবে না। এমনটি হলে উন্নয়নশীলের ধাপ পেরিয়ে উন্নত দেশে পৌঁছানোর স্বপ্ন একটা সময় দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।

অর্থনীতিবিদ ও পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ যুগান্তরকে বলেন, কর্মক্ষম (কাজ করার উপযোগী) জনসংখ্যা দেশের সম্পদ ও সম্ভাবনার বড় জায়গা। দক্ষ ও সুপ্রশিক্ষিত শ্রমশক্তিই পারে দেশকে বদলে দিতে। কিন্তু গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা এ শ্রমশক্তি তৈরি করতে পারছে না। আবার কারিগরি শিক্ষার যে ব্যবস্থা রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। পরিবর্তিত কর্মক্ষেত্র এবং প্রযুক্তির সঙ্গেও সেটা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাদের যে গুণমানসম্পন্ন শিক্ষা পাওয়া দরকার, তাতেও ঘাটতি আছে। যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তা যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে না এবং বাজারের চাহিদাও মেটায় না। ফলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটিও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে।

সর্বশেষ শ্রমশক্তির জরিপ (২০১৬-১৭) : বিভিন্ন বয়সী কর্মক্ষম মোট জনগোষ্ঠী দেখানো হয় ১০ কোটি ৯০ লাখ। যার সংখ্যাগরিষ্ঠই অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারছে না। জরিপের তথ্যমতে, মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৪ লাখ মানুষের মধ্যে কর্মক্ষম (৬৫-তদূর্ধ্ব) বয়সী লোক আছে ৭৯ লাখ। আবার ১৫-৬৪ বয়সীর এ সংখ্যাটি ১০ কোটি ১১ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় শতকরা ৬২ দশমিক ৭০ শতাংশ।

অপরদিকে ১৫-২৯ বয়সীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি। যা মোট জনসংখ্যার ৭৯ ভাগ।

বিভিন্ন পর্যালোচনায় মূলত এই তরুণ জনগোষ্ঠীর বেকারত্ব মোচন এবং দক্ষতা উন্নয়নের ভাবনাটিই এই সময়ের বড় দাবি হয়ে উঠছে।

কিন্তু তার অগ্রগতি সেভাবে হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) দক্ষতাপূর্ণ শ্রমজরিপ তথ্য পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তথ্যানুযায়ী, কারিগরি শিক্ষার হার উন্নত দেশে ৬০ শতাংশের বেশি। ভারতে এটি ২৭ শতাংশ, নেপালে ২৩ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৪০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে গ্র্যাজুয়েট লেভেলে কারিগরি শিক্ষায় পাসের হার মাত্র ১৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর থেকেই বোঝা যায়, এ দেশগুলোর উন্নতির সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার সম্পর্ক কী? আমাদেরও বুঝতে হবে এর গলদটা কোথায়?

অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত যুগান্তরকে বলেন, কারিগরি শিক্ষার অপর্যাপ্ততার প্রভাব পড়ছে সার্বিক কর্মসংস্থানে। উৎপাদন তথা উন্নয়ন-অগ্রগতিতে বাধা আসছে। সরকারি খাতে চাকরির সুযোগ কম। বেসরকারি খাতে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

এর অভাবে অনেক মেধাবী ও উচ্চতর ডিগ্রিধারীরাও থাকছে বেকার অথবা চাহিদা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছে না। তিনি বলেন, জনগোষ্ঠীর ৭৯ শতাংশ হচ্ছে যুবশক্তি। তিনি আরও বলেন, উচ্চশিক্ষা ব্যক্তিগতভাবে লাভজনক হলেও এটা উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করে না। এ পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধির পরবর্তী পর্যায়ে যেতে হলে কর্মমুখী দক্ষতা, প্রশিক্ষণের মান ও উৎপাদনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিকল্প নেই।

আইএলও’র ‘ডিসেন্ট ওয়ার্ক ডিকেড : এশিয়া, প্যাসিফিক অ্যান্ড দ্য আরব স্টেট’ শীর্ষক ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ চ্যাপ্টার সম্পর্কে আশঙ্কাজনক তথ্য দেয়া হয়েছে। এ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এ দেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৪০ শতাংশ তরুণ শিক্ষায় নেই, চাকরি করছেন না, আবার চাকরিতে যোগ দেয়ার জন্য কোনো প্রশিক্ষণও গ্রহণ করছেন না। যদিও তারা শ্রমবাজারেরই অংশ কিন্তু পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়।

মধ্যপ্রাচ্যের ২১টি দেশের মধ্যে খারাপের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সাধারণ শিক্ষা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া তরুণদের অনেকে শ্রমবাজারে খাপ খাওয়াতে পারেন না।

নিজের সামাজিক জীবনমানের পাশাপাশি দেশের উন্নতির জন্য দরকার কারিগরি শিক্ষার প্রসার। এজন্য বাজারের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে এ তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার সময় এসেছে। এর জন্য শিক্ষা পরিকল্পনাকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

উৎপাদন ও সেবা খাতে দেশের উদ্যোক্তারা প্রতিনিয়ত দক্ষ কর্মীর খোঁজে থাকেন। পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী একজন দক্ষ কর্মীকে নানাভাবে অভিহিত করা যায়। যেমন- জটিল সমস্যা সমাধানে সক্ষম, বিশ্লেষণধর্মী ভাবনা, সৃজনশীলতা, মানব ব্যবস্থাপনা, অন্যদের সঙ্গে সমন্বয়, আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সঠিক বিচার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সেবামূলক মনোভাব এবং সমঝোতার অধিকারী ব্যক্তি।

কিন্তু দেশে গতানুগতিক শিক্ষার সনদধারীদের মধ্য থেকে চাহিদা অনুযায়ী এ মানের দক্ষ কর্মী পাওয়া যায় না। এ কারণে বিভিন্ন খাতে কর্মরতদের অদক্ষতার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। তবে এ অদক্ষতার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।

বিআইডিএস ‘লেবার মার্কেট অ্যান্ড স্কিল গ্যাপ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখানো হয়, হালকা প্রকৌশল খাতে কর্মরত শ্রমিকদের ৭৫ শতাংশ নির্মাণ খাতে ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কৃষিতে ৬০ শতাংশ অদক্ষ। এছাড়া জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ৯৫ শতাংশ অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ। এর বাইরে তৈরি পোশাক খাতে ৯২ শতাংশ, আইসিটিতে ৪০ শতাংশের বেশি, চামড়া শিল্পে ৮৬ শতাংশ, পর্যটন খাতে ৭২ শতাংশ প্রবেশ করে অদক্ষ লোক।

স্বাস্থ্য খাতের প্রযুক্তিনির্ভর পদগুলোতে আরও বেহাল। বিভিন্ন খাতে কর্মরতদের অদক্ষতায় চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের তাদের ব্যবসার গুণগত মান ও বিপণন আধিপত্য ধরে রাখার জন্য জনবল আমদানি করতে হচ্ছে। আবার এর উল্টোটিও হচ্ছে।

আবার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বা খাত স্থানীয় দক্ষ কর্মী থাকার পরও তাদের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। তবে বাস্তবতা হল- দেশে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। উচ্চশিক্ষা থেকে নানাবিধ শিক্ষার বাণিজ্যিক প্রসার ঘটলেও মেধাবী কর্মী মিলছে না। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন কারখানায় উচ্চপদস্থ মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা দেখানোর মতো কর্মী খুঁজে পাওয়া যায় না। এভাবে কর্মীর অদক্ষতা মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এ প্রসঙ্গে খোদ অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অদক্ষতার কারণে বছরে মোট দেশজ উৎপাদনে ৪০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দুই লাখ দক্ষ বিদেশি কর্মীর মজুরি হিসেবে বিপুল পরিমাণ টাকা গুনতে হচ্ছে। বিদেশি কর্মীরা এ বিপুল পরিমাণ টাকা প্রতি বছর ব্যাংকিং চ্যানেলে বা অন্য কোনো পথে নিয়ে যাচ্ছেন।

অদক্ষতার সুযোগ নিয়ে দেশীয় অর্থনীতির চালকের আসনে এখন বিদেশিরা। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ না থাকায় বিপাকে পড়েছেন শিল্প মালিকরাও। উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা সচল রাখতে তারা প্রকৃত মজুরির চেয়েও দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি মজুরিতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ, ব্যবস্থাপক ও দক্ষ শ্রমিক আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এসব বিদেশি কর্মীর পেছনে উদ্যোক্তাদের প্রতি বছর গড়ে মজুরি দিতে হচ্ছে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলারের মূল্যমান ৮০ টাকা ধরলেও এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাবে বর্তমানে চলতি বাজার মূল্যে জিডিপি পরিমাপ করা হচ্ছে ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতি বছর দেশীয় জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ প্রতি বছর বিদেশিরা নিয়ে যাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয় এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পৌঁছাতে হলে সামনের দিনগুলোতে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর নির্ভর করতে হবে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জন জরুরি। এজন্য সরকার এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন ইনপুট ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

বাস্তবতা হল- বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দেশে দক্ষতা উন্নয়নে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আবার কাক্সিক্ষত মাত্রায় বৈদেশিক বিনিয়োগ আসায় বিদেশি প্রযুক্তি ও দক্ষতার সঙ্গেও দেশের সংযোগ ঘটছে না।

আঙ্কটাডের ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট-২০১৮ অনুযায়ী ২০১৭ সালে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে ২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। যেখানে প্রতিবেশী ভারতে ৪০ বিলিয়ন, চীনে ১৩৬ বিলিয়ন এবং ভিয়েতনামে ১৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি ও ভোকেশনাল এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রসারের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি জরুরি।

জানা গেছে, জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সরকার একটি শিক্ষানীতি হাতে নেয়। এ নীতি খুবই প্রগতিশীল এবং সময়োপযোগী। যেখানে শ্রমসংশ্লিষ্ট কাজের কথা বলা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও নৈতিকতার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এখানে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে কারিগরি শিক্ষার কথাও বলা হয়েছে। যেখানে অষ্টম শ্রেণীর পর যদি কেউ আর লেখাপড়া না করে সে যেন দক্ষতা অনুযায়ী একটি কর্ম বেছে নিতে পারে সে লক্ষ্যে নির্দেশনা রয়েছে।

আর যদি লেখাপড়া করে তাহলে কারিগরি শিক্ষা নিতে হবে। এরপর ২০১১ সালে দক্ষতা উন্নয়ন নীতি নামে আরেকটা নীতি প্রণয়ন করা হয়। এর জন্য একটা কাউন্সিলও গঠিত হয়েছে। কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো আইন বা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। নীতিগুলো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত শিক্ষা আইন হয়নি।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের শিল্প খাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমের মধ্যে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এটি দূরীকরণে শিল্প-শিক্ষায়তন সম্পর্ক আরও গভীর করা প্রয়োজন। কারণ দেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের হার সবচেয়ে বেশি।

আবার ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অনুযায়ী মানবসম্পদ পাচ্ছে না। তাই শিল্প-কলকারখানার চাহিদামাফিক দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ সরবরাহের উদ্দেশ্যে এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সিলেবাস প্রণয়ন করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতিতেও সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি আরও বেশি বাস্তবানুগ ও আধুনিকীকরণ করে শিল্পের দক্ষতা চাহিদা মেটাতে এগিয়ে আসতে হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) শামসুল আলম যুগান্তরকে বলেন, প্রবৃদ্ধিকরণ, জনগণের ক্ষমতায়ন এ স্লোগান নিয়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। সেখানে আর্থ-সামাজিক সূচকের চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নেই বেশি জোর দেয়া হয়েছে।

এজন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে বিনিয়োগ, কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে। যেখানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদাকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

‘গ্লোবাল হেলথ ওয়ার্কফোর্স লেবার মার্কেট প্রজেকশন ফর-২০৩০’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে আট কোটি দক্ষ ও স্বল্পদক্ষ নার্স, মেডিকেল পেশাজীবীসহ স্বাস্থ্যসেবীর চাহিদা তৈরি হবে। কিন্তু চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ছয় কোটি ৫০ লাখ দক্ষ কর্মী তৈরি হবে। দেড় কোটি স্বাস্থ্যসেবীর ঘাটতি দেখা দেবে।

তথ্যানুযায়ী উচ্চমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এ চাহিদা তৈরি হবে। বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান এ চাহিদা মেটাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ। বর্তমান বিশ্বের শ্রমবাজার হল মেধাভিত্তিক বাজার। কিন্তু আমাদের প্রবাসীদের বেশির ভাগই শ্রমভিত্তিক পেশায় জড়িত। বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) খাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানে এ মুহূর্তে ২০ লাখ প্রোগ্রামার প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রতি বছর দুই লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করা গেলে বিপিও খাতে তাদের ব্যাপক কর্মসংস্থান হতে পারে। বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ প্রবাসী আয়। বৈদেশিক বিনিয়োগের চেয়ে প্রবাসী আয় বহুগুণ বেশি।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় দশ লাখ বাংলাদেশির। কিন্তু এই প্রবাসী শ্রমিকদের বেশির ভাগই অদক্ষ এবং স্বল্পদক্ষ। তাদের পরিপূর্ণভাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে বিদেশে পাঠানো গেলে প্রবাসী আয় বর্তমানের তুলনায় তিনগুণ বাড়ত।