ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের দাবি

ব্যাংক একীভূতকরণ

ভারতের পথে হাঁটবে কি বাংলাদেশ?

হাছান আদনান

ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে নন-পারফর্মিং অ্যাসেটের (এনপিএ) হার সবচেয়ে বেশি দেনা ব্যাংকে। মন্দঋণের ভারে ন্যুব্জ এ ব্যাংকটিসহ বিজয়া ব্যাংক একীভূত হচ্ছে আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অব বরোদার সঙ্গে। পরিচালন ব্যয় কমানো, আর্থিক ভিত শক্তিশালীকরণ ও নন-পারফর্মিং অ্যাসেটের ধাক্কা সামলাতেই একীভূতকরণের পথে হেঁটেছে ব্যাংক তিনটি। এর মধ্য দিয়ে বরোদা হচ্ছে দেশটির তৃতীয় বৃহৎ ব্যাংক।

ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশোধন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একীভূতকরণের এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত ২১টি ব্যাংকের মধ্যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ১১টি ব্যাংক রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশোধন প্রক্রিয়ার আওতায়। শুধু ভারতে নয়, প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সময়ে সময়ে একীভূত হচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক।

এক দশক ধরে দেশের আর্থিক খাতে আলোচিত হচ্ছে সিংহভাগ ব্যাংকের দৈন্যতার বিষয়টি। ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের চাপে পড়ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের কারণে পড়তে হচ্ছে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিতে। ভালো পরিচালন মুনাফা করেও শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশিত মুনাফা দিতে পারছে না ব্যাংকগুলো। ব্যাংকের চেয়েও নাজুক অবস্থা ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) ক্ষেত্রে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বিভিন্ন সময় একীভূতকরণের কথা বলেছেন। ২০০৯ সালে শিল্প ঋণ সংস্থা ও শিল্প ব্যাংক একীভূত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) গঠিত হয়। এরপর দেশের কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ পথে হাঁটেনি।

বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধূরী বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মালিক সরকার। এ ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত সরকার নিতে পারে। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পর্ষদকে। ব্যাংকগুলো নিজ থেকে এগিয়ে না এলে জোর করে একীভূত করে দেয়ার ফল ভালো না-ও হতে পারে। সবল ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে চাইবে না। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ব্যাংকের এক্সিট পলিসি না থাকা। সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংককে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেয়া দরকার। লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে।

বর্তমানে দেশে ৫৯টি তফসিলি ব্যাংক কার্যক্রমে আছে। নতুন নতুন ব্যাংকও এ খাতে যুক্ত হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এ সংখ্যাকে বেশি বলে মনে করছেন ব্যাংকার ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সিংহভাগ ব্যাংকের সম্পদ ১৫ হাজার কোটি টাকার নিচে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ হাজার কোটি টাকারও কম। এ অবস্থায় পরিচালন ব্যয় নির্বাহেই শেষ হয়ে যাচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের ভারও বইতে হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এ খাতে একীভূতকরণের পথেই হাঁটতে হবে।

পরিস্থিতি দাবি করলেও সদিচ্ছার অভাবেই দেশের ব্যাংকিং খাতে একীভূতকরণ সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, অনেক আগেই দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূতকরণ কিংবা অবসায়নের দরকার ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। আইন বা নীতিমালায় যা-ই থাক না কেন, ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্তটি আসতে হবে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে। একদিকে নতুন ব্যাংক অনুমোদনের সুপারিশ, অন্যদিকে একীভূতকরণের উদ্যোগ পরস্পরবিরোধী। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে একীভূতকরণের কথা বলা আছে ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১তেও। আইনের ৪৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের অনুরোধক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণ প্রস্তাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন-১৯৯৩-এর বিধান অনুযায়ীও বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণে সহায়তা করার ক্ষমতা রাখে। উভয় আইনের বিধান বাস্তবায়নে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূতকরণের জন্য ২০০৭ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের আর্থিক খাতের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে নীতিমালটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। গাইডলাইনস ফর মার্জার/অ্যামালগামেশন অব ব্যাংকস/ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস শীর্ষক এ নীতিমালায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, একটি ব্যাংক অন্য ব্যাংকের সঙ্গে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হতে পারবে। যেকোনো ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনসাপেক্ষে অধিগ্রহণ করতে পারবে। তবে যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পর্ষদ থেকে। এক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনও থাকতে হবে।

একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি ‘ডিউ-ডিলিজেন্স’ প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায়ের বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হবে। ডিউ-ডিলিজেন্সের প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে একীভূত হতে যাওয়া নতুন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনাও। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবেদনগুলোর যথার্থতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায়ের মূল্যমান নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে উচ্চ আদালতে পিটিশন দায়ের করতে হবে। আদালতের নির্দেশেই চূড়ান্ত বিচারে যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

একীভূত হওয়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়দেনার মূল্যমান নির্ধারণ, শেয়ারমূল্য, মূলধন, লভ্যাংশসহ সব বিষয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ-বিষয়ক নীতিমালাটি প্রণয়ন করার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ স্বল্পোন্নত ও উন্নত দেশগুলোর ব্যাংক একীভূতকরণ নীতিমালা পর্যালোচনা করেই আমরা বাংলাদেশের জন্য নীতিমালাটি তৈরি করেছিলাম। সময়ের চাহিদার ভিত্তিতে ওই সময় নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও এখনো তার বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই ব্যাংক একীভূত হচ্ছে না। অথচ আমাদের দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিংহভাগই দুর্বল হয়ে ধুঁকছে। অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের আমানত পরিশোধ করতে পারছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে জনগণের পকেটের অর্থ দিয়ে মূলধন জোগান দেয়া হচ্ছে। এ তালিকায় নতুন করে বেসরকারি ব্যাংকও যুক্ত হয়েছে।

তবে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এজন্য সম্ভাব্য সব বিকল্পই ভাবা হচ্ছে বলে জানান অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং আর্থিক খাতের শৃঙ্খলার বিষয়ে জোর দিয়েছেন। ব্যাংকিং খাতসহ পুরো আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা সতর্ক আছি। এ ব্যাপারে সম্ভাব্য যত বিকল্প আছে সবই ভাবা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীও এর আগে ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয়ে কথা বলেছেন। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা উন্নত করতে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করব।