নানা উদ্যোগেও প্রশমিত হয়নি পোশাক শিল্পে অস্থিরতা

পোশাক শিল্পে ন্যূনতম মজুরিকে ঘিরে সৃষ্ট শ্রম অসন্তোষ প্রশমনে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এক মাসের মধ্যে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেয়া হয়েছে গত মঙ্গলবার। তার পরও প্রশমিত হয়নি অসন্তোষ। গতকালও বিক্ষোভ, ভাংচুর, সড়ক অবরোধ হয়েছে ঢাকাসহ শিল্প অধ্যুষিত সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে। সব মিলিয়ে বন্ধ হয়েছে ৮০টির মতো কারখানা।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) তথ্যমতে, গতকালও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। কারখানায় এসে হাজিরা দিয়ে বেরিয়ে যান দলে দলে। কোথাও কোথাও কারখানার ভেতরেই বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। এভাবে সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা ও আশুলিয়ার প্রায় ৩০টি পোশাক কারখানা। এর মধ্যে অনেক কারখানায় সহিংসতার আশঙ্কায় মালিকপক্ষ স্বপ্রণোদিতভাবে ছুটি ঘোষণা করে। ছুটি ঘোষণা করা এসব কারখানার মধ্যে আছে সাফা সোয়েটার, আয়েশা ক্লথ, ডেকো ডিজাইন, ইউনিভার্স নিটিং, ফ্যাশন ফোরাম, ফ্যাশন ইট, এফজিএস ডেনিম ওয়্যার, টেক্সটাউন ডিজাইন, অরনেট অ্যাপারেলস, আল মুসলিম গ্রুপ, এনলিনা টেক্সটাইল, মেট্রো নিটিং, মিলেনিয়াম ড্রেসেস, ক্রস ওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ, রেডিয়েন্স নিটওয়্যার, এআর জিম প্রডিউসার, স্ট্যান্ডার্ড স্পিচ, লিলি অ্যাপারেলস, গ্রীন লাইফ নিটেক্স, গ্লেয়ার ফ্যাশন, জেড-৩ কম্পোজিট, ম্যাগপাই কম্পোজিট, ক্রেজি ফ্যাশনস, টিএসএল, টিপটপ গার্মেন্টস, ওয়্যার ম্যাট গার্মেন্টস, আধুনিক গার্মেন্টস ও টপ জিন্স। এ কারখানাগুলো ঢাকার মিরপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় অবস্থিত।

ডিআইএফই ও শিল্প পুলিশ বলছে, ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে মজুরি নিয়ে শ্রম অসন্তোষ নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হলেও শ্রমিকরা এখনো বিভ্রান্তিতে রয়েছেন। মজুরিবৈষম্য নিরসনের যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সে সম্পর্কেও ভালোভাবে অবগত নন শ্রমিকরা। এর ফলে বুধবার ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে সব মিলিয়ে প্রায় ৮০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

শিল্প পুলিশের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি আবদুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, গাজীপুর-সাভার-আশুলিয়ায় মোট ৬১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে আজ (বুধবার)। অসন্তোষ প্রশমিত হয়নি কারণ সরকারের উদ্যোগের বার্তাটি শ্রমিকরা হয়তো যথাযথভাবে পাননি। পুরো পরিস্থিতি আমরা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছি। আগামীকালও (বৃহস্পতিবার) আমরা পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখব। আশা করছি, পরিস্থিতি দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে আসবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে মোট আট প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে।

বণিক বার্তার প্রতিনিধিদের তথ্যমতে, গতকাল সকালে সাভারের উলাইল, কাঠগড়া, আশুলিয়ার জামগড়া, নরসিংহপুর, জিরাব, ধামরাইয়ের কসমসসহ ১২টি স্থানে পোশাক শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়ক ও বিশমাইল-জিরাব সড়কে অবস্থান নিলে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল, রাবার বুলেট, জলকামান ও লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন কারখানার সামনে বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আশুলিয়া-সাভারের প্রায় ২০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণাসহ বেশকিছু কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়েছে বলে শিল্প পুলিশ ও শ্রমিক সূত্রে জানা গেছে।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমদাদ হোসেন জানান, গতকাল সকালে গাজীপুর মহানগরীর সাতাইশ এলাকার হপলোন অ্যাপারেলসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। একই সময় জয়দেবপুর চৌরাস্তাসংলগ্ন নাওজোড় এলাকার দিগন্ত সোয়েটারসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ, থানা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। শ্রমিকরা কয়েকটি কারখানা ভবনের গ্লাস ও গাড়ি ভাংচুর করেন।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মো. হুমায়ূন কবির। তিনি বলেন, শ্রমিকদের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে টঙ্গী, হোতাপাড়া, কোনাবাড়ী ও মৌচাক এলাকায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এসব বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ওয়েস্ট নিটওয়্যার লি. ও পিএম নিট টেক্সটাইল নামে দুটি কারখানার শ্রমিকরা গতকাল বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ-আদমজী-ডেমরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। খবর পেয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ ও শিল্পাঞ্চল পুলিশ শ্রমিকদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে নিলে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।

শিল্পাঞ্চল পুলিশ-৪, নারায়ণগঞ্জ জোনের পরিচালক পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও বেতনবৈষম্য নিরসনের দাবিতে দুটি কারখানার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। খবর পেয়ে পুলিশ কারখানায় গিয়ে ৫-৭ মিনিটের মধ্যে তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। পরে তাদের কারখানার ভেতরে নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা হয়েছে।

এদিকে পোশাক খাতের শ্রম অসন্তোষ নিয়ে সচিবালয়ে গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এ সময় তিনি বলেন, উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকপক্ষের পাঁচজন, শ্রমিকপক্ষের পাঁচজন এবং বাণিজ্য, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক মাসের মধ্যে সমস্যা সমাধান করা হবে। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।

টিপু মুনশি আরো বলেন, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকরা বেতন পাবেন। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কারো বেতন বৃদ্ধি পেলে বকেয়া হিসেবে পরের মাসের বেতনের সঙ্গে পাবেন। কোনো অবস্থায় শ্রমিকের সংখ্যা কমানো হবে না। সমস্যা সমাধানের জন্য কমিটিকে কিছু সময় দেয়া প্রয়োজন।

শ্রমিকদের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। তিনি বলেন, আমরা তড়িঘড়ি করে সমস্যার সমাধান করতে চাচ্ছি। যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তাতে যোগ-বিয়োগের কোনো ভুল থাকতে পারে, মিটিংয়ে এসব বিষয় যাচাই-বাছাই করে সমাধান সম্ভব। মঙ্গলবার গঠিত ত্রিপক্ষীয় কমিটি বৃহস্পতিবার (আজ) প্রথম বৈঠকে বসবে। এ বৈঠকেই সমাধান আসবে বলে আশা করি।

মন্নুজান বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত শ্রমিকবান্ধব। তিনি নিজেই সুপারিশ করে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। এখন নতুন মজুরি কাঠামোর কোথাও কোনো অসুবিধা থাকলে আলোচনা করে তা ঠিক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাই আর কোনো বিশৃঙ্খলা নয়। সবাইকে কাজে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করছি।