পোশাক শ্রমিকদের মূল মজুরি বাড়ল ১০ থেকে ৫২৪ টাকা

পোশাক খাতে চলমান শ্রম অসন্তোষ নিরসনে ছয়টি গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরি সংশোধনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী এবং পোশাক শিল্পের মালিক প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর গতকাল শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংশোধিত মজুরি ঘোষণা করা হয়। এতে গ্রেডভেদে মূল মজুরি বেড়েছে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৫২৪ টাকা।

সমন্বিত মজুরি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রেড ৭-এ মূল ও মোট মজুরি অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০১৩ সালে এ গ্রেডের মূল মজুরি ছিল ৩ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে পর্যালোচনার পর মূল মজুরি নির্ধারণ হয় ৪ হাজার ১০০ টাকা। নতুন সংশোধনীতেও মূল মজুরি ৪ হাজার ১০০ টাকাই পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে মোট মজুরিও ৮ হাজার টাকা অপরিবর্তিত আছে।

গ্রেড ৬-এ ২০১৩ সালে মূল মজুরি ছিল ৩ হাজার ২৭০ টাকা। ২০১৮ সালের প্রজ্ঞাপনে মূল ও মোট মজুরি নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ৪ হাজার ৩৭০ ও ৮ হাজার ৪০৫ টাকা। নতুন সংশোধনীতে মূল ও মোট মজুরি ৪ হাজার ৩৮০ ও ৮ হাজার ৪২০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ পূর্বঘোষিত কাঠামোর তুলনায় মূল ও মোট মজুরি বেড়েছে যথাক্রমে ১০ ও ১৫ টাকা।
গ্রেড ৫-এ ২০১৩ সালে মূল মজুরি ছিল ৩ হাজার ৫৩০ টাকা। ২০১৮ সালে মূল ও মোট মজুরি নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ৪ হাজার ৬৭০ ও ৮ হাজার ৮৫৫ টাকা। এবার তা সংশোধনের মাধ্যমে মূল ও মোট মজুরি যথাক্রমে ৪ হাজার ৬৮৩ ও ৮ হাজার ৮৭৫ টাকা করা হয়েছে। এ হিসাবে ২০১৮ সালের ঘোষিত কাঠামোর তুলনায় এ গ্রেডের শ্রমিকদের মূল ও মোট মজুরি বেড়েছে যথাক্রমে ১৩ ও ২০ টাকা।

গ্রেড ৪-এ ২০১৩ সালে মূল মজুরি ছিল ৩ হাজার ৮০০ টাকা। ২০১৮ সালে পর্যালোচনার পর মূল ও মোট মজুরি নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ৪ হাজার ৯৩০ ও ৯ হাজার ২৪৫ টাকা। সংশোধনের পর মূল ও মোট মজুরি হয়েছে যথাক্রমে ৪ হাজার ৯৯৮ ও ৯ হাজার ৩৪৭ টাকা। অর্থাৎ পূর্বঘোষিত কাঠামোর তুলনায় সংশোধনিতে মূল ও মোট মজুরি বেড়েছে যথাক্রমে ৬৮ ও ১০২ টাকা।

গ্রেড ৩-এ ২০১৩ সালে মূল মজুরি ছিল ৪ হাজার ৭৫ টাকা। ২০১৮ সালে মূল ও মোট মজুরি নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ৫ হাজার ১৬০ ও ৯ হাজার ৫৯০ টাকা। গতকাল ঘোষিত সংশোধনীতে মূল ও মোট মজুরি যথাক্রমে ৫ হাজার ৩৩০ ও ৯ হাজার ৮৪৫ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে পূর্বঘোষিত মজুরি কাঠামোর তুলনায় মূল ও মোট মজুরি বেড়েছে যথাক্রমে ১৭০ ও ২৫৫ টাকা।

গ্রেড ২-এ ২০১৩ সালে মূল মজুরি ছিল ৭ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে মূল মজুরি ৮ হাজার ৫২০ ও মোট মজুরি ১৪ হাজার ৬৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন সংশোধনীতে মূল ও মোট মজুরি যথাক্রমে ৯ হাজার ৪৪ ও ১৫ হাজার ৪১৬ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এ হিসাবে সংশোধনীতে মূল ও মোট মজুরি বেড়েছে যথাক্রমে ৫২৪ ও ৭৮৬ টাকা।

গ্রেড ১-এ ২০১৩ সালে মূল মজুরি ছিল ৮ হাজার ৫০০ টাকা। ২০১৮ সালে মূল ও মোট মজুরি নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ১০ হাজার ৪৪০ ও ১৭ হাজার ৫১০ টাকা। নতুন সংশোধনীতে মূল ও মোট মজুরি হয়েছে যথাক্রমে ১০ হাজার ৯৩৮ ও ১৮ হাজার ২৫৭ টাকা। এ হিসাবে মূল ও মোট মজুরি বেড়েছে যথাক্রমে ৪৯৮ ও ৭৪৭ টাকা।

এর আগে গত নভেম্বরে পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হয়। এতে অসংগতির অভিযোগ এনে ডিসেম্বরেই বিক্ষোভ ও শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হয় বিভিন্ন কারখানায়। মাঝে নির্বাচনকালে অসন্তোষ কিছুটা স্তিমিত থাকলেও ৬ জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ-কর্মবিরতির ঘটনা বাড়তে থাকে।

জানা যায়, নভেম্বরে ঘোষিত মজুরি কাঠামোয় মোট সাতটি গ্রেডের মধ্যে চারটিতে (৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর) কর্মীদের মূল মজুরি বেড়েছে। তবে ৩ নং গ্রেডে মূল মজুরি না বেড়ে ৪০ টাকা কমেছে। একইভাবে ২ নং গ্রেডে ৪১২ ও ১ নং গ্রেডে ৪০৫ টাকা কমেছে। তবে নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ মূলত ৩, ৪ ও ৫ নং গ্রেডের শ্রমিকদের। ৩ নম্বর গ্রেডের শ্রমিকদের অসন্তোষ মূল মজুরি কমে যাওয়ায়। আর ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডের শ্রমিকরা অসন্তোষ প্রকাশ করছেন মূল মজুরি তুলনামূলক কম বৃদ্ধি পাওয়ায়।

শ্রম অসন্তোষের মাত্রা বাড়তে থাকলে ৮ জানুয়ারি পোশাক খাতের ত্রিপক্ষীয় ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট-বিষয়ক কোর কমিটির বিশেষ জরুরি সভায় নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনায় ত্রিপক্ষীয় একটি কমিটি গঠন করা হয়। ১০ জানুয়ারি এ কমিটির প্রথম সভায় ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডের মজুরিবৈষম্য নিয়ে শ্রমিক প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণের বিষয়টি আমলে নেয়া হয়। আরো গভীর পর্যালোচনার জন্য গতকাল কমিটির সভার তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

এর মধ্যে শনিবার অনানুষ্ঠানিক এক বৈঠকে কমিটি ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডে মূল মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছে। ওইদিন রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাণিজ্যমন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীসহ পোশাক শিল্পের মালিক প্রতিনিধিরা। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডের সঙ্গে ১ ও ২ নং গ্রেডের মজুরি সমন্বয়ের নির্দেশ দেন।

এরপর গতকাল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের সভাপতিত্বে পূর্বঘোষিত সভা শেষে সংশোধিত মজুরি ঘোষণা করা হয়। সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আফরোজা খান ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিজুল ইসলাম ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পোশাক খাতের মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা।

মালিক প্রতিনিধিদের মধ্যে সভায় ছিলেন সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী, বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান, এফবিসিসিআই সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, সাবেক বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ। শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ফজলুল হক মন্টু, জাতীয় শ্রমিক লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক শামছুন্নাহার ভূইয়া, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন, ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন ও শ্রমিক নেতা অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ, সিরাজুল ইসলাম রনি, বাবুল আক্তার, নাজমা আক্তার।

নতুন সংশোধনী বিশ্লেষণে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০১৩ সালের নিম্নতম মজুরি কাঠামো থেকে ২০১৮ সালের ঘোষিত মজুরি কাঠামো সমন্বয়ের ফলে মোট মজুরি প্রথম গ্রেডে বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ হাজার ২৫৭ টাকা, দ্বিতীয় গ্রেডে ৪ হাজার ৫১৬ টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ৩ হাজার ৪০ টাকা, চতুর্থ গ্রেডে ২ হাজার ৯২৭ টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ২ হাজার ৮৩৩ টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ২ হাজার ৭৪২ টাকা ও সপ্তম গ্রেডে ২ হাজার ৭০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

গতকাল সভা শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন হবে, তবে কোনো অবস্থায়ই গার্মেন্টস কারখানা ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করা যাবে না। আগামীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। মন্ত্রী মজুরি আন্দোলনে নিহত গার্মেন্টস শ্রমিকের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ টাকা প্রদানের ঘোষণা দেন।

শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, শিল্পের স্বার্থে শান্তি বজায় রেখে উৎপাদন বাড়াতে হবে। মালিক-শ্রমিক ও দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন কোনো কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ পরিহার করে শ্রমিকদের সোমবার (আজ) কাজে যোগদানের আহ্বান জানান তিনি।

গার্মেন্টস মালিকদের পক্ষে এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, গার্মেন্টস সেক্টরে বেতন-ভাতা বাড়ানো নিয়ে শ্রমিকরা আন্দোলন করতে পারেন। কিন্তু সেই আন্দোলন কখনো ধ্বংসাত্মক হতে পারে না। এবারের আন্দোলনে যারা গার্মেন্টস সেক্টরে ভাংচুর চালিয়েছেন, তাদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

শ্রমিক প্রতিনিধিদের পক্ষে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আমরা নভেম্বরে ঘোষণার সময়ও মেনে নিয়েছিলাম। এখন আবারো তার নির্দেশনা মেনে নিচ্ছি। বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত শ্রমিকদের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ শ্রমিকের যেন কোনো হয়রানি ও ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।