অ্যাকশনএইডের গবেষণা দেশে পারিবারিক সহিংসতার শিকার ৬৬% নারী

দেশে পারিবারিক সহিংসতার শিকার ৬৬ শতাংশ নারী, অর্থাৎ প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন এ সহিংতার শিকার। গণমাধ্যমে বাড়ির বাইরের সহিংসতা ও যৌন সহিংসতাকে বেশি তুলে ধরা হলেও প্রকৃতপক্ষে নারীরা ঘরেই বেশি অনিরাপদ। এছাড়া শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনার বিষয়ে অনেকেই জানে না। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইডের পৃথক দুটি গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের হলরুমে গবেষণা প্রবন্ধ দুটি উপস্থাপন করা হয়।

বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার ওপর দৃষ্টিপাত:

প্রবণতা এবং সমাধান শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেন অ্যাকশনএইডের কনসালট্যান্ট আহমেদ ইব্রাহিম। দেশের ২০টি জেলায় সংঘটিত সহিংসতার তথ্য, পুলিশের কাছে দেয়া অভিযোগ, বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম, জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের (জেএনএনপিএফ) তথ্য এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বিষয়ে মিডিয়া প্রতিবেদন থেকে নেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা করা হয়েছে।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, প্রচলিত ধারণা এবং পিতৃতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রহণযোগ্য বিশ্বাস হচ্ছে, ‘নারীরা ঘরেই বেশি নিরাপদ’। কিন্তু প্রকৃত সত্য নারীদের প্রতি বেশির ভাগ সহিংসতা বাড়িতে সংঘটিত হয়।

গবেষণায় বলা হয়, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা সম্পর্কিত মামলাগুলোর প্রতি পাঁচটির মধ্যে চারটিই আদালতে উত্থাপিত হতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তারপর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সহিংসতায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নিজেদের পক্ষে বিচার পায়, ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না বা গেলেও বাতিল হয়ে যায়। আদালতের মামলা খারিজ করে দেয়া বা আসামিকে খালাস দেয়ার সম্ভাবনা ৩২ শতাংশ। শুধু ১০ দশমিক ৭ শতাংশ মামলা থাকে পারিবারিক বিরোধ-সংক্রান্ত। যদিও বেশির ভাগ অভিযোগ পারিবারিক সহিংসতা সম্পর্কিত। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৭৫ শতাংশ প্রতিবেদনে ধর্ষণ বা গণধর্ষণ সম্পর্কিত।

একই অনুষ্ঠানে ‘কর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ২০০৯-এর বাস্তবায়ন’ শীর্ষক পৃথক আরেকটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাটি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোতে ২০০৯ সালের গাইডলাইনের প্রয়োগ একবারেই নেই বললে চলে। যেখানে আছে, সেখানে সীমিতভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে গাইডলাইন প্রয়োগের জন্য কমিটি দেখা গেলেও সেখানে শিক্ষার্থীর তুলনায় অভিযোগের সংখ্যা একেবারেই কম।

গবেষণায় বলা হয়েছে, কর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন একটি তাত্পর্যপূর্ণ রায় বা নির্দেশনা ঘোষণা করেন। তবে এ নির্দেশনা প্রণয়নের দীর্ঘ নয় বছর পরও কর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা বা কৌশল হাতে নিতে দেখা যায়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের গবেষণায় বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি-সংক্রান্ত কোনো কমিটির কথা জানে না। ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা সম্পর্কে জানে না। মাত্র ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার কথা নামমাত্র শুনেছে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের নির্দেশনার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ২০ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ কিছুই জানে না। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা নির্দেশনা সম্পর্কে জানলেও এ বিষয়ে কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই।

অ্যাকশনএইডের বাংলাদেশের ডেপুটি ডিরেক্টর ফারিয়া চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল করিম, দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ হারুন উর রশীদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিয়া হক, ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারের উপকমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক সুবর্ণচরের ধর্ষণের ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে সুবর্ণচরের ঘটনায় যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে, গণমাধ্যমে তা সঠিকভাবে আসেনি। সুবর্ণচরে ধর্ষণের ঘটনায় দোষী যে-ই হোক না কেন, তাকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে— এ কথাটি আমরা মিডিয়ার কাছে বলেছিলাম। সবার বোঝার স্বার্থে আমরা পুরো প্রতিবেদন দিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সুবর্ণচরের তদন্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমে অন্যভাবে এসেছে। মেসেজটাকে যেভাবে নেয়া হয়েছে, সেটা কিন্তু আমাদের মেসেজ ছিল না।

তিনি আরো বলেন, একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কিনা, এটাই আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় ছিল। আমরা এটাই তদন্ত করি। নির্বাচন-সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ এসেছে, আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে সেগুলো পাঠিয়ে দিতে বলেছি। আমরা তো সেখানে হাত দিতে পারব না। নির্বাচন-সংক্রান্ত ব্যাপারে কে কাকে ভোট দিয়েছে, কে কোন দলের লোক, সেটা তারা দেখবে। সেটা তো আমাদের তদন্ত রিপোর্টে আসতে পারে না এবং আমরা এ ধরনের কোনো কথাও বলিনি। আমরা বলেছিলাম, ওই নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তাকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করা হয়েছে। সুতরাং তার সঙ্গে যারাই এ রকম করেছে, সে যে-ই হোক না কেন, তাকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।