অপরাধীরা হিংস্র হয়ে উঠেছে বিচারহীনতার কারণে’

অপরাধীরা হিংস্র হয়ে উঠেছে বিচারহীনতার কারণে’

|বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট|

নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে অপরাধীরাও হয়ে উঠছে হিংস্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। এসবের অন্যতম কারণ প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা ও বিচারহীনতা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘আগুনে পুড়লো মানবতা’ শীর্ষক বৈঠকিতে এই মন্তব্য করেন আলোচকরা। মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (৯ এপ্রিল) বিকাল সাড়ে ৪টায় শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন।

বৈঠকিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার একটি নিয়ম হচ্ছে, যতোক্ষণ পর্যন্ত অপরাধ প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত অভিযুক্তকে নির্দোষ ধরা হবে। এটা তো আইনের মৌলিক বিধান। এখানে মাদ্রাসার অপরাধটি আমাদের বিশেষভাবে বিস্মিত করে এ কারণে যে, ছাত্রীও আরেকজন মাওলানার মেয়ে। তাতে দেখা যাচ্ছে, মাদ্রাসায় ছাত্রীরা পড়তে গেলে আমরা বাইরে থেকে ভাবি “নিরাপদ”। কিন্তু যেখানে নিরাপদ মনে করে রক্ষক যখন ভক্ষক হন তখন আমাদের মধ্যে একটু বেশি ও আলাদা বেদনা হয়। আমাদের এখানে ক্ষমতা যতো বেশি হয় ততো বেশি অন্যায় হয়। সেগুলোর বিচার তো করা যাবে না।’

এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের গ্রহণ করা উচিত। আমরা ঘটনাকে লোকাল এনেস্থেটিকের মতো দেখি। এখন নারী আক্রান্ত হচ্ছে বলেই কি আমরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছি? কিন্তু আক্রান্ত তো সব জায়গাতেই হচ্ছে। ৫০ বছর আগেও বিচারটা আমরা করতাম রাষ্ট্র বনাম। রাষ্ট্র হচ্ছে বাদী আর আমি হলাম সাক্ষী মাত্র। যে ক্রিমিনাল মামলাগুলো একই সঙ্গে সিভিল মামলাও বটে। আমার হাত নষ্ট হলো, চোখ চলে গেলো– এতে আমাদের এখানে ক্ষতিপূরণের বিধান নেই। থাকলেও তা হাইকোর্টের দয়ার ওপর নির্ভর করে। আমার মনে হয় বিচারের ক্ষেত্রে খুনির মৃত্যুদণ্ড হয়, কিন্তু আমার খুন তো আর পূরণ হবে না। আমার পরিবার তো আমাকে পাবে না। সেজন্য ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রকে দিতে হবে। নাগরিককে রক্ষার জন্য যে অঙ্গীকার করে রাষ্ট্র হয়েছে, যেহেতু আমরা ট্যাক্স দিই, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার অঙ্গীকার পূরণ করছে না।

‘আমি তো মনে করি আমাদের রাষ্ট্র একটি অদ্ভুত ধরনের যন্ত্র। অতএব এবার যন্ত্র দায়িত্বহীন সেটা ঢাকা শহর ঘুরলেই বোঝা যায়। ঢাকায় ফুটপাথ তৈরি করতে পারছে না কিন্তু পদ্মা সেতু তৈরি করতে পারছে। তার মানে এটা অগ্রাধিকারের প্রশ্ন! প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হয় যে, মানুষ যাতে বোঝে এজন্য আপনারা রায় বাংলায় লিখুন। এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কিছু হতে পারে না। অন্য কোনও ভদ্র দেশে বিচারক যদি বলেন, “আমি বাংলায় লিখতে পারি না,” তার তো চাকরি থাকার কথা না। তাহলে ন্যায়বিচার কোথায়? কথায় আছে, দান-খয়রাত সবার প্রথমে আত্মীয়স্বজনকে করবেন। তো আপনি যদি নিজের ঘরেই বিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন, তাহলে আপনি অন্যের কাছে করবেন কী করে। নারী-পুরুষ বাদ দিয়ে এখানে যারা গরিব তারা সব সময় নিপীড়িত হয়।’

সময়ের সঙ্গে অপরাধ ভিন্নরূপে সংঘটিত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে অপরাধের সঠিক চিত্র নেই। কয়েক বছর আগে আমরা অ্যাসিড সন্ত্রাসের কথা শুনেছি, কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছে সেটা নেই, অন্য রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ কিংবা নানাধরনের হয়রানিমূলক আচরণ রয়েছে। সত্যি বলতে কি, আমরা জানি না কীভাবে এসব দমন করা যায়। আমরা যেটা করি সেটা হলো পুলিশ দিয়ে সরাসরি অপরাধ দমন। কিন্তু অপরাধের সূত্রপাত যেখানে হয়, চিন্তার ধরনের মধ্যে, সেটার জন্য কী দরকার আমি জানি না। অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, এক্ষেত্রে শিক্ষামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হয়। তার মানে অপরাধীকে বই পড়ানো নয়। আমাদের প্রধান সমস্যা, বড় বড় অপরাধের বিচার হয়নি। সেটা কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় আমরা শুনেছি। সে ব্যাপারে যেহেতু আমাদের একটি প্রশিক্ষণ হয়েছে চুপ করে থাকার। কারণ অপরাধী হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তারা যদি আমার চেয়ে “বড়লোক” হয়, তাহলে আমাদের সাংবাদিক এমনকি পুলিশ পর্যন্ত নীরবতা পালন করে। আমাদের চুপ করে থাকার প্রশিক্ষণ হয়েছে।

আলোচনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাম্মানিক সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, ‘আমাদের যে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা আছে, জীবনাচরণের যে ধারাবাহিকতা আছে, সেই জায়গা থেকে নারীর প্রতি সহিংসতা আমরা দূর করতে পারিনি। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রীর ব্যাপারে দেখেছি, সহিংসতার ব্যাপ্তি ঘটছে। হয়রানির সঙ্গে হিংস্রতাও আসছে, সেটা আমার কাছে বিশেষভাবে লক্ষণীয় মনে হচ্ছে।’

সময়ের সঙ্গে সহিংসতার ধরন বদলাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা একটি সিস্টেমিক ভায়োলেন্স। এটি আমাদের সমাজ কাঠামোর মধ্যে জড়িত। আমরা দেখেছি একেক সময় একেক রকমভাবে নারীর প্রতি সহিংসতামূলক আচরণ করা হয়েছে। একসময় আমরা দেখেছি, অ্যাসিড নিক্ষেপ ছিল প্রধান সহিংসতা।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘যৌন হয়রানি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, গায়ে হাত না লাগিয়েও হতে পারে। আমাদের হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে, সেটা জানলে আমরা ব্যাপ্তি বুঝতে পারি। ফেনীর এই ঘটনার মতো আরেকটি নরসিংদীর ঘটনা দেখছি। হয়রানির ঘটনাগুলো প্রকট রূপ ধারণ করছে। সেটা আমার কাছে ভয়াবহ লাগছে।’

বেসরকারি সংস্থা আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট উই ক্যানের প্রধান সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেছেন, ‘যখন কেউ সন্ত্রাস করে তখন তার পরিচয় সন্ত্রাসী। সন্ত্রাস বা ক্ষমতাচর্চার জন্য একটা “টুলস” লাগে। কোনও একটা কিছু ব্যবহার করেই তো সে ক্ষমতা চর্চা করে, সে সন্ত্রাস করে, নিপীড়ন করে। তখন সে ব্যবহার করে ক্ষমতাকাঠামোতে তার পজিশন। সে ব্যবহার করে ধর্ম থেকে পাওয়া তার গ্রহণযোগ্যতা, সমাজ থেকে পাওয়া তার কদর। এগুলো ব্যবহার করেই সে সন্ত্রাসটা করে। সেই সন্ত্রাসটা আরও জায়েজ করা হয় যখন বিচার হয় না।’

বিচার না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কোথাও বিচার পাই না তখন আমরা বলি– “ঠিক আছে! আমরা বিচার পাবো বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে।” কিন্তু সেখানে গিয়েও আমরা বিচার পাই না। বিচার ব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথা হয়। এটি তো একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপার নয়। এটি সামগ্রিক ব্যাপার। যেখানে কাজ করবেন পুলিশ থেকে শুরু করে উকিল, বিচারক।’

সম-সাময়িক বিষয়ের উপর আয়োজিত বাংলা ট্রিবিউন-এর গোলটেবিল বৈঠক

এ প্রসঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. সৈয়দ শাহ এমরান বলেন, ‘আমাদের নির্ধারণ করা দরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধ কেমন হবে? মূল্যবোধটা শুধু শিক্ষার্থীরা শিখবে নাকি শিক্ষকদেরও শেখার প্রয়োজন আছে।’

এ সময় ফেনীতে মাদ্রাসাছাত্রীর ওপর সংঘটিত সহিংসতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেখানে মানবতা ভূলুণ্ঠিত,সেখানে ডিফেন্ড করার প্রশ্নই আসে না। যেখানে কোনও বিবেক, কোনও ধর্ম কিংবা কোনও ধরনের ব্যাখ্যা, কোনও আইন যদি কাজ করে তাহলে ভিকটিমের পক্ষেই কাজ করবে। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রীর সঙ্গে যা হয়েছে, সেটি ভয়াবহ সহিংসতা। এখানে মানবতা মেয়েটির পক্ষেই থাকবে, তার পক্ষেই তো আমরা লড়বো। সুতরাং এখানে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজুল্লাহ কে, তিনি কোথায় পড়েছেন, কোথায় শিক্ষকতা করেছেন, কোথায় কাজ করেছেন সেসব বিষয় মুখ্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, যে সন্ত্রাসী তার কোনও ধর্ম নেই। তার কোনও ভালো কর্মক্ষেত্র হতে পারে না। আমরা জানি, জাহেলিয়া যুগের কথা। তখন কি শিক্ষিত লোক ছিল না? অনেক ছিল। তারপরও অন্ধকার যুগ কেন? তখনও মেয়েশিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো।’

পুলিশ সদর দফতরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ সর্বনিম্ন সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্তদের আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ মামলা রুজু হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করা শুরু করেছে।’

সম্প্রতি ফেনীতে মাদ্রাসাছাত্রীর ওপর সহিংসতার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রীকে আগুন দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় পুলিশই কিন্তু সবার আগে তার আগুন নিভিয়েছে। মেয়েটি যখন সিঁড়ি দিয়ে চিৎকার করতে করতে নেমে আসছিল, তখন পুলিশ সদস্যরাই দৌড়ে গিয়ে হাতের কাছ থেকে একটি পাপোশ নিয়ে তার গায়ে জড়িয়ে আগুন নিভিয়েছে। পুলিশই কিন্তু তাকে সর্বনিম্ন সময়ে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে (মঙ্গলবার) নরসিংদীর ঘটনাতেও কিন্তু সর্বনিম্ন সময়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া ভিকটিমদের পাশে ঢাকায় সার্বক্ষণিকভাবে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন। তারা ভিকটিমের চিকিৎসা থেকে শুরু করে অন্য বিষয়গুলো সমন্বয় করছেন। এই বিষয়গুলো তদারকি করার জন্য আমাদের একটি টিম কাজ করছে।’

উদিসা ইসলাম

বিচারহীনতার প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘একদিকে যেমন নারীর প্রতি সহিংসতার বিচার হচ্ছে না, আবার এ কারণে আমরা অপরাধের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারও করতে পারছি না। দৃষ্টান্ত হিসেবে সর্বসাধারণের সামনে বিষয়টি তুলে ধরতে পারছি না যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে এই বিচার হচ্ছে। যার ফলে অপরাধীদের সাহস বেড়ে যাচ্ছে। এটি এই পর্যায়ে এসে দাঁড়াচ্ছে যে, নারীকে দমানোর জন্য আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। এর মধ্যে এক ধরনের হিংস্র উল্লাসও কাজ করছে। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ জায়গায় যাচ্ছে বিচারহীনতার কারণে। যতোদিন পর্যন্ত আমরা এই বিচারগুলো আমরা না করতে পারবো এবং গণমাধ্যম সেগুলো সঠিকভাবে প্রচার না করবে ততোদিন পর্যন্ত এই সমস্যাগুলো কমে আসার সম্ভাবনা খুব কম।’
মুন্নী সাহা

রাজধানীর পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখা গেছে এ আয়োজন। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সহযোগিতায় বৈঠকিটি আয়োজিত হয়।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন