উন্নয়নের জোয়ারঃ খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা

ব্যাংকিং খাত : তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে জানুয়ারি-মার্চ এ তিন মাসে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা।

প্রতি তিন মাস অন্তর দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ও খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। চলতি বছরের মার্চ শেষের খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন গতকাল চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হারও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। চলতি বছরের মার্চ শেষে বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। মার্চ পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন সময় অনিয়মের মাধ্যমে দেয়া ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ছে। এছাড়া পুনর্গঠিত ঋণের একটি অংশও খেলাপি হয়ে পড়েছে। এতে ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণ বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাংকিং খাতে যেসব দুর্নীতি হয়েছে তার একটিরও বিচার হয়নি। বরং তাদের রক্ষায় আরো নীতিসহায়তা দেয়া হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতির কারণে খেলাপি ঋণ না কমে বরং বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকই রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের। মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এ সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে মোট ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩০৩ কোটি টাকার ঋণ। এ হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।

বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণকৃত ঋণের ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৬০২ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও। চলতি বছরের মার্চ শেষে ৪০টি বেসরকারি ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার ঋণ। এ হিসাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে।

তবে খেলাপি ঋণের হার কম আছে বিদেশী ব্যাংকগুলোর। দেশে পরিচালিত নয়টি বিদেশী মালিকানার ব্যাংকে চলতি বছরের মার্চ শেষে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ২ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৬ দশমিক ২০ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পেছনে পূর্বঘোষণাকে কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, খেলাপিদের জন্য সুবিধা আসছে চলতি বছরের শুরুর দিকে, এমন ঘোষণায় অনেক নিয়মিত গ্রাহকও ঋণ পরিশোধ থেকে বিরত ছিলেন। আর অনিয়মিতরা নিশ্চিত হয়েছেন যে তারা টাকা পরিশোধ না করলে কোনো ক্ষতি নেই। সব মিলিয়ে অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে খেলাপি ঋণ।

মার্চ ও জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ব্যালান্সশিট ভালো দেখাতে ডিসেম্বর প্রান্তিকে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনে। কিন্তু মার্চ ও জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ আবার বেড়ে যায়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কাজ করছে। এজন্য নানা উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।