আদায় না করেই কম দেখানো হলো খেলাপি ঋণ

দেশের ব্যাংকগুলো ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায় করতে পারছে না। কিন্তু কাগজে-কলমে এবার খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানো হলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, তিন মাসের ব্যবধানে ২২ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমিয়ে ফেলেছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল এক লাখ ১৬ হাজর ২৮৮ কোটি টাকা। আর ডিসেম্বরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ এর চেয়ে অন্তত তিন গুণ বেশি।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপিদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। গণছাড়ের আওতায় বড় বড় ঋণ খেলাপিরা পুনঃতফসিল করেছেন। এছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে খেলাপি আইন শিথিল, অবলোপন নীতিমালায় ছাড়, স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থাসহ দেওয়া হয়েছে আরও বিশেষ সুবিধা। এর মধ্যে অর্ধলাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ১০ লাখ ১১ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড . জায়েদ বখত বলেন, ‘পুনঃতফসিলের একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে। এছাড়া ব্যাংকগুলোও এই ঋণ আদায় করার চেষ্টা করেছে।’

অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গণছাড়ের পরও এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪২০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম মনে করেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার জন্য সবাই চেষ্টা করছে। এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, ‘আগের চেয়ে এবার ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করায় খেলাপি ঋণ কমে এসেছে। খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ ছাড়ে পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সুবিধা কার্যকর বড় ভূমিকা রেখেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের শীর্ষে রয়েছে জনতা ব্যাংক। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। গত বছরের জুনের শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ২০ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে ৬ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। এই ব্যাংকের শীর্ষ ঋণ খেলাপির তালিকায় রয়েছে ‘অ্যানন ট্রেক্স’ গ্রুপ। এই প্রতিষ্ঠানটি জালিয়াতি করে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা এই ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছে।

গত ডিসেম্বরে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছিল ১০ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। গত বছরের জুন মাসের শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ১২ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা।

গত ডিসেম্বর মাসের শেষে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা। গত বছরের জুন মাসের শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৯ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকে ব্যাংকটির অধঃপতন শুরু হয়।

গত ডিসেম্বর শেষে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুনের শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৬ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা।

জানা গেছে, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে গত বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক মানের খেলাপি নীতিমালায় শিথিলতা আনা হয়। আগে তিন মাস অনাদায়ী থাকলেই তা খেলাপি হতো। এটি সংশোধন করে ছয় মাস এবং সর্বোচ্চ ১২ মাস অনাদায়ী থাকলে তবেই খেলাপি করা হয়।

অন্যদিকে খেলাপিদের গণছাড় দিতে বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালা জারি করা হয়। গত বছরের মে মাসে জারি করা এক সার্কুলারে বলা হয়, ঋণখেলাপিরা মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের মেয়াদে মাত্র ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। উল্লেখ্য, গণছাড়ের আওতায় ১৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নবায়ন করেছে ব্যাংকগুলো, যার অর্ধেকই করেছে সরকারি ব্যাংকগুলো। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েও গত বছর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫২ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর বাইরে বিপুল পরিমাণ ঋণ অবলোপন করেছে ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সরকারি ৬ ব্যাংকের বিতরণ করা এক লাখ ৮৪ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২৪ শতাংশ বা ৪৩ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে।

গত ডিসেম্বরের শেষে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণ করা ঋণের ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত তিন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৯ কোটি টাকা।