স্বপদেই থাকছেন বিদ্যানন্দ প্রতিষ্ঠাতা কিশোর

স্বপদেই থাকছেন বিদ্যানন্দ প্রতিষ্ঠাতা কিশোর

স্বপদেই থাকছেন বিদ্যানন্দ প্রতিষ্ঠাতা কিশোরতিনি কোভিড-১৯ ক্যাম্পেইন শেষ না হওয়া অবধি চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকছেন বলে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা বিভাগের সমন্বয়ক সালমান খান ইয়াসিন জানিয়েছেন।  আজ মঙ্গলবার বিকেলে তিনি বলেন, উগ্রবাদী কিছু সংগঠন আর ফেসবুক ইউজার কারও কারও নেগেটিভ কমেন্টে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন আমাদের চেয়ারম্যান। তাছাড়া কাজের এত চাপও তিনি সামলাতে পারছিলেন না। তিনি বলেছিলেন, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে থেকে কাজ করবেন। তারপর তিনি হঠাৎ চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেও আমরা তার রিজাইন লেটার অ্যাকসেপ্ট করি নাই। কভিড-১৯ ক্যাম্পেইন শেষ হলে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আপাতত তিনি চেয়ারম্যানের পদে বহাল থাকছেন।

সালমান আরো বলেন, কিশোর কুমার দাস প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে গেলে যোগ্য কাউকে না পেলে পদটি শূন্য থাকবে। সূত্রঃ কালের কন্ঠ

বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশের স্ট্যাটাস

“আনন্দের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন”

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাস প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ করে ছাড়লেন কেন? কিশোর কুমারের উত্তর, ‘আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করেন এই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কি- আমি বলবো বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। কিন্তু কখনো কখনো মানুষের স্বার্থে, ভালোবাসার স্বার্থে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। আমিও তাই চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে যাচ্ছি। তবে আমি বিদ্যানন্দে আছি। থাকবো।’

গতকাল মঙ্গলবার দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন কিশোর কুমার দাস। বিদ্যানন্দের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে গতকাল তার সরে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপরেই কিশোর কুমার দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত একটি ছোট্ট দেশ পেরুতে বাস করছেন। সেখান থেকেই মুঠোফোনে গতকাল দুপরে এই সাক্ষাতকার দেন। সেই আলাপে উঠে আসে এই সংগঠনের শুরু থেকে নানা উদ্যোগের কথা। পাশাপাশি চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার কারণও বলেন।

কিশোর কুমার দাস

চট্টগ্রামের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে স্নাতক শেষ করা কিশোর বড় হয়েছেন চট্টগ্রামে। তিনি একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চ পদে চাকুরী করতেন। যেটি থার্ড পার্টি হিসেবে গুগলের কাজ করতো। তবে ওই চাকুরী ছেড়ে বর্তমানে তিনি উদ্যোক্তা। বিদেশে থেকেই সংগঠনটির কাজে যুক্ত আছেন।

কিশোরের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা সহায়তা দিতে ২০১৩ সালে গড়ে তুলেছিলেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। এখন সারাদেশে বিদ্যানন্দের ১২টি শাখার মাধ্যমে প্রতিদিন দুই হাজারেরও বেশি পথশিশু মৌলিক শিক্ষা ও খাবার পায়। এছাড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে পোশাক, শিক্ষা উপকরণ, মাসিক বৃত্তি প্রদান করে থাকে এবং সামাজিক বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে। বিদ্যানন্দের এক টাকায় আহার, এক টাকায় চিকিৎসা, এক টাকায় আইন সেবা কার্যক্রমগুলো নিম্ন আয়ের মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। গরীব ও অসহায় কিন্তু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা আছে। আছে বাংলাদেশের রামু ও রাজবাড়ীতে নিজস্ব জমিতে দুইটি আলাদা এতিমখানা। বিদ্যানন্দ অনাথালয়ে এতিমদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন শাখায় বিনামূল্যে গ্রন্থাগার সুবিধা রয়েছে। এসব গ্রন্থাগারে আট হাজারের অধিক বইয়ের সংগ্রহ আছে। এই গ্রন্থাগার গুলো সকাল-সন্ধ্যা খোলা থাকে এবং যে কেউ সেখানে গিয়ে বিনামূল্যে বই পড়তে পারেন। ৭১ টাকায় নারীদের জন্য আবাসিক হোটেলও করেছে বিদ্যানন্দ। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর ঢাকার অলিগলিতে ছেয়ে যাওয়া পোস্টারগুলোকে সংগ্রহ করে শিক্ষা উপাদান বানানোর অভিনব কৌশল নেয় বিদ্যানন্দ।

এতো কাজ করেও হঠাৎ করে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন কেন? কিশোর কুমার বললেন, ‘আমি কখনোই সংগঠনে নিজের পদটা আঁকড়ে ধরে রাখেতে চাইনি। আমি চেয়েছি সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব আসুক। আমি বলেছিলাম বয়স ৪০ হয়ে গেলে আমি আর সংগঠনের চেয়ারম্যান থাকবো না। যদিও আমার এখনো ৪০ বছর বয়স হয়নি কিন্তু তরুণ নেতৃত্ব আসুক সেটাই চাইছি। তারা নতুন মেধা দিয়ে সংগঠন এগিয়ে নিক।’

শুধুই তরুণ নেতৃত্ব নাকি আর কোনো কারণ আছে? কিশোর কুমার বললেন, ‘কোনো সিদ্ধান্ত মানুষ একটি কারণে নেয় না। অনেকগুলো কারণ থাকে। আমারও আরও বেশ কিছু কারণ আছে।’

অভিযোগ উঠেছে, কিশোর কুমারের ধর্মীয় পরিচয় তুলে প্রায়শই বিদ্যানন্দের ফেসবুক পেজে তাকে গালিগালাজ করা হতো। বিদ্যানন্দের ফেসবুক পেজের ঘোষণায় বলা হয়, প্রবাসী উদ্যোক্তা সশরীরে খুব অল্পই সময় দিতে পারেন। ৯০ ভাগ মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকরাই চালিয়ে যান বিশাল কর্মযজ্ঞ। তবুও উদ্যোক্তার ধর্ম পরিচয়ে অনেকেই অপপ্রচার চালায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে। আমরা বিষয়টি প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম চলমান ক্যাম্পেইনের পরে। কিন্তু কিছুদিন ধরে চলা মাত্রাতিরিক্ত সাম্প্রদায়িক অপপ্রচারে জল ঢালতে খবরটি আজকে শেয়ার করলাম। সে সমস্যাও আশা করি সমাধান হয়ে যাবে।’

এই বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে কিশোর কুমার বলেন, ‘আমি সারাজীবন মানুষ পরিচয়ে বড় হয়ে উঠতে চেয়েছি। বিদ্যানন্দ নামটি দিয়েছেন এক মুসলিম ব্র্যান্ড এক্সপার্ট। “আনন্দের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন” স্লোগানে তিনি এই নাম দিয়েছিলেন। কিন্তু অনেকেই ভাবে কারো নাম থেকে বিদ্যানন্দ নামটি এসেছে। এজন্য আমরা নাম পরিবর্তন করতে চাইলেও স্বেচ্ছাসেবকরা রাজি হননি। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে নানাভাবে আমাকে হিন্দু পরিচয় দিয়ে গালিগালাজ করা হয়েছে। এর কোনো শেষ নেই। করোনা সংকট মোকাবিলায় আমরা যখন মার্চে কাজ শুরু করলাম, তখন এর মাত্রা আরও বাড়লো। কোনো কারণ ছাড়া কিছু মানুষ পেজে ধর্ম তুলে গালি দিচ্ছে, এটা আমাকে আহত করতো। এর ফলে মূল কাজটাও বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছিল। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, কিছু মানুষ দান করার সময়ও হিন্দু পরিচয়টাকে প্রতিবন্ধকতা মনে করতো। এসব দেখে মনে হলো, আচ্ছা তাহলে আমি চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে যাই। মানুষের গালিগালাজ বন্ধ হোক। সংগঠনটা এগিয়ে যাক। তবে একটা কথা বলতে চাই। সব ধর্মের মানুষের সহযোগিতায় এতদূর আসা। কিছু মন্দ মানুষ অপপ্রচার করে, সেটা খুবই নগণ্য।’

বাবার সরকারি চাকরিসূত্রে কিশোর বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামের কালুরঘাটে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে কিশোর তৃতীয়। নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম বলে অবহেলা, বঞ্চনা আর দারিদ্র্যের সংগ্রামে নিজেদের টিকিয়ে রাখাটাই তাদের কাছে দুঃসাধ্য ছিল। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের শুরুর গল্প বলতে গিয়ে কিশোর বলেন, ‘২০১৩ সালে ছোট পরিসরে গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। আমাদের বিদ্যানন্দের প্রথম কর্মসূচি ছিল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা প্রদান করা। নারায়ণগঞ্জের এক রেলস্টেশনকে বেছে নেওয়া হয়। প্রথম দিকে বিদ্যানন্দের সব আর্থিক জোগান পেরু থেকে আমিই দিতাম। আর সব কার্যক্রম স্বেচ্ছাসেবকরা পরিচালনা করত। পরে সবার আর্থিক সহায়তায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কক্সবাজারসহ আরও ১২টি এলাকায় যাই।’

২০১৬ সালে সুবিধাবঞ্চিত শিশু, প্রতিবন্ধী ও ষাটোর্ধ কর্মহীন মানুষদের জন্য ‘এক টাকায় আহার’ নামে প্রকল্প চালু করে বিদ্যানন্দ। কিশোর জানালেন, এর আওতায় গত চার বছরে ৪২ লাখ মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করেছেন তিনি। এক টাকায় খাবার বিক্রি করার কারণ হিসেবে বললেন, ‘যারা এই খাবার গ্রহণ করছেন তারা যেন খাবারটিকে দান ভেবে নিজেদের ছোট মনে না করেন, সেজন্যই এক টাকা।’

একই ভাবে ‘এক টাকায় চিকিৎসা’ নামে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকদের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করছে এ সংগঠন।

কোভিড-১৯ যখন সারাদেশে আতঙ্ক নিয়ে এলো তখন যেন সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে আশার আলো হয়ে উঠে বিদ্যানন্দ। গনপ‌রিবহ‌ন জীবাণুমুক্ত করল, সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের জন্য আহার, চল‌তি প‌থে প‌থি‌কের ক্ষুধা নিবারণ, শহ‌রের রাস্তায় জীবাণুনাশক ছিটা‌নো কিংবা রাস্তার অসহায় প্রাণীকে খাও‌য়ানো থেকে শুরু করে নানা কাজে যুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটির স্বেচ্ছাসেবকরা।

করোনা সংকট মোকাবিলায় এত বিপুল কাজে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি মাথায় কীভাবে এলো? কিশোর কুমার বলেন, ‘দেশের বাইরে থাকায় করোনায় কি হতে পারে সেটা বুঝতে পারছিলাম। তাই মার্চেই প্রস্তুতি নেই। শুরুতে বিদ্যানন্দের বাসন্তী গার্মেন্টসে বানানো মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করা হয়। মার্চের মাঝামাঝি থেকে জীবাণুনাশক ছিটানো শুরু করি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় নয় হাজার লিটার জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দিচ্ছি। এটি বাংলাদেশে জীবাণুনাশক ছিটানোর সবচেয়ে বড় কার্যক্রমগুলোর একটি। এরপর দেখলাম দরিদ্র মানুষের খাবার কষ্ট। আমরা এক লাখ ৮৬ হাজার পরিবারকে এখন পর্যন্ত সাত থেকে দশ দিনের খাবার দিয়েছি। এছাড়া প্রতিদিন বিভিন্নস্থানে ২০ হাজার মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে। আরও অনেক কাজ আছে। আমরা চেষ্টা করেছি যেকোনো ভাবে মানুষের পাশে থাকতে। আমরা মনে করেছি করোনা সংকট মোকাবিলা করা শুধু সরকারের একার কাজ নয়। বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিকে মিলেই কাজটি করতে হবে।’

স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মীরা কি আপনার এই পদত্যাগ মেনে নেবে? কিশোর বলেন, ‘আমি জানি না স্বেচ্ছাসেবকরা কেনো আমাকে এতো ভালোবাসে। বিদ্যানন্দকে আজ এই জায়গায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব পুরোটাই তাদের। আমাদের সকল স্বেচ্ছাসেবকরাই কোনো না কোনো পেশায় নিয়োজিত; কেউ চাকরিজীবী কিংবা কেউ শিক্ষার্থী। সকলেই নিজ নিজ জায়গা থেকে পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন। আমাদের কাজে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়েছে। যেটা দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ সম্মিলিতভাবে বহন করছেন। মানুষ আমাদের প্রতি বিশ্বাস রেখেছেন। আর বারবার বলতে চাই, আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরাই আমাদের শক্তি। তবে আমি কিন্তু মার্চ মাসেই তাদের বলেছি, আমি চেয়ারম্যান থাকবো না। তবে আমি তো আছি। সবার সঙ্গেই আছি।’

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের আয়-ব্যয়ের হিসাব কীভাবে রাখা হয় জানতে চাইলে কিশোর কুমার দাস বলেন, ‘আয়-ব্যয়ের সব টাকার স্বচ্ছ হিসাব রাখা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খ্যাতি আছে এমন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়েও আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা হয়।’

সবাই অনুরোধ করলে চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার সিদ্ধান্তটা পুনর্বিবেচনা করবেন কি না জানতে চাইলে কিশোর কুমার বলেন, ‘পদ আঁকড়ে থাকার মানসিকতার এই সমাজে উল্টো পথে হাঁটতে পারার জন্য গর্ব হচ্ছে। আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা পরিচয়ে কখনোই গড়ে তুলতে চাইনি। অনেকেই আমার গল্প নানাভাবে তুলে ধরে। বিষয়গুলো আমি এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করি। আর পদে কি যায় আসে? আগে চেয়ারম্যান ছিলাম। এখন নিচের দিকের পদে থাকবো। সাংগঠনিক সম্পাদক। কারণ আমি আসলে গোছানোর কাজটা করতে পারি। কাজেই সবাইকে নিয়ে সেই কাজটা করবো। আর পদে কিছু যায় আসে না। চেয়ারম্যান না থাকলেও কিছু যায় আসে না। সমালোচকরা বলবে, বড় বড় কথা বলছে। কিন্তু আমি আসলেই মন থেকে বিশ্বাস করে কথাগুলো বলছি। বিদ্যানন্দ কারো একার নয়, এটা আমাদের সবার। এটা ধর্ম-বর্ণ সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের। এই সংগঠনের জন্য আমি যে কোনো ত্যাগ করতে রাজি আছি। আবারও বলছি আমি বিদ্যানন্দ ছাড়ছি না, পরিচালনা পর্ষদেই থাকছি। শুধু দায়িত্ব পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছি।’ সূত্রঃ দি ডেইলি ষ্টার

কিশোর কুমার দাশ চুয়েট থেকে ২০০১ ব্যাচে পাস করা কম্পিউটার প্রকৌশলী। তিনি বাংলাদেশে প্রথম গরিব ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং এর ব্যবস্থা করেন।  তিনিই প্রথম এক টাকায় আহার প্রজেক্টের মাধ্যমে পথশিশু ও বন্যা, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর মাঝে খাবার বিতরণের ব্যবস্থা করেন। লাখ লাখ মানুষ এই কর্মসূচি থেকে উপকৃত হয়েছে।

এক টাকা চিকিৎসা প্রজেক্টের আওতা এই পর্যন্ত ২৫,০০০ এর বেশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষ প্রেস্ক্রিপশনের পাশাপাশি তিন দিনের ওষুধ পেয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয় শিশু এবং বৃদ্ধদের।

এক গ্লাস দুধ প্রজেক্টের আওতায় বস্তির গর্ভবতী ও নবজাতকের মায়েদের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হয়। এছাড়া স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনাথালয় গুলোর যাত্রা শুরু। প্রায় তিন শতাধিক এতিম এবং হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য ইতিমধ্যে চারটি অনাথালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আরো দুটো অনাথালয়ের কাজ চলছে।

আনন্দের সাথে শিক্ষালাভের মন্ত্র নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বর্তমানে স্কুল আছে ৬ টি। বাসন্তী নামে একটি গার্মেন্টসে তৈরি হচ্ছে শীতের পোষাক। এছাড়া এক বছরে অনাথালয়ের ছেলেমেয়েদের জন্য বিভিন্ন উৎসবে বানানো হয়েছে নতুন কাপড়। পাঁচ টাকায় স্যানিটারি প্যাড চালু করা হয়েছে বস্তির দরিদ্র এবং ছিন্নমূল শিশু কিশোরীদের জন্য।

করোনা পরিস্থিতিতে রাজধানীর ২৬ হাজার মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে পুষ্টিকর খাবার। এই খাবার স্বেচ্ছাসেবিদের পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যা মানুষের কাছে পৌছে দেন। সবকিছু সম্ভব হয়েছে উদ্যোক্ত কিশোর কুমার দাসের উদ্ভাবনী চিন্তার ফলেই। সততা ও স্বচ্ছতা রেখে এ সব কাজ করার কারণেই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে ‘বিদ্যানন্দ’কে।

২০১৩ সালের আগস্টে বিদ্যানন্দ নিয়ে বোন শিপ্রা দাশের সঙ্গে কথা হয়। এরপর নভেম্বর–ডিসেম্বরের দিকে বোন শিপ্রা দাশ এই ভাবনায় গতি আনেন। আর ২০১৩ সালের ২২ নভেম্বর বিদ্যানন্দের নারায়ণগঞ্জ শাখার যাত্রা শুরু হয়। এরপর বিদ্যানন্দের চট্টগ্রাম শাখা কাজ শুরু করে ২০১৪ সালের মার্চ। সবশেষে ২০১৪ সালের জুলাইতে বিদ্যানন্দের মিরপুর শাখা খোলা হয়। বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার আর নারায়ণগঞ্জ শাখার পরিচালক শিপ্রা দুই ভাইবোন ব্যক্তিগত সঞ্চয় ঢেলে দেন এই স্কুলের জন্য।

https://www.bidyanondo.org/

একনজরে বিদ্যানন্দঃ

পিছিয়ে পড়াদের আনন্দ ‘বিদ্যানন্দ’

হতদরিদ্র মানুষের কল্যাণে ‘বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন’ চালিয়ে যাচ্ছে নানামুখী কর্মসূচি। বাজারভিত্তিক অর্থনীতির রূঢ় থাবায় মানবিক বন্ধন যখন শুকিয়ে যায়, এই অন্তর্গত চেতনা তখন মানুষকে ভালোবাসায় আপ্লুত করে। এরই মধ্যে এই কর্মসূচি দেশের সীমানা পেরিয়ে পেরোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই মানবপ্রেমের সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন হোসাইন মোহাম্মদ জাকি, কালের কন্ঠ

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭
পিছিয়ে পড়াদের আনন্দ ‘বিদ্যানন্দ’

দারিদ্র্যজয়ী কিশোর দরিদ্রদের পাশে

‘বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন’-এর স্বপ্নদ্রষ্টা কিশোর কুমার দাস একটা সময় নিজেই ছিলেন মন্দিরের সামনে ক্ষুধার্তের লাইনে। চুয়েট থেকে পাস করে প্রথমে বিডিকম ও পরে এয়ারটেলে। এর পর ২০১১ সালে পেরুতে। প্রথমে ওএলও এবং পরে গুগলে। সর্বশেষ পেরুস্থ জিগজাগ হোস্টেলের উদ্যোক্তা। বেঁচে থাকার আত্মিক আনন্দের উৎস হিসেবে ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর ২২ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে শুরু করেন বিদ্যানন্দ। সেখানে শিশুদের পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হলেও জানা গেল, ক্ষুধার কারণে তারা ঠিকমতো পড়তে আসে না। ফলে ১৫ মে ২০১৬ থেকে শুরু হয় ‘এক টাকায় আহার’ কর্মসূচি। এর পর শুধু এগিয়ে যাওয়া। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, কক্সবাজার, রাজবাড়ী, রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহে বিদ্যানন্দের নানামুখী কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যানন্দের আদলে সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতেও গড়ে তুলেছেন ‘এটুজেড’ নামের প্রতিষ্ঠান।

খাবার হাতে পথশিশুদের উল্লাস

এক টাকায় আহার কর্মসূচিগ্রহীতাদের ভেতর ‘ভিক্ষা’ ও বণ্টনকারীদের মধ্যে ‘দান’ শব্দটি মুছে ফেলার চিন্তা থেকেই ‘এক টাকায় আহার’ কর্মসূচি। এই কর্মসূচির আওতায় খাবার পেয়ে থাকে ১২ বছরের নিচের সুবিধাবঞ্চিত শিশু আর ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের হতদরিদ্র বৃদ্ধ। রুটিনমাফিক ঢাকাসহ আটটি জেলায় খাবার বিতরণ করা হয়। খাবারের মেন্যুতে অধিকাংশ সময় ডিম-ভাত বা সবজি-ভাত থাকলেও মাঝেমধ্যে মাংস-পোলাওয়ের মতো ভালো খাবারও জোটে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভাগ্যে। গত রমজানে এক লাখ ৩০ হাজার দুঃস্থজনের মধ্যে সাহরি ও ইফতারের আয়োজন করেছিল বিদ্যানন্দ। শুরুর পর কখনোই বন্ধ হয়নি এই কর্মসূচি।

অনন্য শিক্ষা কার্যক্রম

‘পড়ব, খেলব, শিখব’ এই স্লোগানে সুবিধাবঞ্চিতদের পড়ানো হয় এখানে। শুধু সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য নয়, সর্বস্তরের পাঠকের জন্য রয়েছে পাঠাগার, যা বিনা মূল্যে ব্যবহার করা যায় সদস্য না হয়েও। বিনা মূল্যে পড়ানোর পাশাপাশি দেওয়া হয় শিক্ষা উপকরণ। মাসে একদিন বড় পর্দায় বিভিন্ন শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র দেখানো হয়। গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিনা মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং। এরই মধ্যে এখানকার অনেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন।

চিকিৎসা কার্যক্রম

চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে বিদ্যানন্দ ‘এক টাকায় চিকিৎসা’ কার্যক্রম চালু করেছে। এর আওতায় বেদেপল্লী, হরিজনপল্লী, বিহারিপল্লীসহ বেশ কিছু সুবিধাবঞ্চিত এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিনা মূল্যে কিছু ওষুধও দেওয়া হয়।

এতিম শিশুর রাজ্য সম্প্রীতি অনাথালয়

কক্সবাজার জেলার রামুতে আদিবাসী অনাথদের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল সম্প্রীতি অনাথালয়। এক স্বেচ্ছাসেবক পরিবারের দান করা ১৫০ শতক জমির ওপর এটি গড়ে উঠেছে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নয়, তাদের গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। নিজের রুটি নিজেকেই বানাতে হয়, নিজেদের সবজি চাষ করতে হয়, এমনকি চুলও কাটতে হয় একে অপরের। এভাবেই এখানকার শিশুদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা হচ্ছে। অনাথালয় না বলে একে আবাসন বললেই বোধ করি অধিকতর যৌক্তিক হবে।

শুকনো খাবার হাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অনাথ শিশু

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে

সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন আট হাজার মানুষকে শুকনো খাবার ও তিন হাজার মানুষের মধ্যে রান্না করা খিচুড়ি বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া পাঁচ শতাধিক শিশুকে দেওয়া হচ্ছে তরল দুধ এবং শতাধিক মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসা। স্বেচ্ছাসেবকদের কেউ এসেছেন কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে, আবার কেউ পড়াশোনার অবসরে। কেউ রাত জেগে সবজি কাটেন, কেউ রাঁধেন, আবার কেউ সহকারী।

কিশোরের মুখোমুখি

‘এক টাকায় আহার’ মূলত একটি অনুপ্রেরণার নাম। অনুপ্রাণিত হয়ে কিশোর এ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। আবার কিশোরের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো বড় পরিসরে হয়তো শুরু করবেন অন্য কোনো মহত্প্রাণ। কিশোরের ভাষায়, ‘বিদ্যানন্দ’ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি লাইফস্টাইল। সমাজের ভেতর বসবাসকারী সন্ন্যাসীদের জীবনকেই বলে ‘বিদ্যানন্দ’। একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন কিশোর। যেখানে সুবিধাবঞ্চিতদের মধ্য থেকে তুলনামূলক মেধাবীদের জন্য কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

অনুদানের উৎস ও স্বেচ্ছাসেবকদের কথা

কিশোরের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে কর্মসূচিটি শুরু হলেও বর্তমানে অনুদান আসে বিদ্যানন্দের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে। কেউ নিজের জন্মদিন উদ্‌যাপন বাজেটের টাকা দেন। কেউ হয়তো ঈদ বোনাসের টাকা। কেউ টিউশনির জমানো টাকা নিয়ে অভুক্ত শিশুদের পাশে এসে দাঁড়ান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পোলট্রি ফার্মের মালিক ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিদ্যানন্দের আহার কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় ডিমের সংস্থান করছেন। শুধু ব্যক্তিগত অর্থায়নেই নয়, স্বনামধন্য বহু প্রতিষ্ঠান অনুদান দিয়েছে, দিচ্ছে। পরিচালনায় সহযোগিতা করছেন শিপ্রা দাস, নাফিজ চৌধুরী ও ফারুক আহমেদ। এ ছাড়া রয়েছে ৭৫ জনের মতো স্বেচ্ছাসেবক। বাজার করা থেকে শুরু করে রান্না, বিতরণ, তদারকি সবই ধৈর্য সহকারে তাঁরা দেখভাল করেন।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মৌলনীতি অনুসরণ

শুধু হৃদয়াবেগ দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে বিদ্যানন্দের কর্মকাণ্ডগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মৌলনীতি অনুসরণ করতে শুরু করেছে। বহুজাতিক কম্পানিতে কর্মরত প্রধান আর্থিক কর্মকর্তার পরামর্শে পরিচালিত হচ্ছে হিসাবায়নের কাজ, যা সুখ্যাত অডিট ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষিত হচ্ছে। আইনি সহায়তায় এগিয়ে এসেছে স্বনামধন্য ল ফার্ম। স্বেচ্ছাসেবকদের তত্ত্বাবধানে খাবার প্রস্তুত করা হয় এবং তাঁদের নিজেদের খাবার উপযোগী করেই মান নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।

বিদ্যানন্দের কর্মকাণ্ড

বিদ্যানন্দের লড়াইয়ের গল্প অফুরান। রয়েছে বৃত্তি প্রদান, কখনো বা গোবিন্দগঞ্জের অসহায় সাঁওতালদের পাশে, রাঙামাটিতে পাহাড়ধস বিপর্যয়ে, ফ্রেমে বাঁধা শৈশব কর্মসূচিতে, হাওরাঞ্চলে ঈদ উৎসব আয়োজনে, আবার কখনো বা ছিন্নমূল শিশুদের জন্মদিন পালনে। নিয়মিত ভিত্তিতে রয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এক টাকায় আইনি সহায়তা, এক টাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম। এ ছাড়া রয়েছে বিদ্যানন্দ প্রকাশনীর কার্যক্রম, বিনা মূল্যে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য অভিবাসন সহায়িকা বিতরণ ও পথশিশুদের গোসল করানো। যেখানেই মনে হয় ভালোবাসা দেওয়া দরকার, সেখানেই বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবীরা ছুটে যান আহার, শিক্ষা ও আনন্দ নিয়ে। এই ভালোবাসা শতধারায় প্রবাহিত হোক সেটাই কিশোরের ইচ্ছা।