করোনাকালে তথ্য আড়ালের এই প্রাণান্ত চেষ্টা কেন?

মতামত

করোনাকালে তথ্য আড়ালের এই প্রাণান্ত চেষ্টা কেন?

কামাল আহমেদ | প্রথম আলো
০৯ মে ২০২০
মহামারির সঙ্গে স্বাভাবিক সময়ের তুলনা চলে না। বিশেষ করে, যে মহামারিতে শত্রু অদৃশ্য, রোগটা অতিছোঁয়াচে এবং ‍মৃত্যুঝুঁকি হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। আমাদের আইনে মহামারির সময়ে সংক্রমণের ঝুঁকির তথ্য গোপন নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে আইনে সরকারি কর্মচারী ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে কোনো পার্থক্যও করা হয়নি। অথচ এখন সেই তথ্য আড়ালের প্রাণান্তকর চেষ্টারই প্রতিফলন ঘটছে।

ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্যসংবলিত কোনো পোস্ট দেওয়া ও সে ধরনের পোস্টে লাইক বা শেয়ার করা থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরত থাকার এক নোটিশ জারি করা হয়েছে ৭ মে। কেউ তা না মানলে আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই নোটিশ জারি করা হলো এমন দিনে, যে দিনে ফেসবুকে সরকার অথবা কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা তাদের কাজের সমালোচনা এবং ভিন্নমত প্রকাশের দায়ে এক দিনে ঢাকায় ১১ জন এবং অন্যান্য জায়গায় আরও অন্তত ৪ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তার আইনে মামলার বিষয়টি শহরে সবার মধ্যে আলোচিত হচ্ছিল। এসব আলোচনা বেশির ভাগই সামাজিক মাধ্যমে, কিছুটা টেলিফোনে আর কিছুটা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। মামলা দেওয়ার আগে কোনো ধরনের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া লেখক, কার্টুনিস্ট, ব্যবসায়ীসহ কয়েকজনকে সাদা পোশাকের লোকজন বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ায় অনেকের মধ্যে গুমের আতঙ্কও দেখা দেয়। যদিও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ রয়েছে।

টেলিভিশনের কথিত ব্রেকিং নিউজের স্ক্রলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংবাদভিত্তিক অনলাইন পোর্টালগুলোতেও এই হুঁশিয়ারির কথা প্রচার হতে থাকে। কিন্তু হুঁশিয়ারিটি যে শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য, সেটা অনেকেরই নজর এড়িয়ে যায়। হয়তো উদ্দেশ্যটাই এমন ছিল। লকডাউনে থাকা সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত যখন করোনার চিকিৎসার অব্যবস্থা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বেহাল এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ে অস্থিরতায় ভুগছেন, তখন ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা-নিন্দা-প্রতিবাদ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। সুতরাং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের হুঁশিয়ারি মোক্ষম বলে বিবেচিত হয়ে থাকতে পারে। তা না হলে, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এ রকম নির্দেশনা জারি করতে হবে কেন?

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিবিধিতে অনেক ধরনের বিধিনিষেধ আছে। তাঁরা সাধারণত সরকারবিরোধী মতামত এড়িয়ে চলেন। তা ছাড়া ফেসবুক ব্যবহারের বিষয়ে ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিল। পরে তা আবার হালনাগাদও করা হয়েছে। তবে যথারীতি সরকারের বাইরেও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে তাঁদের অনেকে নানা সময়ে মন্তব্য করলেও কখনো কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে শুনিনি। সরকারবিরোধী কোনো মতামত তাঁরা কখনো করেছেন, এমনটি চোখে পড়েনি। বিরল এ রকম কিছু হলে, তা এত ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ার কথা যে সে ধরনের কিছু গণমাধ্যমের চোখের আড়ালে থাকত না।

তাহলে হঠাৎ কেন সরকার আবারও এই হুঁশিয়ারির কথা স্মরণ করানো জরুরি মনে করল? এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে একটি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি। গণ-সমালেচনা বন্ধের জন্য জনমানসে আতঙ্ক সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এটি বেশ কার্যকর হতে পারে। অন্য আর যে সম্ভাবনাগুলো থাকে, তা হচ্ছে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের মুখ বন্ধ করা, যাঁদের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিবিধির কড়াকড়ি প্রয়োগ তেমন একটা ছিল না। বিশেষত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অনুসারী চিকিৎসকেরা রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচার-আচরণ করলেও অতীতে তা কখনোই শৃঙ্খলাবিধির ব্যত্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী পিপিই এবং এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে যে অবিশ্বাস্য কেলেঙ্কারি ঘটেছে, তার খেসারত যেহেতু চিকিৎসকদের জীবন দিয়ে দিতে হতে পারে, সে কারণে তাঁদের ক্ষোভের বিষয়টি সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। এ বিষয়ে যথাযথ সরকারি বিধি মেনে যাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন, তাঁদের পরিণতি কী ঘটেছে, তা আমরা সবাই জানি। অথচ দেশের প্রচলিত জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ সুরক্ষা প্রদান আইন ২০১১ অনুসারে তাঁদের সুরক্ষা পাওয়ার কথা। অতএব এই হুঁশিয়ারি চিকিৎসক ও চিকিৎসাসেবীদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বন্ধের চেষ্টায় হয়ে থাকতে পারে।

তা ছাড়া রোগের বিস্তৃতি বাড়তে থাকা এবং হাসপাতালগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে অন্য সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে সরকার তাঁদেরও সাবধান করতে চাইছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠতে পারে।

বলে রাখা ভালো, আগেকার নির্দেশনাগুলো থেকে নতুন পরিপত্রের একটা পার্থক্য আছে। তা হলো এবারই আলাদা করে কোনো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্যের কথা বলা হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তির আইনগত সংজ্ঞা কী বা কোন আইনে আছে, তার কোনো উল্লেখ পরিপত্রে নেই। দেশে খুব গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তি বা ভিআইপি এবং ভিভিআইপিদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কারা ভিআইপি, তা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আর প্রচলিত ভিআইপিমাত্রই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বর্পূণ ব্যক্তি হবেন, বিষয়টি এমন হওয়ার কথা নয়। অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে জনমনে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে, এমন কোনো লেখা, অডিও, ভিডিও ইত্যাদি প্রকাশ বা শেয়ার করা যাবে না বলেও এতে বলা হয়েছে। পরিপত্রের এই নির্দেশনাতেই সরকারের আসল উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হলে, তা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক হবে না।

সরকারি চাকরিবিধির বাইরে আলাদা করে এ ধরনের নির্দেশনা স্বাভাবিক সময়ে জারি করা হলেও তা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। এখন মহামারির অস্বাভাবিক সময়ে তাই এমন নির্দেশনা জারিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করা যাচ্ছে না। সংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮‘য় বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, এমন তথ্য গোপন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ওই আইনের ২৪-এর ১ উপধারায় বলা হচ্ছে: যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুর বিস্তার ঘটান বা বিস্তার ঘটাতে সহায়তা করেন, বা জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অপর কোনো ব্যক্তি সংক্রমিত ব্যক্তি বা স্থাপনার সংস্পর্শে আসিবার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তাহার নিকট গোপন করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনেই এই অপরাধের তদন্ত ও বিচার হওয়ার কথা বলা আছে আইনে। খুনের অপরাধে যেমন সরকারি কর্মকর্তা আর সাধারণ নাগরিককে আলাদা করা দেখা হয় না, এ ক্ষেত্রেও তেমনই হওয়ার কথা। সুতরাং চিকিৎসক, নার্স, আয়া, শুচিকর্মী কিংবা প্রশাসক—সবারই সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়ে তথ্য প্রকাশের দায়িত্ব আছে। জনস্বাস্থ্যের তথ্য শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তাকেই জানানোর বিষয় নয়, ঝুঁকিতে থাকা সবাইকে জানানোর বিষয়। আর সে ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিম্নমানের পিপিই, মাস্ক কিংবা অন্য যেকোনো সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়ে সহকর্মী, পরিবার ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সজাগ করার মতো তথ্য ও মতামত প্রকাশ নিষিদ্ধ হবে কেন?

আবার এই আইনেই আরেকটি ধারা, ২৬ (১) বলছে: যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত যে ধরনের লুকোচুরিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন, তাতে প্রশ্ন তোলাই যায়, তাঁরা আইন লঙ্ঘন করছেন কি না?

কামাল আহমেদ: সাংবাদিক