আম্পানে আম ও লিচুর সর্বনাশ

আম্পানে রাজশাহীর আম ও পাবনায় লিচুর সর্বনাশ

করোনা ভাইরাসের কারণে আমের পরিবহন ও বাজারজাত নিয়ে দুঃচিন্তায় রয়েছেন তারা। তার উপর এই ঘূর্ণিঝড়- রাজশাহীতে ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে। পাবনায় লিচুর শত কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।

সুপার সাইক্লোন আম্পানের তাণ্ডবে রাজশাহীতে আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে গাছ থেকে আম ঝরে গেছে।

এদিকে, বয়ে যাওয়া ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে পাবনার লিচু বাগান। ঝড়ের আঘাতে আধা পাকা লিচু ফেঁটে গেছে এবং শত শত গাছের লিচু ঝড়ে পরেছে। ভেঙে গেছে লিচু গাছের ডাল-পালা।

রাজশাহীর আম চাষীরা বলছেন, এবছর এমনিতে গাছে আম কম এসেছে। তার উপর বুধবার রাতের ঘূর্ণিঝড়ে গাছের অর্ধেকের কাছাকাছি আম পড়ে গেছে।

এমনিতেই এবার করোনা ভাইরাসের কারণে আমের পরিবহন ও বাজারজাত নিয়ে দুঃচিন্তায় রয়েছেন তারা। তার উপর এই ঘূর্ণিঝড়ে গাছ থেকে আম পড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের শিকার হবেন জেলার আম চাষীরা।

রাজশাহী জেলা প্রশাসন প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে জেলায় ঘূর্ণিঝড়ে ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে।

রাজশাহীর কাটাখালীর মেহেরচণ্ডীর আম চাষী আলতাফ হোসেন জানান, তার বাগানে ৩০০টির মতো আমের গাছ রয়েছে। গাছগুলো সব ছোট ছোট। সব মিলিয়ে গাছ থেকে ঝড়ে ১০ মণের মতো আম ঝরে পড়ে গেছে এই চাষীর।

রাজশাহীর আড়ানীর আমচাষী আলতাফ হোসেন বাদশা বলেন, আমার সব ধরনের জাত মিলিয়ে ১২০০টি আম গাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে এক মণ করে আম ঝরে গেছে। সে হিসেবে বেশ বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে এ ঘূর্ণিঝড়ে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আম ঝরে গেছে।

আমরা এমনিতে করোনা ভাইরাসের কারণে আম পরিবহন ও বাজারজাত নিয়ে দুঃচিন্তায় আছি। সেখানে এই ঘূর্ণিঝড় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শামসুল হক বলেন, জেলার সদরের চেয়ে জেলার বাঘা ও চারঘাটে আমের বেশি ক্ষতি হয়েছে। সে হিসেবে গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আমের ক্ষতি হয়েছে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, রাজশাহীতে আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমরা চাষীদের সাথে কথা বলে যেটুকু জানতে পারছি গাছের কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আম ঝরে পড়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি ১০০ কোটি থেকে ১২০ কোটি টাকার আমের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া গ্রাম ও চরাঞ্চলের কাচা বাড়িঘর ভেঙে গেছে। গাছের ডাল ভেঙে পড়ে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে যাওয়ার বৈদ্যুতিক সংযোগ পেতে আমাদের বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া জেলায় জানমালের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

বুধবার থেকেই জেলায় আম্পানের প্রভাবে সকাল থেকেই বৃষ্টিপাত শুরু হয়। তার সঙ্গে ছিলো ঝরো বাতাস। রাতের ঝড়ের গতিবেগ বাড়তে থাকে। একইসাথে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও বাড়ে।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহীতে মোট ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।  বুধবার রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিলো ঘণ্টায় ৬০ কিলিমিটার।

লিচুবাগানে শত কোটি টাকার ক্ষতি

এদিকে, পাবনার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ে লিচুবাগানগুলোর শত কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি জেলার লিচু চাষীদের।

পাবনার বাঁশেরবাদা লিচু ব্যবসায়ী মো. শিপন আহমেদ জানান, পাবনায় এবার লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছিল। গতরাতে আম্পানের তান্ডবে অধিকাংশ বাগানের লিচু গাছের ডাল ভেঙে লিচু ঝরে গেছে। এতে লিচু ব্যবসায়ীরা এবার ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এছাড়া ঝড়ে আমেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

পাকশী গ্রামের লিচু বাগান মালিক রাসেল হোসেন বলেন, লাভের আশায় ব্যাংক থেকে টাকা ঋণ নিয়ে ১০টি বাগান কিনেছিলাম। কিন্তু আম্পানের তান্ডবে এবার লিচুর বাগানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমার প্রায় ৫০ লাখ টাকার লিচুর ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া আমাদের এলাকাসহ আশেপাশের আওতাপাড়া, দাপুনিয়া, আটঘোড়িয়া, একদন্ত গ্রামের সব বাগান মিলিয়ে প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালক মো. আজহার আলী বলেন, পাবনা জেলার মাঠে ধান আম-লিচু ও সবজির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাবনায় চলতি মৌসুমে ৪৬০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে । ঘূর্নিঝড় আম্পানের তান্ডবে প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ হেক্টর লিচু ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে এখনও ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

সাতক্ষীরায় ১৬ হাজার টন আমের ক্ষতি

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে সাতক্ষীরা জেলায় আম চাষীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝরে পড়া আমের কোনো ক্রেতা পাচ্ছেন না আম চাষী ও ব্যবসায়ীরা।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে সাতক্ষীরা জেলায় আম চাষীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গাছের আম ঝরে পড়েছে। অনেক গাছ উপড়ে গেছে। ঝরে পড়া এসব আমের কোনো ক্রেতা পাচ্ছেন না আম চাষী ও ব্যবসায়ীরা। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে একদিকে বিপর্যয়, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে মহাবিপর্যয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

তালা উপজেলার ইসলামকাটি ইউনিয়নের সুজনশাহ গ্রামের মৃত প্রত্যুত কুমার দত্তের ছেলে বুদ্দদেব দত্ত। আম, লিচুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন করেই চলে তার সংসার। ঘূর্ণিঝড়ে তার ২-৩ লাখ টাকার আম ঝরে পড়েছে। সেই সঙ্গে লিচু ঝরে ক্ষতি হয়েছে লক্ষাধিক টাকা।

কৃষক বুদ্ধদেব দত্ত বলেন, বুধবার রাতের ঝড়ে গাছের আম সব ঝরে গেছে। ২-৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে। ঝরে পড়া আমের কোনো ক্রেতা নেই। এসব আম কি করব, বুঝতে পারছি না। আম বিক্রির টাকাতেই আমাদের সারা বছর সংসারের খরচ চলে।

তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে লিচু গাছের জন্য এক ব্যবসায়ী ৫০ হাজার টাকা দাম বলেছিলেন; কিন্তু বিক্রি করিনি। ভেবেছিলাম আরও বেশি দামে লিচু গাছটি বিক্রি করব। তবে ঝড়ের আম ও লিচু দুটোরই ক্ষতি হয়ে গেল। একটি ঘরও ধ্বসে পড়েছে।

এমন চিত্র জেলার সকল মৌসুমী ফল ব্যবসায়ী ও চাষীর। পাটকেলঘাটা থানা এলাকার আব্দুল মতিন বলেন, আমাদের ৫০-৬০টি আম গাছ রয়েছে। সকল গাছের আম ঝরে পড়ে গেছে। লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ি থেকে জানা গেছে, জেলায় আমচাষী রয়েছে ১৩ হাজার ১০০ জন। চলতি মৌসুমে পাঁচ হাজার ২৯৯টি বাগানে চার হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হিমসাগর ১৫৫০ হেক্টর, ল্যাংড়া ৫৬৪ হেক্টর আম্রপালি ৮৯৯ হেক্টর জমিতে। বাকি জমিতে গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, লতাসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির আম রয়েছে।

খামারবাড়ির উপ পরিচালক নুরুল ইসলাম জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে জেলার দুই হাজার ২৭ হেক্টর জমির ১৬ হাজার ২৯৬ টন আমের ক্ষতি হয়েছে। আমগুলো সব ঝরে পড়েছে। আম চাষী ও ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

তিনি বলেন, কয়েকদিন পরই আম বাজারজাতকরণের উপযুক্ত হতো। সেই মুহূর্তে ঝড়টি আম ব্যবসায়ী ও চাষীদের কপালে হাত তুলে দিল। আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা পাঠাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, এছাড়া জেলায় সবজি আবাদ হয়েছে সাত হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে দুই হাজার ৭২ হেক্টর জমির সবজি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে পটল, কলা পেপে, ঝিঙ্গেসহ নানা ধরনের সবজি।