চিকিৎসা দিতে অনীহা দেখালে দায়ী ব্যক্তি আইনের আওতায়: হাইকোর্ট

চিকিৎসা দিতে অনীহা দেখালে দায়ী ব্যক্তি আইনের আওতায়: হাইকোর্ট

পৃথক তিনটি রিটের উপর শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একটি ভার্চুয়াল বেঞ্চ দশ দফা নির্দেশনা জারি করেছে।

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে গুরুতর অসুস্থ কোন রোগীকে চিকিৎসা না দেওয়ায় ওই রোগীর মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

আদালত বলেছে, প্রতিদিনই গণমাধ্যমের খবরে উঠে আসছে চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা। সেজন্য কোন সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল গুরুতর অসুস্থ কোন রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদানে অনীহা দেখালে এবং তাতে ওই রোগীর মৃত্যু ঘটলে এ ঘটনা অবহেলাজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত হবে।

পাশপাশি এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নের্তৃত্বাধীন হাইকোর্টের  ভার্চুয়াল বেঞ্চ  সোমবার (১৫ জুন) যুগান্তকারী এই আদেশ দেন।

এছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের বিশেষত ঢাকা মহানগর ও জেলা, চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলাসহ বিভাগীয় শহরের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ যাতে কোভিড-১৯ ও নন কোভিড সব রোগীকে পরিপূর্ণ চিকিৎসা সেবা প্রদান করে সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য মনিটরিং সেল গঠন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

একইসঙ্গে নন কোভিড রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের জন্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেসব নির্দেশনা প্রদান করেছে তা যথাযথভাবে প্রতিপালন করছে কিনা এবং যদি না করে থাকে তাহলে সেসব ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কি ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তাও প্রতিবেদন আকারে ৩০ জুন হাইকোর্টকে অবহিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ সংক্রান্ত পৃথক তিনটি রিটের উপর শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের এই ভার্চুয়াল বেঞ্চ দশ দফা নির্দেশনা জারি করে।

করোনাকালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এক স্মারকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণের পরামর্শ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবমত কোভিড এবং নন-কোভিড রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট স্মারকের ধারাবাহিকতায় ৫০ শয্যা ও তদুর্ধ্ব শয্যাবিশিষ্ট সব সরকারি ও বেসারকারি হাসপাতালসমূহে কোভিড এবং নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসার জন্য পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নিদের্শনা প্রদান করে হাইকোর্ট।

সার্বিক বিবেচনায় আদালতের নির্দেশনাসমূহ হল:

আইসিইউ ব্যবস্থাপনাকে জবাবদিহিমূলক হতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবস্থাপনা কর্যক্রমকে অধিকতর জবাবদিহিমূলক ও বিস্তৃত করতে হবে। ভুক্তভোগীরা যাতে এ সেবা দ্রুত ও সহজভাবে পেতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে।

কোনো হাসপাতালে আইসিইউ-তে কত জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং কতটি আইসিইউ শয্যা কি অবস্থায় আছে তার আপডেট প্রতিদিনের প্রচারিত স্বাস্থ্য বুলেটিন এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে।

আইসিইউ ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং সেলে ভুক্তভোগীরা যাতে সহজেই যোগাযোগ করতে পারেন সেজন্য পৃথকভাবে ‘আইসিইউ হটলাইন’ নামে পৃথক হট লাইন চালু এবং হটলাইন নাম্বারগুলো প্রতিদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষতঃ টেলিভিশন মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে।

মাত্রাতিরিক্ত ফি আদায় মনিটরিং বিষয়ে হাইকোর্ট বলেছে, আইসিইউ-এ চিকিৎসাধীন কোভিড-১৯ রোগী চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ মাত্রাতিরিক্ত বা অযৌক্তিক ফি আদায় না করতে পারে সে বিষয়ে মনিটরিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে।

হাইকোর্ট অক্সিজেনের মূল্য প্রদর্শনের বিষয়েও নির্দেশ দিয়েছেন। অক্সিজেন সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য এবং রিফিলিংয়ের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। আদালত আদেশে বলেছে, খুচরা বিক্রেতাদের অক্সিজেন সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য প্রতিষ্ঠান/দোকানে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃত্রিম সংকট রোধে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র এবং রোগীর পরিচয়পত্র ব্যতীত অক্সিজেন সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রয় বন্ধের কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে। হাইকোর্ট, অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রয় ব্যবস্থা মনিটরিং জোরদার করতেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে।

সরকারি নির্দেশনা পালনের প্রতিবেদন দিতে হবে। আদালত বলেছে, বর্তমান প্রেক্ষপটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাসমূহ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ যথাযথ ভাবে প্রতিপালন করছে কিনা সে বিষয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিন পর পর একটি প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে প্রেরণ করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

ঐ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৫ দিন পর পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এই আদালতে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া যাচ্ছে।

এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২৪ মে তারিখে জারিকৃত নির্দেশনা অনুসারে ঐ তারিখের পর ৫০ শর্য্যার অধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহে ১৫ জুন তারিখ পর্যন্ত কত জন কোভিড এবং নন-কোভিড রোগীর চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে সে সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ৩০ জুন আদালতে দাখিল করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হলো। একইসঙ্গে ৫০ শয্যার অধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহের একটি তালিকা পাঠাতে হবে।

জাস্টিস ওয়াচ ফাউন্ডেশনের পক্ষে ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলনসহ পাঁচ আইনজীবীর দায়েরকৃত পৃথক তিন রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট এ আদেশ দেয়।