নগর রক্ষা বেড়িবাঁধে পুলিশ ও দলীয় নেতাদের চাঁদাবাজির মহোৎসব !

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ঢাকা শহর রক্ষাবাঁধে শত শত মালবাহী যানবাহন থামিয়ে অবাধে চাদাঁবাজী চলছে। রক্ষকই এখানে ভক্ষক রূপে আর্বিভূত হয়েছে। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সমানতালে তাল মিলিয়ে পুলিশও চাঁদাবাজির মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছে। তল্লাশির নামে জায়গায় জায়গায় বাঁশ ফেলে তাৎক্ষণিক চেক পোষ্ট বানিয়ে চাঁদা আদায় করছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দৈনিক প্রায় ২০ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করছে তারা। মাসে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা উঠছে সমগ্র বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে। পুরো বেড়িবাঁধ এলাকাজুড়ে অন্তত ১৬টি স্পটে ৮ থানার পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা মিলে মালামাল বহনকারী পরিবহন থামিয়ে অবাধে এই চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। চাঁদাবাজদের হাত থেকে রেহাই পেতে এখানে অনেকেই চাঁদাবাজদের হাতে জাল নোট গুঁজে দিয়েও সটকে পড়েন বলে তথ্য মিলেছে। এসব জাল নোট বিভিন্ন হাত ঘুরে জনসাধারনের হাতে গিয়ে পড়ায় তাদের নাজেহাল হবারও তথ্য মিলেছে।

এদিকে দীর্ঘ অর্ধযুগ ধরে বেড়িবাঁধের রাস্তায় ল্যাম্পপোষ্টে বাতি না থাকায় ছিনতাইকারীদের অভ্যয়ারন্যে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয় বাধেঁর রাস্তা দখল করে শত শত দোকান-পাট বসানোর ফলে ভয়াবহ যানজটে নগরবাসীর নাভিশ্বাস উঠেছে। পন্যবাহী যানবাহন আর ফুটপাতের দোকান-পাটে চাদাঁবাজিতে পুলিশের মহা ব্যস্ততায় সেখানে পরিবেশ বিপন্ন হয়ে উঠেছে। রীতিমত বেড়িবাধঁ এলাকা সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত পরিবহন ব্যাবসায়ীদের কাছে রীতিমত এক আতংকজনক স্থানে পরিনত হয়েছে। ওপেন সিক্রেট এই চাঁদাবাজিতে হতবিহবল অসহায় মানুষের পাশে যেন দাঁড়াবার কেউ নেই!

গত কয়েক দিন সরেজমিন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ঢাকা নগর রক্ষা বেড়িবাঁধের গাবতলী থেকে মিডফোর্ড বাবু বাজার পর্যন্ত ১১ দশমিক ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে প্রতিদিন দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে শত শত মালবাহী যানবাহনে করে হাজার হাজার কোটি টাকার মাল নামে নগরীর পাইকারী কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পুরনো ঢাকার কামালবাগ, সোয়ারীঘাট, চকবাজার, মৌলভীবাজার, বেগমবাজার, চম্পাতলী, বড় কাটারা, ছোটকাটারা, মিটফোর্ড, বাদামতলী, বাবুবাজার, ও ইসলামপুরসহ প্রায় ২০টি পাইকারী মার্কেটে। প্রতিদিন দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিনাঞ্চল থেকে এক হাজারের ওপরে ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে ট্রাক, লরি, পিকআপ, জিপসহ নানা পরিবহনে করে মালবোঝাই হয়ে শহর রক্ষা বাধেঁর ওপর দিয়ে এসব পণ্য পাইকারী কেন্দ্রে পৌঁছে। বেড়িবাধেঁর প্রায় ১৬টি স্পটে পুলিশ চেকপোষ্টের নামে রাস্তার মাঝখানে বাঁশ ফেলে, বেড়িকেট দিয়ে তল্লাশীর নামে প্রকাশ্যে চাদাঁবাজীতে নেমে পড়ে। বিশেষ করে রাত ১০ টার পর থেকে ভোর অবদি চলে তাদের চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজিকালে পুলিশের ভূমিকা হয় কখনো ছিনতাইকারীর মত, কখনো বা হয় ভিক্ষুকের মত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দু’দফা থানার ডিউটি বদলের কারণে ডবল গ্রুপের চাঁদা আদায় চলে। ডিউটিকালীন দারাগো, কনস্টেবল ও সোর্স মিলে বেড়িবাঁধের নিদির্ষ্ট স্থানের রাস্তায় এভাবেই মালবাহী বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে চাদাঁ আদায় করছে। এমনকি শাসকদলীয় প্রভাবশালী নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে পাঁতি নেতারাও এ থেকে পিছিয়ে নেই। এই চাদাঁবাজদের হাত থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও রক্ষা পাচ্ছে না। বাধেঁর রাস্তা দিয়ে কেউ মালামাল নিয়ে গেলে পুলিশের লোভাতুর দৃষ্টি থেকে কেউ এদের হাত থেকে রেহাই পায় না। সন্দেহের কোন কিছু না পেলেও পুলিশের হাতে একটি ছোট লাল নোট না দিলে এদের হয়রানির অন্ত নেই। পুলিশের গাড়িতে তুলে এদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের ওই অর্থ চাই চাই। এমনকি এসব ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে পুলিশের গাড়িতে তুলে অথবা তাদের মালবাহী যানবাহন থামিয়ে দীর্ঘক্ষণ আটককে রাখে। আবার পুলিশের গাড়িতে করে বিভিন্নস্থানে ঘুরিয়ে থানার হাজতখানায় আটককে রাখারও অভিযোগ করেছে অনেক ভুক্তভোগী। এভাবেই পুলিশ ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করছে।

চাদাঁর টাকা সিংহভাগ পুলিশের উর্ধতন মহল থেকে শুরু করে শাসকদলীয় ও বিরোধদলীয় প্রভাবশালী নেতাদের পকেটে পৌছেঁ যাচ্ছে বলে এ টাকা জায়েজ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। এর ফলে প্রকাশ্যে চাদাঁবাজীর পরও এদের টিকিটিও কেউ ছুঁতে পারছে না। উল্টো এরা বীরদর্পে বেপোরোয়াভাবে চাদাঁ আদায় করছে। কেউ বাধাঁ দিলে এদের ওপর নেমে আসে মধ্যযুর্গীয় কায়দায় নির্যাতন। প্রতিবাদকারীদের লাখ লাখ টাকার মালামাল গায়েব করে দেয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট পাইকারী ব্যবসীয়দের অভিযোগ।

সূত্রগুলো জানায়, ৮ থানা পুলিশের চাঁদাবাজীর স্পট গুলো হচ্ছে, দারুস সালাম থানাধীন গাবতলী, আদাবর থানাধীন ঢাকা উদ্যান, মোহাম্মাদপুর থানাধীন মোহাম্মদপুর, রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ, হাজারীবাগ থানাধীন শিকদার মেডিক্যাল, নবাবগঞ্জ সেকশন, কামরাঙ্গীরচর থানাধীন হাক্কুল এবাদ বেইলী ব্রীজ ও রসুলপুর পাকা ব্রীজের উভয় পাশ, লালবাগ থানাধীন শহিদ নগর বৌ-বাজার, শ্মশান ঘাট, চকবাজার থানাধীন চাঁদনী ঘাট শরিফ হোটেল সংলগ্ন চৌরাস্তা, চক বাজার জাহাজ বিল্ডিংয়ের মোড়, ইসলামবাগের আলীর ঘাট, লবনের কারখানা,সোয়ারী ঘাট, কামাল বাগ, নলগোলা, চক বাজার ও কোতয়ালী থানার সীমান্ত অবস্থিত বাবু বাজার ও মিডফোর্ড সংলগ্ন দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর নীচে নদীর তীরের বেড়ীবাঁধ, কোতয়ালী থানার বাদামতলী ফলের আড়তের সামনে বাকল্যান্ড বাঁধ।

জানা গেছে, ঢাকা নগর রক্ষা বেড়ীবাঁধের উপর দিয়ে চলাচলকারী চাল, ডাল, ফল, কাঁচামাল (সব্জী) সহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক, কভার্ড ভ্যান, পিকাপ, ভ্যান গাড়ি, রিক্সাসহ শত শত যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি করে পুলিশ ও তাদের মনোনীত চাদাঁর কালেকটাররা। চলাচলকারী ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের যানবাহনে গণহারে চাঁদাবাজী করছে ডিএমপির পুলিশ এবং তাদের মনোনীত চাঁদাবাজরা। এমনকি স্থানীয় আওয়ামীলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে সন্ত্রাসীরা একই উপায়ে চাদাঁবাজি করছে। প্রতি পন্যবাহী যানবাহন থেকে নিম্নে ১০০টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত চাদাঁ আদায় করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। বিশেষ করে মিডফোর্ড বাবু-বাজার ব্রীজের নীচে, শিকদার মেডিকেল ও কামরাঙ্গীরচরের রসুলপুর ও লোহার ব্রীজের উভয় পাশে প্রকাশ্যে চলছে পুলিশের চাঁদাবাজী। বৈধ পণ্যবাহী ট্রাক, কভার্ড ভ্যান, রিক্সা , ভ্যান গাড়ী আটকে রেখে তল্লাশীর নামে হয়রাণী করা হচ্ছে। পুলিশ আটকের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করছে। আইনের দোহাই দিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকেরা এভাবেই চাদাবাঁজিতে মেতে উঠেছে। এমনকি ৮ থানা পুলিশ ও সন্ত্রাসী মিলে পুরো বেড়িবাঁধ এলাকাজুড়ে শত শত ফুটপাত থেকে লাখ লাখ চাদাঁবাজি চালিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

নিয়মিত চাঁদাবাজির শিকার সূত্রগুলো জানায়, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিডফোর্ড বাবু বাজার, শিকদার মেডিকেল এবং কামরাঙ্গীরচরের রসুলপুর পাকা ব্রীজ ও ছাতা মসজিদ এলাকার লোহার ব্রীজের উভয় পাশে পুলিশ বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহন থামিয়ে চাদাঁ আদায় করছে। এখানে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে কামরাঙ্গীরচর ফাড়ির পুলিশ। মিডফোর্ড, বাবু বাজার, শিকদার মেডিকেল এলাকায় পুলিশ ও তাদের মনোনীত ব্যাক্তিরা একই উপায়ে চাঁদা আদায় করছে। পুলিশের চাঁদাবাজীর হাত থেকে পথচারীরাও রেহাই পাচ্ছে না। বাবু-বাজার ব্রীজের নীচে সন্ধ্যার পর পুলিশের সামনে খদ্দরদের নিয়ে মহোৎসবে মেতে উঠে পতিতারা।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, কামরাঙ্গীর চর লোহার ব্রীজের ঢালে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বুথ ও কাঠের দোকানের সামনে কামরাঙ্গীর চর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা বিভিন্ন পণ্যবাহী রিক্সা, ভ্যান, ট্রাক ও কভার্ড ভ্যান থামিয়ে তল্লাশীর নামে বৈধ পণ্যবাহী যান ও ব্যবসায়ীদের কাছ হতে গণ হারে চাঁদাবাজী করছে। পুলিশকে চাঁদা না দিলে মালামাল আটকে পুলিশ নানা মুখী হয়রাণী করছে। মধ্যাহ্নে ২ ঘন্টা বিরতিসহ পালাক্রমে দুই শিফটে ডিউটি পালন করে পুলিশ সদস্যরা। লালবাগ নবাবগঞ্জ সেকশন পুলিশ ফাঁড়ির সংলগ্ন বেড়িবাধেঁ শত শত যানবাহন থামিয়ে চাদাঁ আদায় করছে ফাড়িঁর পুলিশ।এখানে শত শত ফুটপাত দোকানঘর থেকে চাদাঁ তুলে স্থানীয় সরকারদলীয় নেতা বিপ্লব, জাকির, সেন্টু ও পাউবো সুইজ গেটের কেয়ারটেকারসহ কয়েকজন। এরাই নবাবগঞ্জ বড় মসজিদ সংলগ্ন বেড়িবাধেঁর রাস্তা দখল করে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে।

সম্প্রতি বুড়িগঙ্গার পশ্চিমের শাখা নদীতে বালু ভরাট করে এই ট্রাকস্ট্যান্ড করার পর প্রতি ট্রাক আনলোড ১শ টাকা, লোড দেড়শত টাকা। প্রতিদিন কমপক্ষে এখানে শতাধিক ট্রাক লোড আনলোড করায় ভয়াবহ যানজটে এলাকাবাসির দূর্ভোগের সীমা নেই। এর ২শত গজ সামনে একই উপায়ে লালবাগ শহীদনগর আধাগলির সংলগ্ন বেড়িবাঁধে অবৈধভাবে আরেকটি ট্রাক স্ট্যান্ড রয়েছে। এখানে হাজারীবাগ বেড়িবাঁধের রাস্তায় যানবাহন থামিয়ে চাদাঁবাজি করে থানা পুলিশ।
সূত্রঃক্রাইম নিউজ সার্ভিস