ইলিয়াস আলীসহ দেড়শ’ গুমের মামলার তদন্ত থেমে আছে

আজ আন্তর্জাতিক গুম দিবস : গুম ঘটনার একটিরও কূল-কিনারা হয়নি

gum-ghotonar-ektir-o

গুমের ঘটনার একটিরও কূল-কিনারা হয়নি। শেখ হাসিনা সরকারের সাড়ে চার বছরে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ দেশে দেড় শতাধিক ব্যক্তি গুম-গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন। এখন পর্যন্ত একটি মামলারও তদন্তে অগ্রগতি হয়নি। শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম গুপ্তহত্যারও কোনো সুরাহা হয়নি। আর গুম ও গুপ্তহত্যার বিচার না পাওয়ার মধ্য দিয়ে আজ ৩০ আগস্ট পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম দিবস।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গুম ও গুপ্তহত্যা মামলার তদন্ত এখন একেবারেই থেমে আছে। এসব আলোচিত মামলার তদন্ত নিয়ে মাথাব্যথাও নেই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর। গুম ও গুপ্তহত্যার মামলাগুলোর তদন্তে শুরুতেই অনীহা ছিল পুলিশ, র্যাবসহ গোয়েন্দাদের। অভিযোগ আছে, আদালতে গিয়েও ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাননি। রিট করেও কাজ হয়নি। বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে নিখোঁজ থাকা বা গুম হওয়া ব্যক্তির স্বজনরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গিয়ে পাত্তা পাচ্ছেন না। নানা অজুহাতে তারা এসব মামলার বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মামলার অগ্রগতি কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাপারে কোনো তথ্য পাচ্ছেন না প্রিয়জনরা। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা দিনের পর দিন পথ চেয়ে থেকে হতাশ হয়ে পড়েছেন। তারা কার কাছে যাবেন, এখন তাও জানেন না।

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ গুম ও গুপ্তহত্যা নিয়ে তত্পর ছিল। এ বিষয়ে তারা প্রতিমাসেই অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করত। কিন্তু তাদের তত্পরতাও থামিয়ে দেয়া হয়েছে। সংগঠনের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খানকে ডিবি পুলিশ হঠাত্ তুলে নিয়ে যায় বাসার সামনে থেকে। অনেকটা গুম হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। চারদিকে হৈচৈ পড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনই এক পরিস্থিতি চলছে এখন দেশে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে আটক কিংবা নিখোঁজ হওয়া অধিকাংশ ঘটনার ধরন ও প্রকৃতি প্রায় অভিন্ন। সাদা পোশাকধারীদের হাতে অপহৃত হওয়ার পর কয়েকজনের লাশ পাওয়া গেছে নদী, বিভিন্ন ঝোপ-জঙ্গল, ডোবা-নালা, বেড়িবাঁধ বা নির্জন স্থানে। অনেকে এখনো নিখোঁজ আছেন। তাদের লাশও পাওয়া যায়নি। কে বা কারা হত্যাকারী, কেনইবা নিখোঁজ ব্যক্তির হদিস মিলছে না, এর কোনো তথ্যই জানাতে পারছেন না পুলিশ ও র্যাবের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও গাড়িচালক আনসার আলী রাজধানীর বনানীর সিলেট হাউসের বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। গভীর রাতে বনানী ২ নম্বর রোডে সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় তার ব্যবহৃত গাড়িটি উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। এ ব্যাপারে আদালতে একটি রিট করা হয়। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে আশ্বস্ত হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস ও আদালতের নির্দেশের পরও ইলিয়াস আলীর খোঁজ মেলেনি। ইলিয়াস আলীর গুম নিয়ে সরকার এখন কোনো কথাই বলছে না। এই চাঞ্চল্যকর গুমের ঘটনা যেন ধামাচাপা পড়ে গেছে।

রাজধানীর ইন্দিরা রোড থেকে ২০১০ সালের ২৫ জুন রাতে বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম সাদা পোশাকধারীদের হাতে আটক হয়ে এখন পর্যন্ত নিখোঁজ। এ বিষয়ে আদালতে রিট এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব পর্যায়ে লিখিত আবেদন করা হয়। চৌধুরী আলমের ছেলে আবু সাঈদ চৌধুরীর হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়েরের প্রেক্ষিতে চৌধুরী আলমকে দ্রুত খুঁজে বের করতে পুলিশের আইজি ও র্যাবের ডিজিকে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। আদালতের নির্দেশের পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা চোখে পড়ছে না। এর আগে চৌধুরী আলম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে সিআইডি।

জানা গেছে, সিআইডির তদন্তে মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। এদিকে, অপহরণের পর গুপ্তহত্যার শিকার যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানা বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলামের ঘটনায় দায়ের করা মামলাটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে না ডিবি পুলিশ।

২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার বাংলামটরে নিজ ব্যবসায়িক কার্যালয় থেকে বের হয়ে তিনি আর বাসায় ফিরে যাননি। পরে গাজীপুরে তার লাশ পাওয়া যায়। নিহত নাজমুলের স্বজনরা জানান, এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করা হয়। মামলাটি তদন্তের জন্য মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) স্থানান্তর হলেও অপহরণকারীদের শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বরিশালের উজিরপুরের বিএনপি নেতা হুমায়ুন খান ঢাকার মালিবাগ থেকে সাদা পোশাকধারীদের হাতে আটকের পর আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ।

২০১০ সালের ২৩ নভেম্বর সকালে হুমায়ুন তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢাকার সূত্রাপুরের ৪৫/ক, ঢালকানগর ফরিদাবাদের নিজ বাসা থেকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় মফিজুলের বাসায় যান। সেখান থেকে সাদা পোশাকের একদল লোক নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে আটক করে। এ ঘটনায় হুমায়ুনের ছোট ভাই মঞ্জু খান বাদী হয়ে ১৩ ডিসেম্বর রামপুরা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটি তদন্ত করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। হুমায়ুনের ভাই মঞ্জু জানান, তদন্তের নামে পুলিশ গড়িমসি করছে।

২০১২ সালের ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায় শ্রমিক নেতা আমিনুলকে নিজ শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের (বিসিডব্লিউএস) সাভার অফিসের কাছ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে তাকে অপহরণ করা হয়। পরদিন ৫ এপ্রিল সকালে টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার পুলিশ টাঙ্গাইলের ব্রাহ্মণ শাসন মহিলা মহাবিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনের রাস্তা থেকে আমিনুলের লাশ উদ্ধার করে। এ সময় আমিনুলের দেহের ডান হাঁটুর নিচে একটি কাপড় বাঁধা ছিল, যেখানে জমাটবাঁধা রক্ত ছিল এবং তার দুই পায়ের আঙ্গুল থেতলানো ছিল। মামলার তদন্ত করছে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা। কিন্তু এখনো এই মামলার কোনো ক্লু পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন, শ্রমিক আন্দোলনসহ যুক্তরাষ্ট্রের তাগাদা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না প্রশাসন।

গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি র্যাব পরিচয়ে আটক করে নেয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী ছাত্র আল-মোকাদ্দেস ও ওয়ালিউল্লাহর খোঁজ এখনো মেলেনি। ঢাকায় ব্যক্তিগত কাজ শেষে হানিফ এন্টারপ্রাইজের গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন তারা। রাত সাড়ে ১১টায় রাজধানীর কল্যাণপুর বাস কাউন্টার থেকে ঝিনাইদহ-৩৭৫০ নম্বর গাড়ির সি-১ ও সি-২ সিটে বসে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মাঝামাঝি সময়ে সাভারের নবীনগর পৌঁছালে র্যাব-৪-এর সদস্য পরিচয় দিয়ে গাড়িটি থামানো হয়। এ সময় র্যাবের পোশাক ও সাদা পোশাকধারী ৮/১০ জন বাসে উঠে আল-মোকাদ্দেস ও ওয়ালিউল্লাহকে নামিয়ে নিয়ে যায় বলে বাসে অবস্থানকারী যাত্রী ও সুপারভাইজার সুমন নিশ্চিত করেন। এরপর থেকে র্যাবের হাতে আটক দুই ছাত্রের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনারকে র্যাব আটক করে গুম করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। গত বছরের ৬ এপ্রিল স্থানীয় একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগের পর থানায় মামলা দায়ের করা হলেও পুলিশ এ মামলার তদন্ত করছে না বলে অভিযোগ করেন দিনারের স্বজনরা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৫৬ জন গুম হয়েছে, যার মধ্যে ২৮ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। সূত্র : আমার দেশ August 30, 2013