প্রবাসীদের ঈদ উদযাপন

প্রবাসীদের ঈদ উদযাপন
দিন দিন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বাঙালিরা। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা ঈদ উদযাপন করছে ভিন্নরূপে, ভিন্ন স্বাদে। তাদের বাবা-মায়েরা ঈদের দিনে, হারিয়ে যাচ্ছে ছোটবেলায় কাটানো ঈদের দিনের স্মৃতিগুলোতে – লিখেছেনঃ সামিহা সুলতানা অনন্যা

ঈদ মোবারক সোনামণি, কেমন আছ? স্কাইপ-এ ছোট খালার গলা শুনতে শুনতেই ঘুম ভাঙ্গে সোমার। তার বয়স যখন চার বছর তখনই মা-বাবার সাথে সে চলে যায় কানাডায়। এখন ওর বয়স নয়। ঢাকায় এ পর্যন্ত একবারই ঈদ করেছে সোমা। ছোটবেলার কথা, তাই সেরকম মনে নেই। গলা শুনে সোমাও ছুটে চলে গেল কম্পিউটারের কাছে ঈদ মোবারক জানাতে। ওদের এখন ঈদের সকাল আর খালাদের রাত। যদিও ঈদের দিন ওদের স্কুল, অফিস সব খোলা, তবুও ঈদ তো! ওরা তাই ঈদের রাতে পার্টি করবে, সকালে বাবা ঈদের নামাজ পড়তে যাবে। এভাবেই বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের ঈদের দিনটি শুরু হয়। দিন দিন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বাঙালিরা। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা ঈদ উদযাপন করছে ভিন্নরূপে, ভিন্ন স্বাদে। তাদের বাবা-মায়েরা ঈদের দিনে, হারিয়ে যাচ্ছে ছোটবেলায় কাটানো ঈদের দিনের স্মৃতিগুলোতে। প্রবাসে ঈদের স্বাদ অনুভব করতে কথা হচ্ছিল, নানা দেশের প্রবাসী বাঙালিদের সাথে।

নেদারল্যান্ডে ঈদ

গত প্রায় আট বছর ধরে অমিত শরমি থাকে নেদারল্যান্ডে। তাদের বাস নেদারল্যান্ডের ডেলফন শহরে। অমিত বলছিলেন পিএইচডি শেষ হবার পর এখন তিনি চাকরি করছেন। বিভিন্ন ঈদ তারা বিভিন্নভাবে উদযাপন করে থাকে। ছাত্র অবস্থায় ঈদ আর চাকরিজীবী হিসেবে ঈদের ক্ষেত্র ভিন্ন। ইউরোপের এই দেশটি বেশ ছোট। সে তুলনায় প্রচুর মুসলমানের বসবাস। তাদের অফিসে অনেক মিশরীয়, টার্কিস, মরোক্কিয়ানরাও রয়েছে। ঈদের দিন তারা নানা রকম মিষ্টি, হালুয়া নিয়ে আসে সাথে করে। অনেকে সম্ভব হলে ছুটিও নেয়। এছাড়া রোজায় মসজিদে সকলের জন্য ইফতারের ব্যবস্থাও করা হয়। তাদের একমাত্র সন্তান অয়ত্রী। অয়ত্রীর বয়স এবার বার হতে চললো। অয়ত্রী বলে, ঈদের দিন আমার স্কুল করতে খুবই মন খারাপ লাগে। তবে ছুটি নিলে তাতে কোন সমস্যা হয় না। ডাচে রোজার ঈদকে সাউকার ফিস্ট বলে। কখনও কখনও রোজায় একসাথে ইফতারও করি আমরা। ঈদে দাদা-দাদু, নানা-নানুর কথাও খুব মনে পড়ে। তবে মা-বাবাসহ, বহু বাঙালি পরিবার মিলে ঈদের পরের উইকএন্ডে পার্টি করি। মাসহ সবাই কিছু না কিছু রান্না করে নিয়ে যায়। তার মা শরমি বলছিলেন, বাচ্চাকে তো দেশের ঈদের আনন্দ অনুভব করাতে পারেন না, তবুও তার পক্ষ থেকে চেষ্টা করেন। ঈদের দিন ঈদগাহে নামাজ পড়তে সকলে যায়। ঈদে সবাই মিলে বিভিন্ন জনের বাসায়, নতুন জামা পরে একত্রিত হয়। একেকজন একেক ধরনের খাবার রান্না করে নিয়ে আসে, সেমাই, পোলাও, মাংস সবই। আবার কখনও বারবিকিউ পার্টিও করা হয়। ঈদে প্রত্যেকবারই একটা করে কেকও কাটা হয়। ঈদের দিন অফিস, স্কুল খোলা থাকলেও বাড়িতে ছোট করে ঈদ উপলক্ষে রান্নাবান্না করা হয়। এমনকি ঈদে মেহেদী উত্সবও করা হয়েছে কখনও কখনও।

কানাডায় ঈদ

ফারজানা বলছিলেন, তিনি কানাডার টরেন্টোতে থাকেন। কানাডার বিভিন্ন স্টেটে, ঈদের রূপ বিভিন্ন। দেশ থেকে গিয়েছেন চার বছর হতে চলল। তার স্টেটে বাঙালির সংখ্যা খুব বেশি নয়। তার বাসা থেকে দুই ঘণ্টা দূরে পাশের স্টেটে, প্রচুর বাঙালি থাকে। ঈদের দিন তাই ঐ শহরেই চলে যান। এখনও তার পড়াশোনা শেষ হয়নি, মাস্টার্স করছেন। তার স্বামী আরিফ পাশের শহর ব্রাম্পটনে পিএইচডি করছেন। আরিফ বলেন, আমরা ঈদের দিন একসাথে হই। সাধারণত ক্লাস ফাঁকি দেই। পাশের শহরেই, অনেক পরিচিত ভাইয়া-ভাবীরা থাকেন। বেশ জম-জমাট পার্টিই হয় ঈদের দিন। ঈদের দিন একসাথে নামাজ পড়ি। অনেক সময় ঈদের পরের উইকএন্ডে আমরা ক্যাম্পিং-এ চলে যাই। ভাইয়া-ভাবীদের ছোট ছোট পিচ্চিরাও খুব আনন্দে থাকে। সবাই মিলে পিকনিকও করি। ফারজানা বলেন, দেশের ঈদের মজার দিনগুলোকে খুব অনুভব করি। বন্ধুদেরকে মেইলে ঈদকার্ড পাঠাই। বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ির জন্য উপহারও কিনে রাখি যেন দেশে গিয়ে দিতে পারি। তবু বাড়িতে ঈদের অনুভূতি কী আর ভুলতে পারি!

আমেরিকায় ঈদ

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটে থাকেন সাদিয়া ও শরীফ। তারা ছয় বছর ধরে আছেন সেখানে। শরীফ এখন চাকরি করেন ও তার স্ত্রী মাস্টার্স করছেন। সাদিয়া বলছিলেন, আমাদের বাসা লস এঞ্জেলস থেকে বেশ দূরে। শহরের তুলনায় মানুষ খুব কম হওয়ায় বেশ ছিমছাম। সাদিয়া বলছিলেন, ঈদের দিন বেশ একা একা কাটে। বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলাদেশি খুব কম। আমরা ছয়-সাতটি পরিবার। তাও ঈদের দিন রাতে হলেও একসাথে হই। বাড়িতেও রান্না করি, পোলাও-কাবাব। মা-বাবার সাথে ফোনে, কম্পিউটারে কথা হয়। বিদেশে থেকে দেশকে অনুভবের চেষ্টা করি। বাঙালি বন্ধু ও বাকিরাও আসে আমার বাড়িতে। আমরাও যাই। মজার মজার খাওয়া-দাওয়া, আর অফিস, ক্লাস সবই এক সাথে চলে আমাদের ঈদে। তবে আমেরিকার বিভিন্ন স্টেট যেমন নিউইয়র্ক, এমনকি লস এঞ্জেলেসে বাঙালি প্রচুর। সেখানে ঈদে উত্সব হয়, আরও অনেক বড় করে হয়।