প্রধানমন্ত্রীর ‘মাথা খারাপ’ হয়ে গেছে

‘শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নেব না, হতেও দেব না’

সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধি সংযোজন করা না হলে লাগাতার কর্মসূচি দেয়ার হুমকি দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ‘দাবি না মানলে শেখ হাসিনা সরকারকে বিদায় নিতে হবে। আপনারা হয় নির্দলীয় সরকারের দাবি মানবেন, না হয় পালাবার পথ খুঁজবেন। এখন আপনারাই চিন্তা করে দেখুন।’ তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে তার নির্বাচনে অংশ নেবে না, হতেও দেবে না।

রবিবার নরসিংদীর দোগরিয়ার বালুর মাঠে (প্রস্তাবিত বাসাইল পৌর শিশুপার্ক) ১৮ দলীয় জোটের এক জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।

বৃষ্টি উপেক্ষা করে নরসিংদীর আশপাশের জেলাগুলো থেকেও হাজার হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন। পড়ন্ত বিকালে খালেদা জিয়া যখন জনসভাস্থলে এসে পৌঁছেন, তখন বালুর মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।

খালেদা জিয়া বলেন, সঙ্কট উত্তরণের সংলাপের পথ প্রধানমন্ত্রী নিজেই বন্ধ করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ‘মাথা খারাপ’ হয়ে গেছে। সুপ্রিমকোর্ট তাকে বলেছিলেন রং হেডেড। তার চিকিত্সা প্রয়োজন, সুস্থতা প্রয়োজন। এখন এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে জনগণের কাছে।

তিনি বলেন, আজীবন ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছা থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেছেন। সংবিধান ‘নিজের মতো করে সাজিয়ে’ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পরিকল্পনা করেছেন। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তার প্রশ্ন, এ ধরনের নির্বাচন কি গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

প্রায় ২১ বছর পর নরসিংদীতে খালেদা জিয়ার এই সফরের মধ্য দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আট জেলায় বিরোধীদলীয় নেতার গণসংযোগ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। অবশ্য ভোটের সম্ভাব্য সময়ের চার মাস বাকি থাকতে এ কর্মসূচিকে বিরোধীদলীয় নেতার ‘প্রাক-নির্বাচনী প্রস্তুতি’ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

বেলা ১টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর গুলশানের নিজ বাড়ি থেকে নরসিংদীর পথে রওনা হন খালেদা জিয়া। পথে রাজধানীর নয়া পল্টন, যাত্রাবাড়ী, নারায়াণগঞ্জের কাঁচপুর সেতু, সোনারগাঁও মোড়, আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, ভুলতা, নরসিংদীর মাধদীসহ বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীরা রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতাকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা পথে পথে ব্যাপক শোডাউন করেন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর মধ্যে ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কয়েক শত তোরণ নির্মাণ করা হয়।

বিকাল পৌনে ৫টায় হাজার হাজার মানুষের ভিড় ডিঙিয়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর নরসিংদী বালুর মাঠে পৌঁছলে নেতাকর্মীরা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানান।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘পার্লামেন্ট বাতিল করতে হবে। সংসদে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করতে হবে। নির্দলীয় কিংবা নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচনে আমাদের জোট যাবে না। একদলীয় নির্বাচনও হতে দেয়া হবে না।’

১৯৯৬ সালে এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য ১৭৬ দিন হরতাল দিয়েছে। এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার না দিলে তার দল লাগাতার কর্মসূচি দেবে। হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেবে, নয় হাসিনা বিদায় নেবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি না-কি আন্দোলন করতে জানে না। বিএনপি আন্দোলন করতে জানে কিন্তু তাদের (আওয়ামী লীগ) মতো মানুষ মারে না।’

আগামীতে ক্ষমতায় গেলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ‘নতুন ধারার’ সরকার গঠন করবে জানিয়ে সবাইকে জাতীয়তাবাদী শক্তির পিছনে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।

নতুন ধারার সরকারের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের মতো প্রতিহিংসার রাজনৈতি করবে না। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে। দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।’

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন না দিলে লাগাতার হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে নির্বাচন করতে চান। কারণ ক্ষমতায় না থাকলে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। টিএনওদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।

নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ দাবি করে বিএনপিপ্রধান বলেন, ‘আমাদের একটি অপদার্থ আজ্ঞাবহ ও মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন আছে। এ সরকার ক্ষমতায় থাকলে তারা শুধু জি হুজুর জি হুজুর করবেন। এই কমিশন অসহায়। এই জি হুজুর মার্কা কমিশনের অধীনে নির্বাচনে সুষ্ঠু হতে পারে না। এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে আমরা নির্বাচনে যাব না।

বর্তমান সরকারের সময়ে দেশে কোনো উন্নয়ন হয়নি দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ যতদিন থাকবে বাংলাদেশের কোনো উন্নতি হবে না।

জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় শিক্ষা সম্পাদক খায়রুল কবীর খোকনের সভাপতিত্বে ১৮ দলীয় জোট নেতাদের মধ্যে এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান, খেলাফত মজলিশের চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য এম শামসুল ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান সমাবেশে বক্তব্য দেন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আ স ম হান্নান শাহ, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, জনসভা প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা, কেন্দ্রীয় নেতা ওসমান ফারুক, শামসুজ্জামান দুদু, আমান উল্লাহ আমান, ফজলুল হক মিলন, সানাউল্লাহ মিয়া, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, নুরী আরা সাফা, শিরিন সুলতানা, মীর সরফত আলী সপু, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, হাবিবুর রশীদ হাবিব, স্থানীয় নেতা রোকেয়া আহমেদ লাকী, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল জয়নাল আবেদীন, সুলতান উদ্দিন মোল্লা, মুঞ্জর এলাহী, দীন মোহাম্মদ দীপু, জামায়াতের মাওলানা অধ্যাপক শেখ মালেক, আবদুস সাত্তার, মোবারক হোসেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন ও জেলা সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার সভা পরিচালনা করেন।