জিএসপি ফিরে পেতে আত্মবিশ্বাসী বিজিএমইএ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার (জিএসপি) ফিরে পেতে আত্মবিশ্বাসী তৈরী পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। আগস্টের শেষ সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসম্যান সেন্ডার লেভিন বাংলাদেশ সফর করেন। সফরকালে বাংলাদেশের পণ্যের মান, কারখানার কর্মপরিবেশ, শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠনসহ ক্রেতাদের শর্ত পূরণে বাংলাদেশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, এসব বিষয় তাকে অবহিত করা হয়। এর আগে মার্কিন কংগ্রেসম্যান জর্জ মিলারকেও একই বিষয়গুলো অবহিত করা হয়। এছাড়া, সংগঠনটির বর্তমান-সাবেক নেতারা জিএসপি সুবিধা বহালে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, ব্রাজিলসহ বেশ কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। উদ্দেশ্য এসব দেশের বড় বড় ক্রেতাদের শর্ত পূরণে বাংলাদেশ কাজ করে যাচ্ছে এমন তথ্য জানানো। এরই ধারাবাহিকতায় সমপ্রতি সংগঠনের সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডের জেনেভা সফর করেছেন। এসব মিলিয়ে জিএসপি সুবিধা বহাল থাকবে এমন আশা ব্যক্ত করছেন পোশাক শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা।
এবিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী মানবজমিনকে বলেন, মার্কিন কংগ্রেসম্যানদের বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়াকে একটা বিষয় ইন্ডিকেট করে, তা হলো- তৈরী পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশ একটা পটেনশিয়াল ম্যাগনেট দেশ। এই বাজার হারাতে তারা চাইবেন না। আরেকটা বিষয় ইন্ডিকেট করে তা হলো- ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ওয়াল-মার্টসহ বড় বড় ক্রেতাদের বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা। তারা এই দেশকে তৈরী পোশাক উৎপাদনের একটা সেরা গন্তব্যস্থল মনে করে। এছাড়া, ক্রেতারা যে শর্ত দিয়েছে সেগুলো নিয়ে সরকারসহ বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ কাজ করছে। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করলে আমাদের জিএসপি সুবিধা বহালে বেশ খানিকটা আশাবাদী করে তোলে বলে জানান বিজিএমইএ’র এই নেতা। তিনি জানান, কংগ্রেসম্যান ও আইএলও বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। তারা আমাদের কাজ সম্পর্কে জেনেছেন। আশা করছি, তারা ওবামা সরকারের প্রশাসনে ইতিবাচক প্রতিবেদন জমা দেবেন। ইতিমধ্যে আইএলও পজিটিভ মন্তব্য করেছেন। সব মিলিয়ে আমরা ব্যবসায়ী সমাজ জিএসপি সুবিধা বহাল হবে বলে আশা প্রকাশ করছি। বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করায় যে ইমেজ নষ্ট হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনতে বিজিএমইএ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৯৯.৫ শতাংশ শুল্ক দিয়েই প্রবেশ করে ইউএসএ’তে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্ক বাবদ ৭৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছি। তিনি বলেন, তবে আমরা আশাবাদী জিএসপি সুবিধা ফিরে পাবো। জিএসপি সুবিধা যাতে যুক্তরাষ্ট্র স্থগিত না করে সে জন্য এর আগেও জোর চেষ্টা চালিয়ে আসছিল বিজিএমইএ। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। কোন তদবিরে মন গলেনি ওবামা সরকারের। যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে সাময়িকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রভাব না পড়লেও ভবিষ্যতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন পোশাক শিল্প উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে বিশ্ববাজারে দেশের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়েছে- যা পুষিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে যাবে। বিজিএমইএ’র আরেক নেতা বলেন, ইপিজেড এলাকায় ট্রেড ইউনিয়ন না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ দিন ধরেই জিএসপি সুবিধা বাতিল করার হুমকি দিয়ে আসছিল। পরে যুক্ত হয় শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যা ও নোবেল জয়ী ড. ইউনূস। এটা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। টিকফা ও ড. ইউনূসের সঙ্গে সরকারের সমস্যা মিটলে হয়তো বা আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে। তিনি বলেন, রপ্তানিতে যাতে প্রভাব না পড়ে সে লক্ষ্যে খুব শিগগিরই বড় বড় ক্রেতা দেশে বাংলাদেশী পণ্যের প্রচারণা শুরু করা হবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মোতাবেক সরকার ও বিজিএমইএ কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক কাজ করা হয়েছে। আশা করা যায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের শর্তগুলো পূরণ করতে বাংলাদেশ সক্ষম হবে। উল্লেখ্য, তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড ও রানা প্লাজা ধসে ১২ শ’র বেশি শ্রমিক নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে কারখানার কর্ম পরিবেশের উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল ফ্রোম্যান এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে, ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট রপ্তানি করেছে ২৪০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে মোট রপ্তানির ২১ শতাংশ (৫০০ কোটি ডলার)। জিএসপি’র আওতায় বাংলাদেশের বেশ কিছু পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতো, যদিও এর মধ্যে দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরী পোশাক নেই।