গভীর চক্রান্তে পোশাক খাত

20130927-192625.jpg

চতুর্মুখী চক্রান্তগভীর সংকটে পড়েছে দেশের প্রধান শিল্প তৈরি পোশাক খাত। পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে একটি দেশীয় চিহ্নিত গোষ্ঠীকে। নেতৃত্বে আছেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। শ্রমিক অসন্তোষের কলকাঠি নাড়ছে প্রতিবেশী একটি দেশ। লক্ষ্য দেশের বিশ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাতকে ধ্বংস করে দেয়া। কারণ, চীন হাইটেক শিল্পের দিকে ঝোঁকায় পোশাক শিল্পে ওই দেশটির এখন মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পোশাক খাতকে ধ্বংস করতে পারলে বিশ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় অর্ডারই চলে যাবে ওই দেশটির হাতে। এ লক্ষ্যে এবার চতুর্মুখী হামলা শুরু করেছে দেশের এই শিল্প খাতটির ওপর। একদিকে দেশীয় এজেন্ট এনজিওগুলোকে দিয়ে উস্কে দিচ্ছে শ্রমিকদের। শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের। পাশাপাশি তীব্র আক্রমণ করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমের মাধ্যমে। আর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে তাদের এক বিশাল এজেন্ট বাহিনী কর্মরত রয়েছেন।

ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সের (এনএসআই) শিল্প বিভাগের এক কর্মকর্তা ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দখলে নিতে ভারতের একাধিক পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন হচ্ছে। ইতোমধ্যে পরিকল্পিতভাবে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করে এই শিল্পকে রুগ্ন বাননো হচ্ছে। আর রুগ্ন শিল্পগুলোর মালিকানা ভারতীয়রা নিয়ে নিচ্ছে। আর দক্ষ টেকনিশিয়ানের নামে ইতোমধ্যেই আড়াই হাজার ভারতীয়কে দেশের পোশাক খাতে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। এরা কারখানাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। এছাড়া এই খাতের অর্ধেকের বেশি বাইং হাউজের মালিক ভারতীয় নাগরিক।

এদিকে এই খাত ধ্বংশে প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছেন সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা। গত ২১ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহণ মন্ত্রী শাহজাহান খানের উদ্যোগে শ্রমিক সমাবেশ থেকে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন ন্যূনতম ৮ হাজার টাকা করার দাবি জানানো পর থেকে শুরু হয় চলমান শ্রমিক অসন্তোষ। সে সমাবেশে ঘোষণা আসে, ৮ হাজার টাকা বেতন না পেলে গার্মেন্টে একটি মাছিও ঢুকবে না। দাবি মানা না হলে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হয়। তিনি বলেন, জীবন দেব তবু শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব না। রক্ত দেব তবু শ্রমিকদের দাবি থেকে পিছু হটব না। মালিকদের উদ্দেশ্যে শাজাহান খান বলেন, শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতনের দাবি মেনে নিন। তা না হলে একটি মাছিও কারখানায় ঢুকবে না।
এর পরদিন থেকে শুরু হয় গাজীপুর টাঙ্গাইল কালিয়াকৈর, নারায়ণগঞ্জসহ গার্মেন্ট এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ভাঙচুরও অস্ত্রলুটের ঘটনা। শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ হাজার ৬শ টাকা ঘোষণা দেয়ার পর এই অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মজুরি এর চেয়ে বেশি বাড়ানো সম্ভব নয়। তাহলে তাদের ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে। কারণ, ১শ ডলারের পোশাকে ৮০ ডলারই খরচ হয় কাপড়, সুতা ও আনুষঙ্গিক পণ্য আমদানিতে। আর বাকি ২০ ডলার দিয়ে কারখানা ভাড়া, শ্রমিকের বেতন, বিল বাদ দিয়ে নিজেদের লাভ রাখতে হয়। বিশ্লেষকরা বলেছেন, বিদেশি ক্রেতারা প্রতি ১শ ডলারের পোশাকে সাড়ে ৮ ডলার বাড়িয়ে দিলেই পোশাক শ্রমিকদের সকল চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

ন্যূনতম মজুরী প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদি ইনকিলাবকে বলেন, এটি নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজার, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এসব বিষয়ের ওপর। শ্রমিকদের বেতন বাড়লে আমরা খুশি হই- তবে সেটা হতে হবে বাস্তবসম্মত। তা না হলে অনেক প্রতিষ্ঠানই টিকতে পারবে না। ওয়েজবোর্ড যেটা ঘোষণা দেবে আমরা সেটাই বাস্তবায়ন করবো। এখন সকলের উচিত কাজে মনোযোগ দেয়া। কারণ সামনে পবিত্র ঈদুল আযহা রয়েছে।

এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ তুলেছেন, ক্ষমতাসীন দলের একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশী-বিদেশী চক্র গার্মেন্ট সেক্টর ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে। এই সেক্টর দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, দেশের অগ্রগতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অথচ এই সেক্টরটি বন্ধ করতে, ধ্বংস করতে দেশী-বিদেশী চক্র উঠে পড়ে লেগেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক মিডিয়াকেও লাগিয়ে দেয়া হয়েছে দেশের পোশাক খাতের বিরুদ্ধে। তারা প্রতিবেদন ও সম্পাদকিয় করছে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিক শোষণের। শ্রমিকদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ফেডআপ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সম্পাদকিয় লিখেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। এছাড়া বিবিসি’ও শ্রমিকদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে সংবাদ প্রচার করছে। অথচ এরা বলছে না, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বাড়তি দামে বাংলাদেশ থেকে পোশাক কিনতে। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা প্রতিট পোশাক ৪শ থেকে ৫শ গুণ পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি করে। বাংলাদেশ থেকে একটি পোশাক ১ ডলারে কিনলে সেটি ইউরোপ-আমেরিকার দোকানে বিক্রি হয় ৪শ থেকে ৫শ ডলারে। বিপুল অঙ্কের লাভ করলেও এদের বাড়তি দাম দেয়ার জন্য চাপ না দিয়ে উল্টো বাংলাদেশের গার্মেন্ট মালিকদের ওপর চাপ দিচ্ছে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাত ধ্বংসের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তারা এসব কাজ করছে।

তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেছেন, পোশাকশিল্প ধ্বংসে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে দেশীয় ও বিদেশী গণমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, যা এই শিল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং এই শিল্পের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়ার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস সমিতি (বিটিএমএ) যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

বাংলাদেশ এক্সপোর্টারস এসোসিয়েশন (ইএবি) সভাপতি ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, সম্ভাবনাময় পোশাক শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে। কেবল পোশাকশিল্প মালিকরা উদ্যোগ নিলেই এই শিল্পকে ধরে রাখা যাবে এটা ঠিক না। আমাদের অনেক ক্রেতাই ভারতের দিকে ঝুঁকছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। অনেক গার্মেন্ট মালিক অভিযোগ করে জানান, বেতন ভাতা পরিশোধ রয়েছে এমন গার্মেন্টও চলছে শ্রমিক অসন্তোষ। কারা এর ইন্ধন দিচ্ছেন তাও খুঁজে বের করা যাচ্ছে না।
গার্মেন্টসেক্টরর গুরুত্বপূর্ণ পদে অনেক ভারতীয় নাগরিকরা রয়েছেন এ বিষয় স্বীকার করে বিকেএমইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম জানান, বিভিন্ন সংকটের কারণে যে শিল্পগুলো রুগ্ন হয়ে পড়েছে তার বেশির ভাগ মালিকানা ভারতীয় নাগরিকরা নিয়ে নিয়েছেন। তবে শুধু ভারতীয়রা নয় অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও মালিকানা নিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের দক্ষ শ্রমিকের সংকটের কারণে বিদেশীরা এ সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই ভারতীয় নাগরিক বলে তিনি স্বীকার করেন।

এভাবে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করে ইতোমধ্যে এসকিউ, ক্রিস্টাল, মাস্টার্ড, হলিউড, শান্তা, রোজ, ফরচুনা, ট্রাস্ট, এজাক্স, শাহরিয়ার, স্টারলিং ও ইউনিয়নের মতো গার্মেন্টগুলো ক্রয় করে নিয়েছে ভারতীয় নাগরিকরা।
বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের তালিকাভুক্ত বায়িং হাউজের সংখ্যা ৮৯১টি। এর বাইরে আরো কয়েকশ বায়িং হাউস আছে। বায়িং হাউজগুলোর ৮০ থেকে ৯০ ভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন ভারতীয় নাগরিকরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর অভিজাত এলাকাগুলোতে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বায়িং হাউজের রমরমা ব্যবসা করছেন তারা। বিভিন্ন সময় পর্যটক হিসেবে এরা বাংলাদেশে এলেও আর ফিরে যান না। বিদেশী বায়ারদের হাতে নিয়ে তারা এক রকম জিম্মি করে ফেলেছেন বাংলাদেশের পোশাক খাতকে।

বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক মাসে ভারতীয় নাগরিকরা বাংলাদেশের ৩৫টি তৈরি পোশাক কারখানায় ৮ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশে কারখানা খুলে বসা ভারতের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে শাহী এক্সপোর্টস, হাউজ অব পার্ল ফ্যাশনস, জে জে মিলস, আমবাত্তুর ক্লথিং ইত্যাদি।

কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক ডি কে নায়ার ভারতীয় একটি সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রম ব্যয় এক-তৃতীয়াংশ। ভারতে একেকজন শ্রমিকের মাসিক মজুরি গড়ে ৭ হাজার রুপি। সেখানে বাংলাদেশের ব্যয় হচ্ছে আড়াই হাজার রুপির মতো। নায়ার জানান, ইতোমধ্যে ৩৫টির বেশি পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের কারখানা খুলেছে যার বেশিরভাগই চালু রয়েছে।

৬ দিনে ৫শ কোটি টাকার ক্ষতি
টানা ৬ দিনের গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও কারখানা বন্ধ থাকায় ৫ বিলিয়ন টাকা ক্ষতি হয়েছে। সাভার, আশুলিয়া, গাজিপুর এবং নারায়ণগঞ্জ এলাকায় শত শত গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে রাস্তায় নেমে এলে বাধ্য হয়ে মালিকরা কারখানাগুলো বন্ধ করে দেন। এর ফলে বিদেশি ক্রেতাদের সময়মত পোশাক সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে ২ হাজার গার্মেন্ট। বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলে যেতে শুরু করেছে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এমনকি মিয়ানমারে।

বিজিএমইএ বলছে, উৎপাদনজনিত ক্ষতি ৩শ কোটি টাকা হলেও শিপমেন্ট রক্ষায় উড়োপথে সরবরাহ ঠিক রাখতে হলে তাদের আরো ২শ কোটি টাকা অতিরিক্ত গুনতে হবে। বিজিএমইএ’র হিসেবে গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার গার্মেন্ট কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
চরম দুঃসময়ে কবলে গার্মেন্ট শিল্প
বাংলাদেশের অস্থিতিশীল পরিস্তিতিতে পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক বাজারে নেতৃত্ব নিতে বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ভারত। এ খাতের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ চীন তার অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়ায় বিষয়টি ভারতের জন্য সহজ হচ্ছে। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশে রানা প্লাজার সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাসহ ধারাবাহিক শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় চলে যাচ্ছে। এ দুই সুযোগ কাজে লাগাতে অনেকটা মরিয়া হয়ে উঠেছে ভারত। এরই মধ্যে দেশটি গার্মেন্ট খাতের সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে।
এরপরও পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের চেয়ে এখনও অব্যাহতভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে ভারত। তাই এই খাত দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে দেশটি। গেল ডিসেম্বরে ভারতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ মাসে ভারতের পোশাক খাতের রপ্তানি ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ কমে ৫২৬ কোটি ডলার হয়েছে। শুধু আগস্ট মাসে ৭ দশমিক ২০ শতাংশ কমে এ খাতের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছিল ৯৮ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতের রপ্তানি আয় গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত এক বছরে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ (প্রায় ১৩৬ কোটি মার্কিন ডলার) বেড়েছে। এছাড়া, সর্বশেষ ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে গার্মেন্ট রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ (৬৬০ কোটি ডলার)। এর বিপরীতে ভারতের অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের (এইপিসি) তথ্যমতে, ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের পোশাক রপ্তানি খাতে আয় এক বছরে ০ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে (প্রায় ৯১ কোটি ডলার)। এছাড়া, ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ভারতের পোশাক রপ্তানি আয় ৯ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে (প্রায় ৭২০ কোটি ডলার)। পোশাক শিল্প খাতে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার কারণে শুধু তৈরী পোশাক রপ্তানির জন্য অ্যাপারেল পার্ক তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটির সরকার। অনুমোদন পাওয়া ১২টি অ্যাপারেল পার্কের মধ্যে চারটির কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশে শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। অন্যদিকে চীন শ্রমঘন খাত থেকে সরে আসছে। বর্তমানে চীন ভারতের চেয়ে ১০ গুণ বেশি রপ্তানি করে। এর ১০ শতাংশও যদি ভারতে আসে, তাহলে আমাদের তৈরী পোশাক রপ্তানি দ্বিগুণ হয়ে যাবে। অন্যদিকে তৈরী পোশাক খাতে চীনের ছেড়ে দেয়া বাজার ধরার সামর্থ্য রাখে একমাত্র বাংলাদেশ। কিন্তু খাতটিতে অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে এর সুযোগ নিতে চাইবে অন্য দেশগুলো। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে ভারত। ভারত সামর্থ্য বাড়াতেই পারে। তবে এটাও ঠিক, বিদেশী ক্রেতারা খুব সহজেই বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে না। শ্রম সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সামলাতে পারলে বাংলাদেশ খুব সহজেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে। বিজিএমইএ’র নির্বাচিত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তৈরি পোশাকশিল্পে বাংলাদেশের দুর্বলতার সুযোগ যেকোন দেশই নিতে চাইবে। ভারতের সামর্থ্যই এক্ষেত্রে বেশি। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো অনেক বেশি নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে; যা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।
ওদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ৩৭ শতাংশ তৈরি পোশাক রপ্তানি করে এ খাতে শীর্ষে রয়েছে চীন। ৫ শতাংশ রপ্তানি করে এর পরের অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে শ্রমঘন শিল্প থেকে সরে এসে হাইটেক ও সংবেদনশীল পণ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে চীন। এটা ধরার চেষ্টায় রয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত।”

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন জানান, আমাদের কাছে মনে হচ্ছে নির্বাচনকে সামনে রেখে গার্মেন্ট খাত নিয়ে অনেক ধরনের মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে। এটিকে কেন্দ্র করে দেশী-বিদেশী স্বার্থান্বেষী বিভিন্ন মহল নানাভাবে অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এ কাজে শ্রমিক নামধারী বহিরাগতদের ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক কারণে শ্রমিকদের পুঁজি করে তারা ভোটের রাজনীতি করছেন। তারা মালিকদের কাছ থেকে দাবি আদায়ের এটি অন্যতম সময় বলেও মনে করছেন। এ বিষয়ে তিনি সবাইকে চোখ-কান খোলা রাখারও আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, অন্যান্য খাতে শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটি নিয়ে ফলাও করে লেখা হচ্ছে। কিন্তু ওইসব খাতের কোনোটিই নিয়মিত নয় এবং সারাবছর ধরে চলে না। গার্মেন্ট খাত একটি নিয়মশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। তাই চাইলেই এক লাফে অনেক মজুরি বাড়িয়ে দেয়া যায় না। সরকার, শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা যারাই রয়েছেন সবাইকেই দেশীয় প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তাদের বাস্তবতাও বুঝতে হবে। তিনি জানান, একদিকে লোডশেডিং বিড়ম্বনায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রোডাক্ট কস্ট বেড়েছে আগের তুলনায় ১৩ শতাংশ। ইউনিট কস্ট বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এর সঙ্গে আবার সোর্স ট্যাক্সও বেড়ে গেছে ৩৪ শতাংশ। তার পর আবার শ্রমিকের ব্যয়ও বেড়েছে। তবু আমরা চাই একটি সিস্টেমের মধ্য দিয়ে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে।