শেষ মুহূর্তের অংক কষছে দুই জোট

12 Oct, 2013

দেশের রাজনীতিতে এখন শেষ সময়ের হিসাব-নিকাশ চলছে। চলছে বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে রাখার তীব্র প্রতিযোগিতা; পাশাপাশি পরস্পরকে চাপে রাখার কূটকৌশল। এর সূত্র ধরেই আওয়ামী লীগবিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চরম আকার ধারণ করেছে।
দেশের সার্বিক এ পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল অস্বস্তিকর বলে মনে করছেন। তাদের মতে, সমঝোতার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানের মতে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় এখন হিসাব মিলিয়ে দেখছে কোনটিতে তাদের লাভ। এজন্যই কেউ তারা মাঠ ছাড়তে চাইছে না; ছাড়ও দিতে চাইছে না। ফলে দেশে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি হয়েছে।
একেবারে শেষ সময়ে এসেও সমঝোতা না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রবীণ রাজনীতিক দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, আমরা কবে একমত হয়েছিলাম? ওয়ান-ইলেভেন পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গতবারও ব্যর্থ হয়েছি, এবারও সে পথেই আছি। তবে ’৯৬-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারই একমাত্র শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, এখন পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হলেও এক সময় স্বস্তিকর হবে। সমঝোতার ব্যাপারে এখনও আশাবাদী বলেও জানান তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপি এখন পর্যন্ত একবারও বলেনি তারা সমঝোতার বিপক্ষে। কিন্তু সরকারই নানা হিসাব কষে ভয় পাচ্ছে। ফলে তারা ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে চাইছে। কিন্তু এ সুযোগ তো আর হবে না। কারণ বিএনপির পক্ষে জনগণ আছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সমঝোতার কোনো লক্ষণ নেই। কারণ বিএনপির প্রত্যাশা থাকলেও সরকারি তরফে এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেই। বরং ক্ষমতা সংহত করার জন্য সরকার নানাভাবে তৎপর। ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে কী হবে আবার না থাকলে কী পরিস্থিতি দাঁড়াতে পারে এমন হিসাব-নিকাষ এখনও ক্ষমতাসীন মহলে চলছে। তবে দুটির যে কোনো অবস্থানেই হোক মেয়াদের শেষ ভাগে রাজনীতির মাঠ তারা দখলে রাখতে চাইছে। দলটির নেতাকর্মীদের মতে, মাঠ ছেড়ে দিলে বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজত তা দখল করে নেবে। আর একবার দখল করতে পারলে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। এ কারণেই ২৫ অক্টোবর ঢাকায় জনসভা ডাকা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনেও সরকারের ক্ষমতা সুসংহত করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। শীর্ষ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে যেখানে যাকে পদোন্নতি ও পদায়ন করা দরকার শেষ মুহূর্তে সরকার এ কাজটি সেরে ফেলছে। সার্বিকভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের খুশি করতে নেয়া হচ্ছে একের পর এক ব্যবস্থা। কঠোর বক্তৃতা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। এদিকে ‘সরকার সচল’ আছে এমন বার্তা জনগণকে দিতেই সংসদ অধিবেশন চালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছে সরকার। বলা হচ্ছে, সংসদ সচল থাকলে সরকারের নির্দেশ প্রশাসন মানতে বাধ্য হবে।
পাশাপাশি বিএনপিকে যত ধরনের চাপে রাখা যায় সে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। বিএনএফ নামের অখ্যাত একটি সংগঠনকে রেজিস্ট্রেশন এবং প্রতীক হিসেবে তাদের ধানের গাছ দেয়ার উদ্যোগ, কাউন্সিল করতে বিএনপিকে সময় না দেয়ার চিন্তা এসবই দলটিকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া আতঙ্ক ছড়াতে সারা দেশে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, আন্দোলন ঠেকাতে ব্যাপকভাবে গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করা হবে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলার অগ্রগতিও হচ্ছে দ্রুতগতিতে।
অন্যদিকে সরকার নৈতিকভাবে পরাস্ত হয়েছে এমন এক ধরনের ‘বার্তা’ মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপি জনগণকে দিতে চায়। তাই এরকম একটি প্রেক্ষাপট তৈরিতে দলটি সব ধরনের কৌশল নিয়েছে। সরাসরি হাতে না থাকলেও অভ্যন্তরীণভাবে বিভিন্ন বার্তা দিয়ে প্রশাসনকে ‘নিরপেক্ষ’ করতে তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবেক আমলাদের একটি গ্র“প এ নিয়ে কাজ করছে। ৬ অক্টোবর সিলেটের জনসভায় খালেদা জিয়া সরকারের অনৈতিক সিদ্ধান্ত না মেনে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র মতে, বিগত ওয়ান-ইলেভেনের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে কূটনীতিকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে চলছে বিএনপি। সরকারের সঙ্গে অনাস্থার সম্পর্ক বর্ণনা করে তারা নির্দলীয় সরকারের যৌক্তিকতা কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরছেন। যে যে কারণে ওই সময় বিএনপির সঙ্গে কূটনীতিকদের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল; সেই কারণগুলোকে তারা সামনে নিয়ে আসছেন।
এদিকে রাজনৈতিকভাবে সরকারকে চাপে রাখতে চাইছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। এ জোটের নেতাকর্মীরা মনে করে, জনমত তাদের পক্ষে। ফলে ব্যাপক লোক সমাগমের মাধ্যমে ঢাকাসহ সারা দেশে ‘গণঅভ্যুত্থান’ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় তারা। একটি সূত্রের মতে, ঢাকাকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। এজন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেই ইতিমধ্যে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেয়া শুরু করেছেন। এছাড়া জেলা নেতাদের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্দোলনের ছক তৈরি করতে বলা হয়েছে। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসসহ দেশে প্রবীণ বেশকিছু বুদ্ধিজীবীকে তারা পক্ষে রাখার চেষ্টা করছে। এদের অনেকের সঙ্গে খালেদা জিয়া নিজেই সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে বিএনপি। উদ্দেশ্য হল, শেষ সময়ে তারা যাতে সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেয়।
সূত্র মতে, দাঁতের চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা ছিল ঈদের পরে। কিন্তু ২৪ অক্টোবরের পরে ‘খারাপ’ পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি ঈদের আগেই সিঙ্গাপুরে গেছেন। এছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বেশ কয়েকজন নেতার বিদেশ সফর বাতিল করা হয়েছে।
উৎসঃ   যুগান্তর