আংটির সাতকাহন

Ringপ্রাচীন আমল থেকে এখন পর্যন্ত নারী-পুরুষের পরিধেয় অলঙ্কারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আংটি। কালের বিবর্তনে সেই আংটিতে এসেছে বৈচিত্র্য। কিন্তু এর ব্যবহার কোনো কালেই থেমে থাকেনি। প্রায় তিন হাজার বছর আগে এর প্রচলন শুরু হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে প্রায় ৩ হাজার বছর পূর্বে ফারাও রাজারা প্রথম আংটির ব্যবহার শুরু করে। সে সময় তারা আলে প্যাপিরাসের পাতা জড়িয়ে আংটি হিসেবে ব্যবহার করত। কালক্রমে রোমান, গ্রিক ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে বিয়ের বন্ধনে নারীকে আংটি পরিয়ে দেয়ার প্রচলন শুরু হয়। পরে বিংশ শতাব্দী থেকে পুরুষরাও বিয়েতে আংটি পরা শুরু করে।

Fashion Ring Ekush.infoআংটি বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে যেমন ক্লাডা, এটারনিটি, বার্থরিং, ককটেল, আরমোর, কাব্বালা, মুড রিং, থাম্ব রিং, টো রিং ইত্যাদি। ক্লাডা রিং এ কিউপিডের ওপর মুকুটের নকশা থাকে। এখানে কিউপিড ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এবং মুকুট আনুগত্যের পরিচয় বহন করে। এই আংটি ডান হাতে পরা মানে তার সঙ্গে এখনো কারো সম্পর্ক হয়নি। তবে ডান হাতে কব্জির দিকে কিউপিডের ধারালো অংশ রাখা মানে তার সঙ্গে কেউ সম্পর্কযুক্ত রয়েছে। আবার ধারালো দিক বা হাতের আঙ্গুলের দিকে রাখা মানে তার বাগদান সম্পন্ন হয়েছে। ধারালো দিক কব্জির দিকে থাকা মানে তিনি বিবাহিত।এটারনিটি রিং বিয়েতে পরানো হয় যেখানে সোনার মধ্যে চারদিকে ছোট ছোট ডায়মন্ড বসানো থাকে। আজকাল এই বিয়ের আংটিতে স্বামী-স্ত্রীর নাম খোদাই করা থাকে। এই রিং পরানোর মূল উদ্দেশ্য আমৃত্যু একসঙ্গে ভালোবেসে বসবাস করার প্রতিশ্রুতি। তবে আজকাল তরুণীদের সবচেয় বেশি পছন্দ ককটেল রিং। পাথর বা বিভিন্ন সিনথেটিক উপাদান দিয়ে আংটিগুলো বানানো হয়। এসব আংটিতে ওপরের ডিজাইনটা বেশ বড় থাকে। আমাদের দেশে মুঘল আমলে এই ধরনের আংটির প্রলন ছিল। আরমোর রিং মূলত আঙ্গুলের মাঝামাঝি অংশে পরা হয়।

Fashion Ring 2 Ekush.infoআজকাল তরুণীদের ফ্যাশন অনুষঙ্গে আরমোর রিংয়ের বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। কাব্বালা রিং পঞ্চধাতু নামেও পরিচিত। এই আংটিতে সোনা, রুপা, তামা, টিন ও লেড-এই পাঁচ ধরনের ধাতু মেশানো থাকে। অনেকে এই আংটিকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে। মুড রিং মানুষের আবেগ অনুযায়ী রং পরিবর্তন করে। মূলত আবেগের কারণে মানবদেহে যে হরমন নিঃসরণ ও তাপমাত্রার পরিবর্তন হয়, সে অনুযায়ী এই আংটি রং বদলায়। এ ছাড়া বৃদ্ধাঙ্গুলে কিছুটা বড় আকৃতির থাম্ব রিং এবং পায়ে টো রিং পরা হয়। প্রাচীন মিসর সভ্যতায় এই দু’ধরনের আংটির ব্যবহারের নজির পাওয়া গেছে। তবে যেই আংটিই পরা হোক না কেন তার আগে হাত পা ভালো করে পরিষ্কার করে ফাইল করে নিতে হবে। আংটির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নখে নেইলপলিশ এবং হাতে চুড়ি বা ব্রেসলেট পরতে পারেন। বার্থরিং সাধারণত জন্মলগ্ন, জন্মতারিখ, জন্মসংখ্যা ইত্যদির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়। এই আংটির ব্যবহার সম্পূর্ণ নির্ভর করে বিশ্বাসের ওপর।নারীরা সোনা, রুপা, সাদা সোনা বিভিন্ন মেটালের আংটি পরে থাকেন। এতে ডায়মন্ড, পান্না, নীলাসহ বিভিন্ন পাথরের ডিজাইন থাকতে পারে। তবে পুরুষদের জন্য মসৃণ রুপার আংটিই আদর্শ। তবে আংটি স্টিল, লোহা, প্লাস্টিক, কাঠ, হাড়, কাচ বা পাথরেরও হতে পারে। এ সবই নির্ভর করে যার যার পছন্দের ওপর।

Ring in Different Fingers Ekush.infoবিভিন্ন আঙ্গুলে আংটি পরার আবার রয়েছে ভিন্ন অর্থ। যেমন বৃদ্ধাঙ্গুলে আংটি পরাকে ব্যক্তির প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে তুলে ধরে। এই আঙ্গুলে রুবি বা গার্নেড পাথর ব্যবহার করা হয়। তর্জনীকে আংটি পরাকে ব্যক্তির যোগ্য নেতৃত্ব, ক্ষমতা ও উচ্চাকাক্সক্ষাকে বোঝায়। এ জন্য আগেরকার দিনের রাজা-রানীরা তর্জনীতে আংটি পরতেন। তর্জনীতে সাধারণত এমেথিস্ট এবং টোপাজ ব্যবহার করা হয়। মধ্যমার আংটি ব্যক্তিত্ববোধ ও ভারসাম্য জীবনকে ফুটিয়ে তোলে। বলা হয় এই আঙ্গুলে আংটি পরলে ভুল ও সঠিকের মধ্যে পার্থক্য করতে যায়। মধ্যমায় সাধারণত কোরাল পাথর পরা হয়। তবে বিয়ের রিং বা হাতের অনামিকায় পরানো হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে দেখা গেছে এই আঙ্গুলের সঙ্গে সরাসরি হৃদয়ের সংযোগ রয়েছে বা হাতের অনামিকায় আংটি পরাকে সৃষ্টিশীলতা ও আবেগের পরিচয় বহন করে এবং ডান হাতে পরাকে ব্যক্তির আশাবাদী মনোভাবকে বোঝায়। এ আঙ্গুলে মূলত জেড ও মুনস্টোন ব্যবহার করা হয়। কনিষ্ঠায় আংটি পরার অর্থ সুব্যবহার ও সুসম্পর্ক স্থাপন। সেটা পারিবারিক, সামাজিক এমনকি ব্যবসায়িক সম্পর্কও হতে পারে। আমাদের দেশে নতুন বউ বা সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর মুখ দেখে সোনার আংটি দেয়ার রীতি প্রচলিত আছে। আংটি যেন শুধু উপহার নয় বরং যুগ যুগ ধরে সম্পর্কের বন্ধনকে জোড়ালো করারই প্রতিশ্রুতি।