সৌদির নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েও তা প্রত্যাখ্যান করে সৌদি আরব এক নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিলো। বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমাগত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত শুক্রবার ঐ সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান করে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, সবার আগে প্রয়োজন জাতিসংঘের সংস্কার। সিরিয়া ও ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকট নিরসনে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে সৌদি আরব জানায়, এর জন্য বিশ্বসভার সর্বোচ্চ এ পরিষদের অসম নীতি দায়ী। তবে রিয়াদের এমন সমালোচনা নতুন না হলেও নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানে জাতিসংঘের কূটনীতিকরা রীতিমতো হতবম্ভ ও বিস্মিত।

সাধারণত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দশটি অস্থায়ী সদস্য পদের জন্য বড় ধরনের নির্বাচন যুদ্ধে নামতে হয় সদস্যদের। জাতিসংঘের শীর্ষ পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের পাশে থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দু’বছরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার এটা একটা বিরাট সুযোগ। প্রতিবছরই সাধারণ অধিবেশনে ভোটাভুটির মাধ্যমে পাঁচটি দেশকে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার বিশ্বসংঘের ৬৮তম সাধারণ অধিবেশনে সৌদি আরব, চাঁদ, চিলি, লিথুনিয়া ও নাইজেরিয়াকে নির্বাচিত করা হয়। এমন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যপদ পাবার একদিন পরই তা প্রত্যাখ্যান করলো সৌদি আরব। জাতিসংঘে নিযুক্ত ফরাসি কূটনীতিক গেরার্ড আরাউদ তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, ‘আমরা জানি, সৌদি আরব নিরাপত্তা পরিষদে খুবই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু আমরা ঐ দেশের হতাশার যন্ত্রণাটাও বুঝি। বাস্তবতা হলো, নিরাপত্তা পরিষদ এমন অকার্যকর গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে’। রাশিয়া বলেছে, সৌদি আরব তাদের হতবাক করে দিয়েছে। বিশেষ করে সিরিয়া ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের সমালোচনায় তারা বিস্মিত।

তবে সৌদি আরবের এমন হতাশা নতুন বা আকস্মিক নয়। বরং বহু বছর ধরে পুঞ্জিভূত হতাশার দ্বিতীয় বহি:প্রকাশ। এর আগে একই ধরনের হতাশা ব্যক্ত করে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিতে অস্বীকৃতি জানান সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স সৌদ আল ফয়সাল। সৌদি আরবের এই হতাশা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ইস্যুতে। বিশেষ করে শিয়া অধ্যুষিত দেশ ইরান ও সিরিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন মোটেই পছন্দ নয় রিয়াদের রাজ প্রশাসনের। ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের জের ধরেই হয়তো কথা ছিলো ইরানকে যেভাবেই হোক কোণঠাসা করে রাখার। ইরান ও ইসরাইলকে ইঙ্গিত করে সৌদি আরবের তাই অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যকে পরমাণু অস্ত্রসহ গণবিধ্বংসী অস্ত্র মুক্ত করার ক্ষেত্রেও চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। একই সাথে বিগত ৬৫ বছর ধরে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক বার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। অমীমাংসিত ও স্পর্শকাতর এ বিষয় এখনও বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি। রিয়াদের অভিযোগ, এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে জাতিসংঘ।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে সৌদি আরব দায়ী করছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ডাবল স্ট্যান্ডার্ডস’ বা ‘আন্তর্জাতিক বৈষম্য নীতি’কে। ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে ইসরাইল সেখানে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেও অবহেলিত থেকে গেছে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৈষম্য নীতির কারণে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এ ইস্যুতে সীমাহীন দীর্ঘ শান্তি আলোচনা। জাতিসংঘের এমন ব্যর্থতায় ক্ষোভ যেন শেষ সীমায় পৌঁছেছে সৌদি আরবসহ গোটা আরব বিশ্বের। বিশ্লেষকরা বলছেন, রিয়াদের অভিযোগ মূলত: যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে। কারণ বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের জন্য তাদের মায়াকান্না দেখা গেলেও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার পক্ষে তাদের প্রতিশ্রুতির কোন বাস্তবায়ন নেই।

ফিলিস্তিন সমস্যার সাথে জড়িয়ে আছে ইরান ও সিরিয়া ইস্যু। ঐ অঞ্চলে ইরানের উত্থান স্বাভাবিকভাবেই সৌদি আরবের মাথাব্যথার কারণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ইরান গোটা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের যে বিষয়টি বুঝিয়েছে, সেটা হলো এর জন্য দায়ী সুন্নী রাষ্ট্র সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রের গানে ঠোঁট মেলানো ছাড়া তার কোন উপায় নেই। তাই ইরানই ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানে মূল প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে।

একদিকে, লেবাবনের শিয়া গেরিলা গোষ্ঠী হিজবুল্লার সাথে ইরানের সখ্যতা, অন্যদিকে সিরিয়ার শিয়া একনায়ক বাশার আল আসাদের সাথে দহরম মহরমে দারুণ অস্বস্তিতে সৌদি আরব। পরমাণু ইস্যুতে ইরানকে শায়েস্তা না করে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় যাওয়ার পদ্ধতিটা সম্ভবত রিয়াদের পছন্দ হয়নি বলেও মনে করছেন অনেকে। রিয়াদ সিরিয়ার বিদ্রোহীদের পূর্ণ সমর্থন ও সহায়তা দিয়ে আসলেও শেষ মুহূর্তে যেন দামেস্ক ও তেহরানকে কোণঠাসা করার সে উপায়টাও যেন হাতছাড়া হয়ে গেলো। লক্ষাধিক মানুষ হত্যা করলেও আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি নিরাপত্তা পরিষদ। বরং রাসায়নিক অস্ত্র সমর্পণের প্রস্তাব দিয়ে সব কিছুই যেন ভণ্ডুল হয়ে গেলো। রাতারাতি খলনায়ক থেকে নায়কে পরিণত হলেন প্রেসিডেন্ট আসাদ।

এ সব কারণে সৌদি সরকার মনে করছে, সবার আগে দরকার নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার। মূলত জাতিসংঘের এই সংস্কার চায় নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ছাড়া অনেকেই। স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও চীনের আশঙ্কা, বহু আকাঙ্ক্ষিত সংস্কার হলে বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্য ও ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে। বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন খেলোয়াড়ের আমদানি ঘটবে। আর এর ফলে খোদ জাতিসংঘই তার বৈধতা ও নির্ভরযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে।

ঘটনার পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়ানোই সৌদি আরবের রাজনৈতিক ঐতিহ্য। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে এভাবেই নিজের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হাসিল করে থাকে দেশটি। বিশেষ করে জি-টুয়েন্টির সদস্য হিসেবে গত কয়েক বছরে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরো জোরদার করতে সক্ষম হয় ওয়াশিংটনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র রিয়াদ। এছাড়াও সৌদি আরবের একজন নাগরিক ইসলামি সম্মেলন সংস্থা-ওআইসি’র প্রধান হচ্ছেন, এ বিষয়টিও একরকম নিশ্চিত। তা সত্ত্ব্বেও সৌদি আরবের এমন ক্ষুব্ধ অবস্থান বা কৌশলে নিরাপত্তা পরিষদ দ্রুত সংস্কার হবে, এমনটা ভাবাটা হয়তো অতিরঞ্জিতই হবে।