গার্মেন্ট মালিকদের ১৫ দিনের আলটিমেটাম

অর্থনৈতিক রিপোর্টার: পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫৩০০ টাকা করায় মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে পোশাক শিল্পের দুটি শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ। তারা জানিয়েছে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মজুরি বোর্ড মালিক পক্ষের দেয়া প্রস্তাব ৪৫০০ টাকা না মানলে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশের সব কারখানা বন্ধ রাখা হবে। গতকাল বিজিএমইএ’র নিজস্ব ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এ হুমকি দেয় মালিকদের শীর্ষ দু’টি সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। সংগঠন দু’টি যৌথভাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনের আগে মালিকদের মতবিনিময় সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান বিজিএমই সভাপতি আতিকুল ইসলাম। এতে বিকিএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমানও উপস্থিত ছিলেন।
বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, মজুরি বোর্ডের দেয়া ৫৩০০ টাকা প্রস্তাব এ শিল্পের জন্য অত্যন্ত আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে এর তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। একই সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান  করছি। তিনি বলেন, যখন রানা প্লাজার ধস কাটিয়ে উঠছি ঠিক তখনই এ অযৌক্তিক প্রস্তাব দেয়া হলো। আজ এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে বলে জানান বিজিএমইএ সভাপতি।
তিনি বলেন, মালিকপক্ষ প্রস্তাবিত ন্যূনতম মজুরি ৪,৫০০ টাকার বেশি করা হলে এবং আপিলে সাড়া না পেলে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে। তিনি জানান, কারখানা বন্ধ মালিক পক্ষ রাখলেও ওই দিনের জন্য শ্রমিকদের কোন বেতন দেয়া হবে না। এছাড়া ওইদিন যদি কোন মালিক কারখানা খোলা রাখেন, তাদের বিজিএমইএ-র সব সুযোগ সুবিধা বাতিলসহ লাইসেন্সও বাতিল করা হবে বলেও হুমকি দেন তিনি।
বিজিএমইএ মনে করে, শিল্পের জন্য একটি আত্মঘাতী প্রস্তাব দেয়া হয়েছে যা কোনমতেই বাস্তবসম্মত, গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক নয়। শিল্পের প্রকৃত পরিস্থিতি ও সামর্থ্য বিবেচনায় না নিয়ে এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সংগঠনটির মতে, তাজরিন ও রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির প্রেক্ষিতে আমরা যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৃষ্ট সঙ্কট মোকাবেলায় ব্যস্ত. সেই সঙ্গে শিল্পকে নিরাপদ, ঝুঁকিহীন ও কমপ্লায়েন্ট করার মহাসংগ্রামে লিপ্ত হয়েছি, ঠিক সেই সময়ে একটি অযৌক্তিক মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে, যা কোনভাবেই কাম্য নয়। অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী, প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা দিয়ে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে তা হয়নি। বিজিএমইএ’র মতে, প্রস্তাবিত মজুরি বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের প্রান্তিক উৎপাদনশীলতার সমতুল্যের চেয়ে অনেক বেশি।
চীন ও ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে আতিকুল ইসলাম বলেন, চীন ও ভিয়েতনামের  উদ্যোক্তারা চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসহ নানা সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু এ দেশে তা পাচ্ছি না। এখানে ১০ ঘণ্টার মধ্যে ৬ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটর চালানোর জন্য জ্বালানি বাবদ মাসে অতিরিক্ত ৭-১০ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়, চীন ও ভিয়েতনামে যা করতে হয় না। ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৮%-২০%, সেখানে চীনে সুদের হার ৬.৫০%। গত ২ বছরে পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জন্য উদ্যোক্তাদেরকে প্রতি বছরে ১৮ রকমের ডকুমেন্ট পুনঃনবায়ন করতেও বড় রকমের অর্থের খেসারত দিতে হয়।
এ অবস্থায় ন্যূনতম মজুরি ৫৩০০ টাকা মানতে অপারগতা জানিয়েছেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র সদস্যরা। তারা বলেছেন, মজুরি কাঠামো চাপিয়ে দেয়া হলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। তবে একটি এক্সিট পলিসি বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে জানান বিজিএমইএ সভাপতি। তিনি বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, শিগগিরই নিজ নিজ সদস্যদের একটি সার্কুলার পাঠানো হবে। এতে উল্লেখ থাকবে কে কে ব্যবসা ছেড়ে দিতে চায়। আগ্রহীরা শ্রমিক সংখ্যাসহ তাদের নাম বিজিএমইএ/বিকেএমইএ কর্তৃপক্ষ বরারবরে ডাটা পাঠাবে। তিনি বলেন, আরও সিদ্ধান্ত হয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ডের কাছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র লিখিতভাবে আপত্তি জমা দেয়া হবে। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ বিষয়ে সরকার প্রধানের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে।
বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান বলেন, দেশের সব পোশাক শিল্প মালিকদের সক্ষমতা সমান নয়। ফলে যাদের অনেক বেশি সীমাবদ্ধতা রয়েছে তাদের পক্ষে কোনভাবেই পোশাক কর্মীদের ন্যূনতম বেতন ৫৩০০ টাকা দেয়া সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, সোমবার মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান এ কে রায় পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫৩০০ টাকা ঘোষণা দেন। তখন মালিকপক্ষ এ ঘোষণার বিরোধিতা করে। মালিকপক্ষের আশরাফুজ্জামান দীপু এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহীউদ্দিন এ ঘোষণা প্রস্তাবে স্বাক্ষর না করে বৈঠকস্থল ত্যাগ করেন। বোর্ডের ঘোষণা অনুযায়ী, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির মধ্যে বেসিক বেতন হবে ৩,২০০ টাকা, বাসাভাড়া ১২৮০ টাকা, চিকিৎসা খরচ ধরা হয়েছে ৩২০ টাকা, যাতায়াত ২০০ টাকা। অন্য খরচ ধরা হয়েছে ৩০০ টাকা। এ কে রায় বলেন, ভোটাভুটির মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫৩০০ টাকার সুপারিশ করা হয়েছে। গেজেট প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে যে কোন পক্ষ তাদের মতামত দিতে পারবে। মতামত পেলে আবারও আলোচনা হবে। কোন মত না থাকলে বোর্ডের পক্ষ থেকে ১৫ দিন পর শ্রম মন্ত্রণালয়ে এ সুপারিশ জমা দেয়া হবে।