আদালতের পর্যবেক্ষণ অপারেশন ডালভাত ও বৈষম্য বিদ্রোহের বড় কারণ

ঢাকা: বিডিআর বিদ্রোহের পেছনে অপারেশন ডালভাত একটি বড় কারণ বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। আদালত বলেছেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘অপারেশন ডালভাত’ এর অর্থসংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিডিআরকে জড়ানো ঠিক হয়নি ।

মঙ্গলবার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগে আদালতের বিচারক এ পর্যবেক্ষণ দেন।

হত্যা মামলার বিচারে গঠিত বিশেষ আদালতের কার্যক্রম মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে শুরু হয়। নির্ধারিত সময়ের আড়াই ঘণ্টা পর আদালতের কার্যক্রম শুরু করায় বিচারক মো. আখতারুজ্জামান শুরুতেই দুঃখপ্রকাশ করেন। এরপর তিনি তার পর্যবেক্ষণ দেয়া শুরু করেন।

ঘটনার ব্যাপারে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, অপারেশন ডালভাত কর্মসূচি একটি বড় কারণ। কোনো শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী যেমন: সেনাবাহিনী বা আধা সামরিক বাহিনী বা সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে অপারেশন ডাল-ভাতের মতো কাজে যুক্ত রাখা উচিৎ নয়। পিলখানার ভেতরে স্কুলগুলোতে বিডিআর জওয়ানদের সন্তান-সন্ততিদের ভর্তি করতে পারার বিষয়ে আরও ছাড় দেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে আরও স্কুল তৈরি করা যায় কি না তা কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিৎ।

সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মতো বিডিআর সদস্যদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো যায় কি না তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ভেবে দেখতে পারেন বলেও মত দেন আদালত।

এছাড়া সেনা সদস্যদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ রেখে বিডিআর সদস্যরা দেশের নিরাপত্তা রক্ষার কাজে নিয়োজিত আছেন। এ জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতো ২০ শতাংশ ভাতা তাদের পাওয়া উচিৎ। তাদের ঝুঁকিভাতা দেয়া কি না তাও দেখা উচিৎ।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক আরও বলেন, ‘বিডিআর বিদ্রোহের কারণ হিসেবে সামরিক নিরাপত্তা-সম্পর্কিত কারণ থাকতে পারে। যাতে আমাদের সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করা যায়। কূটনৈতিক কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘বহির্বিশ্বে আমাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীকে উচ্ছৃঙ্খল দেখানো, যাতে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।’

অর্থনৈতিক কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘দেশে গণ্ডগোল থাকলে বাহিনীর মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলতা থাকবে। এতে বিনিয়োগ হবে না। অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড দুর্বল করার জন্য হতে পারে।’ সামাজিক কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীকে নিরুৎসাহিত করার জন্য।’

আদালত তার পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, ‘আমাকে রায় দিতে হবে। আমার বিবেচনায় যা মনে হয়েছে তা-ই দিয়েছি। আসামিরা উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন।’

সকাল ১০টায় বিচারকার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও বিচারক ড. আকতারুজ্জামান আদালতে ১২টায় আসেন। এরপর সাড়ে ১২টায় আদালতের কার্যক্রম শুরু করেন। রায়ে তৎকালীন বিডিআরের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) তৌহিদসহ ১৫২ জনের ফাঁসি, ১৬১ জনের যাবজ্জীবন, ২৬২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা এবং ২৭১ জনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে ঘটে এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। পরে বিচারের মুখোমুখি হন ৮৫০ জন। আসামির সংখ্যার দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হত্যা মামলা।

এ ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নবজ্যোতি খীসা একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ মামলাটি তদন্ত করেন। তাকে সহযোগিতা করেন ২০০ কর্মকর্তা। ৫০০ দিন তদন্তের পর ২০১০ সালের ১২ জুলাই এ আদালতে হত্যা এবং অস্ত্র-বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। এতে ৮২৪ জনকে আসামি করা হয়। পরে অধিকতর তদন্তে আরও ২৬ জনকে অভিযুক্ত করে বর্ধিত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। সাবেক সাংসদ নাসির উদ্দিন পিন্টু ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা তোরাব আলীসহ সব মিলে আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৫০। বিচার চলাকালীন চার জন মারা গেছেন।

এই মামলায় নথির সংখ্যা ৮৭ হাজার পৃষ্ঠা। আসামিদের মধ্যে বিডিআর জওয়ান আছেন ৭৮২, বেসামরিক সদস্য ২৩ জন। এর মধ্যে ২০ জন এখনো পলাতক, জামিনে আছেন ১৩ জন। জামিনে থাকা ১৩ জনের মধ্যে ১০ জন মঙ্গলবার আদালতে হাজির হন। বাকি তিন জন জোহরা খাতুন, আব্দুস সালাম ও লোনা আক্তার হাজির হতে পারেননি।

২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মামলার বিচার শুরু হয়। চার বছর আট মাসে মামলাটি ২৩২ কার্যদিবস অতিক্রম করে। মঙ্গলবার  রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ মামলার সব কার্যক্রম।

বিচারক বলেছেন, ‘২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদরদপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনার পেছনে অর্থনৈতিক মোটিভ ছিল। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মোটিভও থাকতে পারে।’

এই বিদ্রোহের তথ্য আগে জানতে না পারার ঘটনায় গোয়েন্দা দুর্বলতা ছিল বলেও মনে করছে আদালত।

এ মামলার শুনানিতে বিজিবির সিকিউরিটি ইউনিটের মেজর আরএমএম আসাদ-উদ-দৌলা আদালতকে জানান, বিদ্রোহ শুরুর চারদিন আগে (২১ ফেব্রুয়ারী) বিভিন্ন দাবি দাওয়া ও ডালভাত কর্মসূচি নিয়ে সেনা কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অভিযোগ সম্বলিত একটি প্রচারপত্র পিলখানায় পাওয়া যায়।

আসাদ তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘২৫ ফেব্রুয়ারি দরবার শুরুর পর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ ডালভাত কর্মসূচি নিয়ে বক্তব্য দেয়ার সময়  সৈনিক মইন মঞ্চে উঠলে হৈচৈ শুরু হয়। এ সময় গুলির শব্দ শোনা যায়।

মঙ্গলবার ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে বহু আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।

সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদও বিচারকক্ষে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া মারা যাওয়া সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনরাও উপস্থিত ছিলেন। তবে ভেতরে আসতে পারেননি আসামিপক্ষের কোনো স্বজন।

বাংলামেইল২৪ডটকম/ এফএইচ/ জেএ