পিলখানায় সেনাকর্মকর্তা হত্যা মামলার রায়: ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনের ফাঁসি, যাবজ্জীবন ১৬১

নূরুজ্জামান/উৎপল রায়: পিলখানায় সেনাকর্মকর্তা হত্যা মামলার রায়ে ১৫২ বিডিআর সদস্যের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আদালত। ইতিহাসে এই প্রথম কোন মামলার রায়ে এত আসামির ফাঁসির আদেশ হলো। জনাকীর্ণ আদালতে ঘোষিত রায়ে ৮৫০ আসামির মধ্যে ১৫২ জনের ফাঁসি, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৭১ জনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। বাকি ২৬২ জনকে তিন থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। আসামির মধ্যে চারজন বিচার চলাকালেই মারা গেছেন। রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদরাসা ও নবকুমার ইনস্টিটিউট মাঠে স্থাপিত জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এ উপলক্ষে আদালত ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আশপাশের সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়া হয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সকাল ১০টায় বিচারকাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর সাড়ে ১২টায় আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগেই ৮৪৬ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। নির্ধারিত সময়ের আড়াই ঘণ্টা পর আদালতের কার্যক্রম শুরু করায় বিচারক আখতারুজ্জামান শুরুতেই দুঃখ প্রকাশ করেন। এরপর তিনি তার পর্যবেক্ষণ দেয়া শুরু করেন। বলেন, ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ কর্মসূচি একটি বড় কারণ। কোন শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী যেমন সেনাবাহিনী বা আধাসামরিক বাহিনী বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে অপারেশন ডাল-ভাতের মতো কাজে যুক্ত রাখা উচিত নয়। পিলখানার ভেতরের স্কুলগুলোতে বিডিআর জওয়ানদের সন্তানদের ভর্তি করতে পারার বিষয়ে আরও ছাড় দেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে আরও স্কুল তৈরি করা যায় কিনা, তা কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিত। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মতো বিডিআর সদস্যদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো যায় কিনা, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ভেবে দেখতে পারেন। এরপর আদালত রায় ঘোষণা শুরু করেন। রায় ঘোষণাকালে আদালতের সামনে দফায় দফায় হট্টগোল করেন আসামিরা। মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত আসামিরা বিচারককে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকেন, কোন সাক্ষ্য ছাড়াই রায় দিয়ে দিলেন। আল্লাহর শেষ বিচারে আপনার বিচার হবে। এ সময় সাজার ঘোষণা শুনে অনেক আসামি কান্নায় ভেঙে পড়েন। চিৎকার করে বলতে থাকেন, মাননীয় আদালত আমি কোন অপরাধ করিনি। ওই দিন ঘটনাস্থলে ছিলাম না। এ সময় আসামি পক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। মাইকে অনুরোধ করে বলেন, আপনারা কেউ কথা বলবেন না। আমি আপনাদের হয়ে লড়েছি। আপনাদের ওপর আমার অধিকার আছে। এরপর আরও আদালত আছে। আমরা সেখানে আপিল করবো। দয়া করে কেউ কথা বলবেন না। কিন্তু তার কথা কানে না তুলে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবিতে হট্টগোল করতে থাকেন। আসামিদের এমন হট্টগোলের মুখে বিচারক প্রায় ১৫ মিনিট নীরব থাকেন। পরে পুলিশ সদস্যরা তাদের সরিয়ে নিয়ে যায়। রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহত ১০ সেনাকর্মকর্তা কর্নেল মুজিব, কর্নেল আনিস, কর্নেল শামসুল আরেফিন, কর্নেল কাজী এমদাদুল হক, লে. কর্নেল ইমসাদ ইবনে আমিন, লে. কর্নেল শামসুল আজম, লে. কর্নেল আবু মুসা মো. আইয়ূব কায়সার, মেজর মোসাদ্দেক ও মেজর সালেহর পরিবারের সদস্যরা। তবে আসামিদের কোন স্বজনকে দেখা যায়নি আদালত চত্বরে। রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এ রায়ের মাধ্যমে নিহতদের স্বজনদের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে আসামি পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, এ রায়ে আসামিরা ন্যায়বিচার পাননি। বিচারের নামে প্রহসন হয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে ব্যালেন্স করার জন্য তোরাব আলীর সঙ্গে বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন পিন্টুকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়া হয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। আসামি পক্ষের আরেক আইনজীবী শামীম সরদার বলেন, তারা এ রায়ে সন্তষ্ট নন। শিগগিরই উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন উপ-সহকারী পরিচালক তৌহিদুর রহমান। তৌহিদুরের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। এ মামলায় বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু ও আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড নেতা তোরাব আলীও আসামি ছিলেন। তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। ফাঁসির রায় হওয়া ১৫২ জনের সবাই বিডিআর জওয়ান। এ ছাড়া ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে অবৈধভাবে অস্ত্র লুটের দায়ে আরও ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। ২৬২ জনের মধ্যে ২০৭ জনকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে তাদের আরেকটি অভিযোগে আরও তিন বছরের সাজা দেয়া হয়। বাকি ৫৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারির ঘটনায় তিনটি মামলা হয়। বিদ্রোহের মামলার আসামি ছয় হাজার ৪৬ জন। হত্যা মামলার আসামি ৮৫০ জন। বিস্ফোরকদ্রব্য মামলার আসামি ৭৮৭ জন। ৫৭ সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচারের মুখোমুখি করা হয় ৮৫০ বিডিআর জওয়ানকে। আসামি সংখ্যার দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হত্যা মামলা। ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল সুসজ্জিত দরবার হল থেকে। সকাল সাড়ে ৯টায় বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক শাকিল আহমেদের বক্তব্যের সময় দু’জন সিপাহি অতর্কিতে মঞ্চে প্রবেশ করে। এরপর জওয়ানরা দু্থ দিন ধরে বিডিআর মহাপরিচালকসহ ৭৪ জনকে হত্যা করে। কর্মকর্তাদের বাড়িঘরে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। সরকারি নথিপত্রেও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। বিদ্রোহ শুরুর ৩৩ ঘণ্টা পর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান হয়। এ ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানার তৎকালীন ওসি নবোজ্যোতি খীসা একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ সুপার আবদুল কাহ্‌হার আকন্দ মামলাটি তদন্ত করেন। তাকে সহযোগিতা করেন ২০০ কর্মকর্তা। ৫০০ দিন তদন্তের পর ২০১০ সালের ১২ই জুলাই এ আদালতে হত্যা এবং অস্ত্রবিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। এতে ৮২৪ জনকে আসামি করা হয়। পরে অধিকতর তদন্তে আরও ২৬ জনকে অভিযুক্ত করে বর্ধিত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। সব মিলে আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৫০। এ মামলায় নথির সংখ্যা ৮৭ হাজার পৃষ্ঠা। আসামিদের মধ্যে বিডিআর জওয়ান ৭৮২, বেসামরিক সদস্য ২৩ জন। এর মধ্যে ২০ জন এখনও পলাতক। বিচার চলার সময় চারজন মারা গেছে, জামিনে আছে ১৩ জন। জামিনে থাকা ১৩ জনের মধ্যে ১০ জনকে আদালতে হাজির করা হয়। বাকি তিনজন জোহরা খাতুন, আবদুস সালাম ও লোনা আক্তার হাজির হতে পারেননি। ২০১১ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি মামলার বিচার শুরু হয়। রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুনর্গঠন করা হয়। নাম বদলের পর এ বাহিনী এখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হিসেবে পরিচিত। এদিকে আদালতের আদেশের পর বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।’ যারা বেকসুর খালাস পেয়েছেন তারা চাকরি ফিরে পাবেন কিনা এমন প্রশ্নে বলেন, আইনজীবী প্যানেল এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। আর এ হত্যা মামলার বাইরেও বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্রোহের মামলার বিচারও শেষ হয়েছে। সবগুলো আদালত মিলিয়ে কেউ নির্দোষ হলে অবশ্যই তাকে চাকরি ফিরিয়ে দেয়া হবে।
পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে আদালত। গতকাল দুপুরে বিচারক আক্তারুজ্জামান রায় ঘোষণার শুরুতেই তৎকালীন বিডিআর বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট ও হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার বিষয়ে পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেন। তিনি রায়ের পর্যবেক্ষণে সামরিক ও কূটনৈতিক মোটিভ থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেন। এতে বলা হয়, বিডিআর বিদ্রোহের পেছনে সামরিক নিরাপত্তা-সম্পর্কিত কারণ থাকতে পারে; যাতে আমাদের সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করা যায়। সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে বিডিআরের নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে দুর্বলতা ছিল।
কূটনৈতিক কারণ সম্পর্কে রায়ে বলা হয়েছে, বহির্বিশ্বে আমাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীকে উচ্ছৃঙ্খল দেখানো, যাতে  দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। অপারেশন ডাল-ভাত কর্মসূচিকেও বিদ্রোহের একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিচারক। রায়ে বিচারক বলেন, কোন শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী যেমন সেনাবাহিনী বা আধা-সামরিক বাহিনী বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে অপারেশন ডাল-ভাতের মতো কাজে যুক্ত রাখা উচিত নয়। নির্ধারিত সময়ের আড়াই ঘণ্টা পর আদালতের কার্যক্রম শুরু করায় বিচারক মো. আখতারুজ্জামান শুরুতেই দুঃখপ্রকাশ করেন। এরপর তিনি তার পর্যবেক্ষণ দেয়া শুরু করেন। পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, পিলখানার ভেতরে স্কুলগুলোতে বিডিআর জওয়ানদের সন্তানদের ভর্তির বিষয়ে আরও ছাড় দেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে আরও স্কুল তৈরি করা যায় কিনা, তা কর্তৃপক্ষের  ভেবে দেখা উচিত। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মতো বিডিআর সদস্যদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো যায় কিনা, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ভেবে দেখতে পারেন। এছাড়া,  সেনাসদস্যদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ রেখে বিডিআর সদস্যরা  দেশের নিরাপত্তা রক্ষার কাজে নিয়োজিত আছেন। এ জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতো ২০ শতাংশ ভাতা তাদের পাওয়া উচিত। তাদের ঝুঁকিভাতা দেয়া যায় কিনা, তা-ও দেখা উচিত। সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের প্রেষণে মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া, বিডিআর কর্মকর্তাদের পিলখানার বাইরে বসবাসে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পিলখানার অভ্যন্তরে আবাসন ব্যবস্থা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিচারক আরও বলেন, ওই সময়ে একটি বিদ্রোহ হয়েছিল, এটি সঠিক। লাশের বিকৃত চেহারা দেখে আমার গা শিউরে উঠেছিল। এই মামলায় বিভাগীয় সাক্ষী বেশি। বিচারে সারকামস্ট্যান্স এভিডেন্স বিবেচনায় আনা হয়েছে। বিডিআর জওয়ানদের কিছু কিছু দাবি যৌক্তিক হলেও বেশির ভাগ দাবি ছিল ভিত্তিহীন। আদালত তার পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, আমাকে রায় দিতে হবে। আমার বিবেচনায় যা মনে হয়েছে তা-ই দিয়েছি। আসামিরা উচ্চ আদালতে  যেতে পারবেন।