দেশ নিয়ে প্রবাসীদের উদ্বেগ

দেশ নিয়ে প্রবাসীদের উদ্বেগ

অজয় দাশগুপ্ত : প্রত্যাশার রেখা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বাংলাদেশিদেরও স্পর্শ করেছিল। তা কি এখন নিভু নিভু? মিলিয়ে যাচ্ছে? প্রশ্নবিদ্ধ প্রবাসীরা এখন যন্ত্রণাকাতর। বাংলাদেশের উন্নতি, অগ্রগতি, সদার্থক পরিবর্তনে আশাবাদী হয়ে ওঠা তারা আজ শঙ্কিত। চোখ খুললেই মৃত্যু, আগুন, জ্বালাও-পোড়াও দেখে অস্থির, অধীর। কে নেবে এর দায়-দায়িত্ব? কে দেবে ভরসা? নিজ দেশে পরবাসী সংখ্যালঘু, চেতনা ও বোধসম্পন্ন সংখ্যাগুরু, এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক সবাই আজ বিপন্ন ও অসহায়। কোথায় সরকার? কোথায় কঠোরতা? কথায় বলে ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’। সরকার কি ভাবেনি? জানত না এমন পরিস্থিতি হতে পারে? নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা, প্রজ্ঞার অভাব যে কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে সেটাই প্রত্যক্ষ করছে বাংলাদেশ।

শাহবাগের শুরুতে কিন্তু এমন পরিবেশ বা পরিস্থিতি ছিল না। দীর্ঘকাল পর মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় জেগে ওঠা তারুণ্যকে দেখে দেশবাসী তো বটেই, আমরাও ঘুম ভেঙে নতুনভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলাম। ফিরে এসেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী স্লোগান জয় বাংলা ও হারানো গৌরব। সে ধারা ও তারুণ্যের জোয়ারে বেশ কিছুদিন কোনো ধরনের উপদ্রব বা ঝামেলা শাহবাগ পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। যদ্দিন তা পারেনি ততদিন শাহবাগ নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে পানেনি প্রতিপক্ষ। সমস্ত কলঙ্ক, ঝামেলা আর মিথ্যাচার শুরু হলো রাজনীতির অপ-হস্তক্ষেপের পর পর। আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুবর্ণ ও চমত্কার এই সুযোগটিও আজ হুমকির মুখে।

এ কথা মানতেই হবে প্রতিপক্ষের শক্তি কম নয়। আজ তারা যে শক্তি ও জঙ্গিবাদ নিয়ে আবির্ভূত তাও রাজনীতিরই প্রতিদান। মুক্তিযুদ্ধের পর তাজউদ্দীনের প্রতি অবমাননা ও তাকে অস্বীকার করে মোশতাককে কোলে নেয়ার, আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে হারানোর পরও শিক্ষা গ্রহণ করেনি। সবল ও দৃঢ়চিন্তার পরিবর্তে দোদুল্যমানতা জামায়াত শিবির তোষণে ক্ষমতায় যাওয়ার কৌশলই আজ সাপ হয়ে দংশন করছে। জাহানারা ইমামের আন্দোলন ও গণআদালত যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনই সমর্থন প্রত্যাহার করে তাকে ও নির্মূল কমিটিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। কথিত আছে শহীদ জননীর ইমেজ নেতা-নেত্রীদের চেয়ে বড় হয়ে ওঠার কারণেই নাকি এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। আজ শহীদ মাতা জাহানারা ইমাম বেঁচে নেই বলেই তার জয়-জয়কারে এরা নির্বাক বা মেনে নিতে কসুর করছে না। দেশজ রাজনীতির অপর ধারাটিও আমাদের বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কথা বলতে দ্বিধা করেনি। সামান্য অপেক্ষার পর মুক্তিযোদ্ধা ও ঘোষকের দাবিদার দলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে জামায়াত শিবির আজ বেপরোয়া।

সবাই জানতে চান এর শেষ কোথায়? এটাকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ মানার পরও মানতে হবে জানতে হবে বাস্তবতা, আমরা ঘরের মানুষের বিরুদ্ধে লড়ছি। পাকিস্তানি বা বিহারিদের বিরুদ্ধে নয়। পুলিশ আক্রমণকারী, অত্যাচারী, অত্যাচারিত প্রতিবাদী ও অপরাধী সবাই এ দেশের এই মাটির। একেকটি জান, একেকটি সম্পদ, একেকটি মন্দির বা স্থাপনা ধ্বংস মানে এক ধরনের আত্মাহুতি ও সর্বনাশ। যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলেন তারা কি জানতেন না, এমনটি হতে পারে? রায়ের আদেশে এমন হলে ফাঁসি কার্যকরের পর কী হবে?

আমরা যারা প্রবাসী, দূরদেশে নিরাপদ ভূমিতে বসবাস করি, আমাদের চোখের ঘুমও হারাম হয়ে গেছে। দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ বা গণজাগরণ যাই বলি না কেন আমরা মৃত্যু চাই না, আগুন চাই না, মন্দির-মসজিদ ভাঙা চাই না, চাই না হিন্দু-বৌদ্ধ বা যে কোনো ধর্মের মানুষের প্রতি এমন তীব্র ঘৃণার বহির্প্রকাশ।

এ এক অদ্ভুত সরকার। দেশ জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, তবু শীর্ষ নেতৃত্বের মুখে হাসি অথবা উপেক্ষা। অন্য দলের চোখে-মুখে ক্রোধ। কোথায় দাঁড়াবে মানুষ? কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশ? তার এদিনের অর্জন, আর্থিক প্রগতি, ভাবমূর্তি সবই আজ তোপের মুখে। শুধু শান্তি প্রার্থনা আর চেতনা দিয়ে কাজ হওয়ার নয়। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে তারা আন্তরিক। জানমালের হেফাজত ও দেশ রক্ষায় পারঙ্গম। প্রবাসীরাও আজ ভয়ার্ত, উদ্বিগ্ন, কোথাও কি কেউ নেই?

লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী