অস্থিতিশীল পরিস্থিতি :: অবনতির দিকে যাচ্ছে অর্থনীতি

অস্থিতিশীল পরিস্থিতি :: অবনতির দিকে যাচ্ছে অর্থনীতি

economy-cartoons-42রাজনীতিতে সহিংসতা এবং অস্থিতিশীলতা বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতির অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। কমছে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ, বাড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরো কমার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নানা ধরনের অনিয়মের খবর মিলছে। ভেঙে পড়েছে পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। দেশের রাজনীতির কারণে অর্থনীতির গতি থমকে যাওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে। তবে এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ। নির্বাচনের আগে তৈরি হচ্ছে এমন পরিস্থিতি যেখানে মানুষ মারা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাষ্ট্রের সম্পত্তি। ব্যক্তিগত সম্পদ হানির বিষয়টি নতুন করে বলার কিছু নেই। এমন অবস্থায় বাড়িতেও নিরাপদ নয় মানুষ।

ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ আরো কমবে: ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভয়াবহ। বাংলাদেশে এবারই প্রথম ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ এক দশমিক ২ ভাগ কমে গেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীতে আর কখনো এ ধরণের ঘটনা ঘটেনি। চার কারণে এ বিনিয়োগ কমেছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। এই কারণগুলো হচ্ছে-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, তৈরি পোশাকখাতে শ্রম বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণে ব্যর্থতা ও শ্রমিক অসন্তোষ, ব্যাংকিংখাতে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনুজ্জ্বলতা। উদ্বৃত্ত অর্জিত হয়েছে শিল্পের কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমার কারণে, যা শিল্প খাতের জন্য ইতিবাচক নয় এবং এই উদ্বৃত্ত মুদ্রার উপচয়ের মাধ্যমে রফতানি প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। শিল্পের কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ২০১১-১২ অর্থবছরের ১ হাজার ১২৬ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার থেকে কমে ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাত্র ৬৪০ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ৪৩.১৩ শতাংশ ঋণাত্বক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। অন্যদিকে, টাকার মান ২০১৩ সালের আগস্টে গত মাসের তুলনায় ০.০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পোর্টফোলিও বিনিয়োগ এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঋণাত্বক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৪.৬ শতাংশ ঋণাত্বক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। যা ২০১১-১২ অর্থবছরে ২৮.৪ শতাংশ ছিল।

ব্যাংক ঋণ বাড়ছে: ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতায় ব্যাংকে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণ। গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের অনেকেই ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছেন না। নতুন করে নাম লেখাচ্ছেন ঋণখেলাপির খাতায়। সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় আছেন মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীরা। তাদের পুঁজি কম। অনেকেরই পুঁজি আটকে যাওয়ায় নতুন করে আর বিনিয়োগ করতে পারছেন না। সবমিলে ব্যাংকিং খাতে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণ।

আর যেভাবে ধরপাকড় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং রাজনৈতিক কঠোর কর্মসূচি চলছে তাতে, এ অবস্থার সমাধান না হলে সংঘাতময় পরিস্থিতি চলমান থাকে, তাহলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে রফতানি কমে গেছে। আমদানি-রফতানির বাধার পাশাপাশি পণ্য উৎপাদন এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এতে অর্থনীতির কাঠামো ভেঙে যাবে। বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণ’র তথ্যানুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে নিট বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে হয়েছে ১৮৮ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। যা ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ১১৬ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার। কিন্তু ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম মাসে নিট বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ৪ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। যা ২০১২-১৩ অর্থবছরের একই সময়ে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ২০ লাখ মার্কিন ডলার ছিল।

আর, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি বলেছে, অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর হোক এটি চায় বিশ্বব্যাংক। কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি। তাই উন্নয়নের স্বার্থে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রয়োজন রয়েছে। চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে বলেও উল্লেখ করেছে এই সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংকের মতে, চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে বড়জোড় ৫.৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন চালচিত্র তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের জেষ্ঠ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের অভিমত হলো, সেবা ও শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও কমে যাবে। আর এই প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫.৭ শতাংশ। তবে সরকার তার মেয়াদের শেষ অর্থবছরের বাজেটে ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশা করা প্রকাশ হয়েছে। রাজনৈতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হলেও প্রবৃদ্ধি ৫.৭ শতাংশের বেশি হবে বলে তিনি মনে করেন না। গত চারটি জাতীয় নির্বাচন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্বাচনের বছর অর্থনীতির অনেক খাতই স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে পারে না।

মূল্যষ্ফীতি বাড়বে: সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭.১ শতাংশ। তাই এটি নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কোনো কারণ নেই। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে আগামীতে শহর এলাকায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবার শঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনের কারণে রাজস্ব নীতি বাস্তবায়নের সমস্যা হতে পারে। আর সুশাসন ও জনশক্তি রফতানিও ব্যাহত হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসবের প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।

ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা বলেছেন, হরতালের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে প্রায়ই শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়। ফলে সময়মতো পণ্য রফতানি নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের ওভারটাইম করিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। ওভারটাইমে বাড়তি টাকা গুনতে হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। হরতালে সড়ক পরিবহন বন্ধ থাকায় লাখ লাখ পরিবহন শ্রমিকসহ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যারা নতুন বিনিয়োগ করেছেন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। শিল্প-মালিকরা বলছেন, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হবে। রফতানি খাতে বিপর্যয় নেমে আসবে। অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে গোটা অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়তে পারে। এদিকে হরতালের জন্য কৃষিপণ্যের সঙ্গে জড়িত সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষিপণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত তারা যখন পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না, তখন তাদের আয় হ্রাস পাচ্ছে। ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকরা অনেক কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে। এমতাবস্থায় হরতাল, নৈরাজ্য ও সহিংসতা তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা, বণ্টন ও বিপণন ব্যবস্থাতেও আঘাত হানছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে পণ্যমূল্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং দামবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিকে ক্রমেই অসহনীয় চাপে ফেলে দিচ্ছে। সার্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে রোধ করা যাচ্ছে না মূল্যস্ফীতি। বরং মূল্যস্ফীতি রোধ করতে গিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সংকুচিত করে দেয়ায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। উপরন্তু জ্বালানি সংকটে নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা ও উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। জ্বালানি সংকট এতই সমস্যা সৃষ্টি করেছে যে, কারখানা চালু না করায় কিংবা ঠিকমতো উৎপাদনে যেতে না পারায় উদ্যোক্তারা ঋণের কিস্তি দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে খেলাপির সংখ্যাও বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে না পারলে ব্যাংকেরও টিকে থাকা কষ্টসাধ্য হবে।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, হরতাল, সহিংসতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি আমাদের মনে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার জন্ম দিলেও বলব, রাজনীতিবিদদের মধ্যে যত দূরত্বই থাকুক না কেন, দেশের স্বার্থে তাদের সংলাপে বসতেই হবে। সংলাপই আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ বা সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে। তিনি বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে কারখানা চালু রাখা যাচ্ছে না। অথচ উদ্যোক্তাদের ব্যাংকের কিস্তি গুনতে হচ্ছে। সেখানেও ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদ হার ধার্য রয়েছে। এ অবস্থায় শিল্প টিকে থাকবে কীভাবে? বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অবশ্যই রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা রয়েছে। তাদের ব্যর্থতার কারণেই হরতাল ও সহিংসতার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাই, সমাধানও রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে।

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন