তাজরীন ট্রাজেডি : ধরাছোঁয়ার বাইরে হোতারা

তাজরীন ট্রাজেডি : ধরাছোঁয়ার বাইরে হোতারা

আলোচিত তাজরীন ফ্যাশন্স অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল রবিবার। গত বছরের ২৪ নভেম্বর এই অগ্নিকাণ্ডে মারা যান হতভাগ্য ১১২ জন শ্রমিক। দেশের ইতিহাসে একসঙ্গে এত শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা সেই প্রথম।

যার দায়িত্বহীনতায় এই অগ্নিকাণ্ড সেই তাজরীন ফ্যাশনের মালিককে এখনও আইনের আওতায় আনা যায়নি। যদিও গত এক বছর ধরে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনগুলো দোষীদের শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে আসছে।

দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় হতাশ নিহত শ্রমিকের পরিবারগুলো। এমনকি দুর্ঘটনার বর্ষপূর্তিতে মালিকপক্ষ নিহত পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে স্মরণসভা কিংবা দোয়া মাহফিলের আয়োজন করার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করছে না।

অগ্নিকাণ্ডের পর প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়, কারখানার সিঁড়ির কলাপসিবল গেটে তালা মেরে রাখায় আগুনের লেলিহান শিখা থেকে প্রাণ বাঁচাতে পারেননি অসহায় শ্রমিকরা। অনেকেই অগ্নিদগ্ধ শরীর নিয়ে এখনও বেঁচে আছেন। এদের মধ্যে একজন আত্মসমর্পণ করেছেন মৃত্যুর কাছে। সব মিলিয়ে ১১২ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। শোকার্ত পরিবারগুলোর মুখে হাসিও নেই। বহাল তবিয়তেই আছেন তাজরীন ফ্যাশন্সের মালিক মো. দেলোয়ার হোসেন। আইন তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি। তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

বিজিএমইএ সহসভাপতি রিয়াজ-বিন-মাহমুদ বলেন, ‘তাজরীনের মালিকের শাস্তির ব্যাপারে তাদের কিছু করার নেই। শাস্তি দেবে আদালত। অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবারকে যতটুকু সাহায্য করার তা করেছে বিজিএমইএ। অগ্নিকাণ্ডের এক বছর উপলক্ষে বিজিএমইএর নিহত পরিবারগুলোকে নিয়ে কোনো উদ্যোগ আছে কি না জানতে চাইলে রিয়াজ-বিন-মাহমুদ বলেন, ‘নিহত সব পরিবারকে বিজিএমইএ সাহায্য করেছে। তবে এক বছর উপলক্ষে আলাদা কোনো স্মরণ সভার আয়োজন আমাদের নেই।’

অন্যদিকে তাজরীন ফ্যাশন্সে অগ্নিকাণ্ড ও বিপুল শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে স্বীকার করেন না সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, ‘অগ্নিনিরাপত্তার সব নিয়মুকানুন ভঙ্গ করে পরিচালিত হচ্ছিল কারখানাটি। আগুন লাগার পাঁচমাস আগেই জুন মাসে কারখানাটির অগ্নিনিরাপত্তা সনদ বাতিল হয়। তারপর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও মালিক তা নবায়ন করেননি।

আবার তিনতলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে তার ওপর আরও পাঁচতলা তৈরি করে ঝূঁকিপূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছিল কারখানাটি। আগুন লাগার পর নিচের সিঁড়ির মুখে কলাপসিবল গেটে তালা থাকায় শ্রমিকরা যেমন নিচেও নামতে পারেননি, তেমনি ওপরে ওঠার রাস্তা বন্ধ থাকায় ছাদে গিয়েও প্রাণ বাঁচাতে পারেননি। কিছু শ্রমিক জীবন বাঁচাতে মরণের ভয় উপেক্ষা করে জানালা দিয়ে লাফিয়ে নিচে পড়ে বেঁচেছেন মাত্র।

শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, ‘দুর্ঘটনার নামে ১১২ শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেয়ার দায়ে অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেনকে অবশ্য কোনো বেগ পেতে হয়নি। শ্রমিক হত্যার দায়ে তার যখন শ্রীঘরে থাকার কথা, তখন তিনি এসে আশ্রয় নেন বিজিএমইএ ভবনে। বিজিএমইএর নেতারাই তাকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন। যে কারণে কোনো মামলা পর্যন্ত হয়নি দেলোয়ারের বিরুদ্ধে।

এমনকি নিহত শ্রমিক পরিবারগুলোকে এক লাখ টাকা করে মালিকপক্ষ যে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে, সে টাকারও যোগান দিয়েছে বিজিএমইএ। এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও প্রকাশ পায়নি এখনও।

এমনকি পোশাক খাতের রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জিএম কাদের ও সচিব মাহবুব আহমেদ কয়েক দফা তদন্ত প্রতিবেদন চেয়ে তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের কাছে চিঠি পাঠালেও কোনো লাভ হয়নি। গত এপ্রিল মাসে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আবারও আলোচনায় আসে তাজরীন ফ্যাশন্সের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ওই সময় উচ্চ আদালত থেকে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল সরকারের কাছে। তারপর আবারও আগের মতোই হারিয়ে গেছে সব উদ্যোগ।

তবে, তাজরীন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ডের একবছর স্মরণে শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের উদ্যোগে আজ সকালে জুরাইন কবরস্থানে নিহতদের উদ্দেশে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হবে। এ সম্পর্কে শ্রমিক নেতা সিরাজুল ইসলাম রনি বলে, ‘মালিকরা ঘটনাকে খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যায়। কিন্তু শ্রমিকরা তাদের ভাই-বোনের মৃত্যুকে খুব তাড়াতাড়ি ভুলতে পারে না। তাই আমরা মৃত শ্রমিকদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছি।

যখন মালিকের পাশে সংগঠন ও সরকারের লোকজন থাকে তখন মালিকদের শাস্তি হয় না উল্লেখ করে রনি বলেন, এত জন শ্রমিকের নিহত হওয়ার পরও মালিকের কোনো শাস্তি না হওয়ার কারণ মালিকের পাশে বিজিএমইএ ও সরকারের লোকজন ছিল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা ২০১৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০১২ সালের জানুয়ারিতে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে শুনানির পর জিএসপি বাতিল, স্থগিত বা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দফতর ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ-ইউএসটিআর-এর। কিন্তু তাজরীন ফ্যাশন্সে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১১২ শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনার পর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য ক্রেতা দেশগুলোর শ্রমিক সংগঠনগুলো।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন তখন আরেকটি আবেদন করে বাংলাদেশের জিএসপি বাতিল করার জন্য। ওই আবেদনের শুনানির পর ঘটে সাভারে রানা প্লাজা দুর্ঘটনা। ফলে গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকার স্থগিত করে দেয় বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা।