চেক জালিয়াতির মামলায় জ্যাকসন হাইটস ও জ্যামাইকার রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সহ ৯ বাংলাদেশী গ্রেফতার

চেক জালিয়াতির মামলায় জ্যাকসন হাইটস ও জ্যামাইকার রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সহ ৯ বাংলাদেশী গ্রেফতার

জাল চেকের মাধ্যমে ৮ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে জ্যাকসন হাইটস ও জ্যামাইকার রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সহ ৯ বাংলাদেশীকে গ্রেফতার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটিইমিগ্রেশন বিভাগ। এ অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন ১৪ বাংলাদেশী। এদের মধ্যে গত ২১ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ৯ জনকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ও ইমিগ্রেশন বিভাগ। বাকি ৫ জনকে পুলিশ খুঁজছে। তবে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিসমূহ তাদের পাকড়াও করতে নানামুখী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। আরো ৬ জন গ্রেফতার হবার পরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের অপর দুর্বৃত্তের পাকড়াও করার সহায়তার অঙ্গীকারে জামিনে মুক্ত হয়েছে।

চেক জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর এ মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ হবে ২ ডিসেম্বর। ম্যানহাটানে ফেডারেল জজ কেভিন সাথানিয়েল ফক্সের এজলাসে এ মামলা পরিচালিত হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে একেক জনের সর্বোচ্চ ৪৫ বছরের কারাদ- হতে পারে বলে ইউএস অ্যাটর্নি প্রিত ভ্যারারা জানান।

জালচেকের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি ডলার জমা দিয়ে সেই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্র ইমিগ্রেশন এন্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্ট (আইচ), হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনের নিউইয়র্কের ফিল্ড কর্মকর্তা জেমস টি হায়েস জুনিয়র এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অভিযুক্তরা কোটি কোটি ডলার আত্মসাৎ করেছে। সুনিপুণ চেক জালিয়াতিতে সিদ্ধহস্ত এসব বাংলাদেশী প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যেই তুলে নিয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

অভিযুক্ত বাংলাদেশীরা হচ্ছেনÑ জ্যামাইকার বাসিন্দা টিক্কা গার্ডেনের অন্যতম কর্ণধার মাহাবুজ্জামান ফয়সাল, সাইদ আল হোসেইন সুমন (নায়ক সুমন), মোহাম্মদ খলিল রবিন, উডহেভেন ব্লুবার্ডের মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, হামিদ খান, ফ্রেস মেডোর বাসিন্দা জ্যাকসন হাইটসের প্রিমিয়াম সুইটসের অন্যতম কর্ণধার মোহাম্মদ গোলাম আযম ওরফে কামাল পাশা, এলমহার্স্টের বাসিন্দা এ কে এম গোলাম হোসেন, জর্জিয়ার মোহাম্মদ উদ্দীন ওরফে সায়েদী আমেবি ওরফে পাঙ্কা (নিউইয়র্কে ইয়ালো ট্যাক্সি চালক ছিলো), ব্রুকলিনের মোহাম্মদ শেখ ইসলাম, আকতার রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, খাইরুল ইসলাম, জ্যাকসন হাইটসের দ্বীপ রানা ও জসীম মোহাম্মদ রেজা।

এদের মধ্যে পলাতক রয়েছেন হামিদ খান, আখতার রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, খাইরুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ রেজা।

গ্রেফতারকৃত ৯ বাংলাদেশীর মধ্যে নিউইয়র্ক সিটি থেকে ৭, বাফেলো থেকে ১ ও জর্জিয়ার লরেন্সভিল থেকে অন্যজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে সাইদ আল হোসেইন সুমন (নায়ক সুমন) কে কমান্ড স্টইলে গ্রেফতার করা হয় জে এফকে এয়ারপোর্টে এমিরাটসের ফ্লাইটের ভেতর থেকে।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী মাহবুব জানান, মোঃ নজরুল ইসলাম জামিন লাভ করেছেন। ডিটেনশন নেয়া হয়েছে সাঈদ আল হোসাইন সুমন, মোহাম্মদ উদ্দিন এবং দীপক রানাকে।

ম্যানহাটানে ফেডারেল অ্যাটর্নি পিট বাহারারা বলেন, গত তিন বছর থেকে অভিযুক্তরা বিভিন্নভাবে জাল ডিপোজিট এবং পরিচয় প্রতারণার মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করে আসছিল। তাদের টার্গেটের শিকার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি ফিন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান।

অভিযোগে প্রকাশÑ উল্লিখিত বাংলাদেশীরা একটি ভুয়া কোম্পানির নামে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি ব্যাংকে একাউন্ট খুলে সেখানে জালচেক ডিপোজিট করেই অর্থ তুলে নিতো।

একাজে তারা শেম কর্পোরেশন নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ভুয়া আইডি, সোশ্যাল সিকিউরিটি দিয়ে একাউন্ট খুলে বিভিন্ন ব্যাংকে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভুয়া ভিসা ছিল তাদের পাসপোর্টে। এ কাজে বিভিন্ন ব্যাংকে তারা শুক্রবার ভুয়া চেক জমা দিতো। যাতে সাথে সাথেই ফান্ড পর্যাপ্ত হয়ে যেতো। এরপর তারা সোমবারের আগেই উইকেন্ডে তুলে নিতো জমাকৃত অর্থ। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাংক বিশেষ ক্যাসিনো থেকে তারা ১০ হাজারের বেশি অর্থ উত্তোলন করতো না। এটা ছিল তাদের প্রতারণার অন্যতম কৌশল। গ্লোবাল ক্যাশ অ্যাক্স মেশিন থেকেই বেশি অর্থ উত্তোলন করা হতো। কারণ নিউজার্সির ক্যাসিনোতে অবস্থিত এই মেশিনে অর্থ উত্তোলনের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই।

অভিযুক্ত বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে অর্থ প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে। দোষীসাব্যস্ত হলে তাদের প্রত্যেকের ৩০ থেকে ৪৫ বছরের কারাদ- হতে পারে।

ইউএস অ্যাটর্নি প্রিত ভ্যারারা চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিবরণ প্রসঙ্গে বলেন যে, গ্রেফতারের পর ফেডারেল কোর্টে সোপর্দ করলে আরো ৬ জন দোষ স্বীকার করেছে এবং তারা সংঘবদ্ধ এ চক্রের সকল সদস্যকে গ্রেফতারে সহায়তা দিচ্ছে। এজন্য তাদের নাম এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেকেই এ ধরনের প্রতারণায় আরো অনেকে জড়িত বলে সন্দেহ করছেন। এটা সত্য হলে এই ঘটনার রেশ ধরে আরো অনেকেই গ্রেফতার হতে পারেন। এ নিয়ে কমিউনিটিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

জালচেক ও জাল ডকুমেন্টে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়ার চাঞ্চল্যকর এ মামলার তথ্য মিডিয়াকে প্রদান করেন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের তদন্ত সংস্থার ইউএস ইমিগ্রেশন এন্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের নিউইয়র্ক ফিল্ড অফিসের স্পেশাল এজেন্ট তথা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জেমস টি হায়েস। জানা গেছে, গ্রেফতারকৃতরা নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটস এবং জ্যামাইকায় রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসার নামে ধান্দাবাজিতে লিপ্ত ছিলেন। এর কয়েক বছর আগে আরো ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয় রিয়েল এস্টেট প্রতারণা, ব্যাংক প্রতারণা, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত থাকার দায়ে। ওই ১৪ জনের মধ্যে জামিনে মুক্তি লাভের পর দুজন পালিয়ে বাংলাদেশে চলে গেছেন। অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- হয়েছে অথবা শাস্তির অপেক্ষায় রয়েছেন অভিযুক্তরা।
সূত্রঃ আজকাল