পিঁপড়ে মনে রাখে

পিঁপড়ে মনে রাখে

সমাজ-শত্রুকে কি পিঁপড়েরা চিনে রাখে? তারা কি মানুষের মতো স্মৃতি ধরে রাখতে সক্ষম? বিবিসি সায়েন্স অবলম্বনে এই নিবন্ধ; ভাষান্তর করেছেন এস এ হাকিম

পিঁপড়েদের মধ্যে শ্রমিক হিসেবে যারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, বুননে দক্ষ, অর্থাৎ যেসব পিঁপড়ে নিজেদের লার্ভা সিল্ক দিয়ে পাতা জুড়ে জুড়ে বাসা তৈরি করতে জানে, বাইরের শত্রু হামলা করলে তারাই রক্ষা করে নিজেদের কলোনি। তাদের এ কলোনি-প্রকৃতির সবচেয়ে প্রাচীন এবং সুসংগঠিত সমাজ-শত্রুকে চেনার জন্য এক ধরনের ‘যৌথ স্মৃতি’ তৈরি করতে সমর্থ বলে দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা।

একটা পিঁপড়ে যখন অন্য কলোনির একজন হামলাকারীর সঙ্গে লড়াই করে, ওই শত্রুর গন্ধ গ্রহণ করে সে, সংরক্ষণ করে, তারপর সেটা পাচার করে কলোনির বাকি সবার কাছে। এতে করে বাসা তৈরিতে তাকে যারা সাহায্য করছে তাদের সবাই হামলাকারী কলোনির পিঁপড়েকে চিনতে পারবে। এ আবিষ্কার সম্পর্কে রিপোর্টটা প্রথমে ছাপা হয়েছে জার্নাল ন্যাটুভিজানসাফটানে।

বহু পিঁপড়ে প্রজাতির সমাজ হিসেবে সচল থাকার চাবি হলো রসায়ন। কীটগুলো তাদের বাসার অন্য বাসিন্দাদের শনাক্ত করে নির্দিষ্ট ‘কেমিক্যাল সিগনেচার’ দ্বারা, যেটা ওই বাসার প্রতিটি সদস্যের শরীরে লেগে থাকে। তবে পোকারা গন্ধ শুঁকেও বুঝে নিতে পারে কোনো হামলাকারী অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা চালাচ্ছে কিনা, কিংবা এরই মধ্যে তাদের ভেতরে ঢুকে পড়েছে কিনা।

এ গবেষণা চালানো হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। মেলবোর্ন ভার্সিটির একটা টিম জানার চেষ্টা করছিল পিঁপড়েরা যেসব গন্ধের সংস্পর্শে আসে সেগুলো তারা নিজেদের স্মৃতিতে ধরে রাখতে পারে কিনা।

এ পরীক্ষা চালানো হয় উইভার অ্যান্ট (ঙবপড়ঢ়যুষষধ ংসধৎধমফরহধ)- এর ওপর, যেগুলো বাড়ি তৈরি করে গাছের ডালে, প্রতিটি বাসায় বসবাস করতে পারে পাঁচ লাখ শ্রমিক।

বিজ্ঞানীদের টিম ‘পরিচিতি পরীক্ষা’-র আয়োজন করেছিল, তাতে এক বাসার পিঁপড়েকে আরেক বাসায় অনুপ্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়া হয়। একই পরীক্ষা কয়েক দফা করা হয়। ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অবস্থানে রয়েছে এ রকম বাসা থেকে একটা পিঁপড়েকে নিয়ে এসে রাখা হয় ক্ষুদে এক পর্যবেক্ষণ মঞ্চে, তারপর সেখানে আনা হয় আরেক বাসার এক পিঁপড়েকে।

এভাবে ১৫ দফা চিনিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটানোর পর বিজ্ঞানীরা একটা নকল পিঁপড়ে হামলার আয়োজন করেন। এখন ‘পরিচিত’ হয়ে ওঠা বাসা থেকে ২০টি শ্রমিক পিঁপড়েকে তুলে এনে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বাসায় বা বাসার সামনে ছেড়ে দিলেন তারা।

‘প্রত্যাশা অনুসারেই এই আগন্তুকদের ওপর হামলা চালায় আবাসিক শ্রমিকরা,’ গবেষকরা তাদের কাগজে রিপোর্ট করেছেন।

সম্মিলিত প্রজ্ঞা

যেসব পিঁপড়ে নিজেদের কলোনির প্রতিরক্ষার দিকটা দেখাশোনা করছিল তারা হামলাকারীদের ওপর, তাদের ক’জন শ্রমিক যাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল, অনেক বেশি হিংস্র ভঙ্গিতে ছুটে যায়। টিমের তরফ থেকে ব্যাখ্যা দেয়া হয়, এই বাড়তি আক্রমণাত্মক ভাবটা ছিল নির্দিষ্টভাবে ‘পরিচিত’ কলোনির উদ্দেশে, স্থায়ী হয়েছে পরিচিতি অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আরও ৬ দিন।

প্রধান গবেষক প্রফেসর মার্ক এলগার বিবিসি নেচারকে ব্যাখ্যা করেছেন, একজন শ্রমিকের অভিজ্ঞতা কলোনির বাকি সব পিঁপড়ে গ্রহণ বা সংগ্রহ করার ক্ষমতা রাখে। এটাকে তিনি যৌথ বা ‘সম্মিলিত প্রজ্ঞা’ বলেছেন।

মানুষকে দিয়ে একটা উদাহরণ তৈরি করেছেন তিনি, সেটা এ রকমÑ ‘কল্পনা করুন বিশেষ একদল মানুষ সম্পর্কে আপনার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তাদের চেনা যায় বিশেষ একটা চিহ্ন দেখেÑ ধরা যাক সবাই তারা কালো রুমাল ব্যবহার করে।’

‘আপনি আপনার সহকর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বললেনÑ কালো রুমাল ব্যবহার করে এমন লোক সম্পর্কে সবাই সাবধান থেকো।’

‘যারা আপনার কথা শুনল তাদের মধ্যে কেউ একজন অপর এক সহকর্মীকে কথাটা জানাতে পারে, আপনি যখন সতর্ক করছিলেন তখন কামরায় সে ছিল না।’

‘ওই সহকর্মী তথ্যটা সংগ্রহ করেছে পরোক্ষভাবে আপনার এবং আপনার সহকর্মীদের যৌথ স্মৃতি থেকে।’

‘সহকর্মী বদলে পিঁপড়ে করুন, আর কালো রুমাল বদলে করুন গন্ধ, তাহলেই আমাদের গল্প বুঝে গেছেন আপনি।