সম্পদের পাহাড় গড়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপরা

সম্পদের পাহাড় গড়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপরা
জাহাঙ্গীর কিরণ
নির্বাহী ক্ষমতা না পেয়েও সম্পদ অর্জনে রেকর্ড গড়েছেন নবম জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদসহ সব হুইপ। হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরীর (লিটন চৌধুরী) সম্পদ অর্জনের পরিমাণ প্রভাবশালী মন্ত্রীদের থেকেও ছাড়িয়ে গেছে। দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া এসব প্রার্থীর নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় এসব চিত্রই ফুটে ওঠেছে। তবে ইসিতে দেখানো সম্পদ ছাড়াও আরো বহুগুণ সম্পদ ও আয় গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) দাবি করেছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সম্পদ অর্জনকে টেক্কা দিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও হুইপরা। যেখানে মন্ত্রীদের গড়ে সম্পদ বেড়েছে ২৪৭ ভাগ, সেখানে প্রতিমন্ত্রীদের বেড়েছে ৪৫৯ ভাগ। আর চিফ হুইপ ও হুইপদের গড়ে সম্পদ বেড়েছে ১ হাজার ৬৮৯ ভাগ। মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ আংশিক) আসনে পঞ্চমবারের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসা সংসদের চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদের গত ৫ বছরে সম্পদ বেড়েছে ৩ গুণ। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে চিফ হুইপ দম্পতির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। পাঁচ বছরে তা ফুলেফেঁপে ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসা, কৃষি, শেয়ার, নিজ নামে ২৫ ভরি ও স্ত্রীর নামে ১০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে। গত নির্বাচনের আগে তার নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৫৫ টাকা। এবার তা এসে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকায়। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে আগে কোনো টাকা না থাকলেও এবার আছে নগদ ৪ লাখ টাকা। নিজ মালিকানার সম্পদের মধ্যে রয়েছে কৃষিজমির পরিমাণ ৫ দশমিক ৭ একর, যার মূল্য ১১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। চা বাগান, রাবার বাগান, মৎস্য খামার আগে না থাকলেও এবার ৯ একর জমিতে এসব করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিজ নামে ঢাকায় ৫ কাঠা প্লট, যার মূল্য ১৭ লাখ ৩ হাজার ৩৫০ টাকা। শেয়ার ও বন্ডে নিজের নামে আগে ২ লাখ ৮৯ হাজার থাকলেও স্ত্রীর নামে ছিল না। এবার নিজ নামে ১ কোটি ১২ লাখ ৮০ হাজার ৫০০ টাকা ও স্ত্রীর নামে ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৮ টাকা রয়েছে।

সম্পদ অর্জনের দিক থেকে সবার ওপর স্থান করে নিয়েছেন হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটন। তার আয় বেড়েছে ২৩৬ গুণ। নিট সম্পদের পরিমাণ ৪১ কোটি ৬৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৩৭ টাকা। ২০০৮ সালে তার একমাত্র আয় ছিল ব্যবসা থেকে। বছরে তিনি আয় করতেন ৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। আর নির্ভরশীলদের আয় শূন্য থেকে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার ৪৫৪ টাকা। নিজের অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে ১১৮ গুণ, স্ত্রীর ৩৩ গুণ। এবার কৃষি খাত থেকে তার বার্ষিক আয় ৮৫ হাজার ও নির্ভরশীলদের আয় ২১ হাজার টাকা। মাছের ঘের ও স্টক ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় ৮ কোটি ৮৯ লাখ ৯১ হাজার ৬১৮ টাকা ও নির্ভরশীলদের একই খাত থেকে আয় ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া পরিবহন, কনস্ট্রাকশন, ফিলিং ও হারবার সার্ভিস লিমিটেড থেকে তার আয় রয়েছে। পাঁচ বছর আগে তার ব্যাংক হিসাবে মাত্র ২৩ হাজার ২৯৭ টাকা ও স্ত্রীর হিসাবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯২৯ টাকা থাকলেও এবার নিজের ব্যাংক হিসাবে ২৩১ গুণ বেড়ে হয়েছে ৫৩ লাখ ৯৭ হাজার ১২১ টাকা ৩৬ পয়সা ও স্ত্রীর হিসাবে ২৭ গুণ বেড়ে হয়েছে ৩৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৩৫ টাকা ২৯ পয়সা। এ ছাড়া তিনি মধুমতি ব্যাংক লিমিটেডে বিনিয়োগ করেছেন ২০ কোটি টাকা। তার ব্যবসায় আছে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও স্ত্রীর নামে ৮১ লাখ ৮২ হাজার ৬৬৩ টাকা। আগে ছিল যথাক্রমে ২০ হাজার ও ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। বিএসপি ও এফডিআর খাতে আগে কোনো বিনিয়োগ না থাকলেও এবার স্ত্রীর নামে আছে ২ কোটি ৪২ লাখ ৮২ হাজার ৫৬১ টাকা। নিজ নামে কৃষিজমি ৬ হাজার টাকার ও স্ত্রীর নামে ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৮ টাকার। অকৃষি জমি নিজ নামে ৭৯ লাখ ৫২ হাজার ৯১০ টাকার ও স্ত্রীর নামে ৩৩ লাখ ৩১ হাজার ৮০ টাকার। এ ছাড়া নিজ নামে ৯৩ লাখ ৪০ হাজার ৬৬৮ টাকায় তিন কাঠা জমির ওপর একটি দালান রয়েছে তার। ২০০৮ সালে তার কৃষিজমি ছিল মাত্র ৭৬ হাজার টাকার।

হুইপ আ স ম ফিরোজের অস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে বহুগুণে। ২০০৮ সালে ব্যংক হিসাবসহ তার টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার ৮৬৪ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৬০ হাজার ৯৪৫ টাকা। এ ছাড়া গত নির্বাচনের আগে তার মালিকানাধীন গাড়ির বিবরণ অনুযায়ী সম্পত্তির মূল্য ছিল ১০ লাখ ৩০ হাজার টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ ৭৪ হাজার ৫২৯ টাকায়। ২০০৮ সালে স্ত্রীর নামে কোনো নগদ টাকা না থাকলেও বর্তমানে তার স্ত্রীর নামে ব্যাংক হিসাবসহ ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা রয়েছে। এ ছাড়া তার স্ত্রীর নামে ৪০ ভরি স্বর্ণ ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী, আসবাবপত্র রয়েছে। রয়েছে ২০ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট। তবে তার স্থাবর সম্পত্তি কমেছে বলে হলফনামায় দেখিয়েছেন তিনি। ২০০৮ সালে আ স ম ফিরোজের কৃষিজমি ও অকৃষি জমির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৩২ একর ও ১০ কাঠা বললেও এখন তা ১০ কাঠা ও ৮ কাঠা হয়েছে।

জাতীয় সংসদের আরেক হুইপ জামালপুর-৩ আসনের এমপি মির্জা আজমের বর্তমানে নগদ অর্থের পরিমাণ ১৮ লাখ টাকা। ব্যাংকে আছে ১৫ লাখ টাকা। অথচ ২০০৮ সালে তার স্ত্রীর কোনো নগদ টাকা ছিল না। ব্যাংকেও কোনো টাকা ছিল না। স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে স্ত্রীর নামে চার একর জমির মূল্য ৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। মির্জা আজম ও তার স্ত্রীর ২০০৮ সালে সব মিলিয়ে মোট সম্পদ ছিল এক কোটি ৯১ লাখ টাকার। আর এখন সেই সম্পদ বহুগুণ বেড়ে হয়েছে ১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার।

যশোর-৪ আসনের এমপি ও জাতীয় সংসদের হুইপ শেখ আবদুল ওহাব রীতিমত আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। গত পাঁচ বছরে তার সম্পদের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী বর্তমানে তার ও তার স্ত্রীর মোট স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৯৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৬৪ টাকা। অথচ গত পাঁচ বছর আগে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনে দেয়া তার হলফনামায় নিজের ও স্ত্রীর মোট সম্পদ দেখানো হয়েছিল ৩ লাখ ৯৫ হাজার ১২৬ টাকা। সে হিসেবে গত পাঁচ বছরে তার ও তার স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে ৫০ গুণ। এ ছাড়া তার হাতে নগদ টাকা দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং স্ত্রীর হাতে নগদ টাকার পরিমাণ রয়েছে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ব্যাংকে নিজ নামে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৬৫৯ টাকা জমা। ২৭ লাখ ১৬ হাজার টাকা মূল্যের একটি জিপ গাড়ি, নিজ নামে ৭ ভরি ও স্ত্রীর নামে ২৫ ভরি স্বর্ণ উল্লেখ রয়েছে। নিজ নামে রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা মূল্যের টিভি, ৩টি ফ্রিজ ও কম্পিউটার। স্ত্রীর নামে ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ইলেকট্রিকস সামগ্রী। স্থাবর সম্পতিতে নিজ নামে ৩ দশমিক ৬২ একর, স্ত্রীর নামে ৪৭ শতক ও নির্ভরশীল ব্যক্তির নামে ৫৪ শতক কৃষি ও অকৃষি জমি দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া নিজ নামে ১০ কাঠা ও স্ত্রীর নামে ১০ শতক জমি রয়েছে।

জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ ও নির্বাচনকালীন সরকারের রেলপথ ও ধর্মমন্ত্রী মো. মুজিবুল হকের অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ৭৭ লাখ এক হাজার ১৯৫ টাকার একটি গাড়ি আছে। পাঁচ বছর আগে ছিল ৭ লাখ ৮ হাজার টাকার গাড়ি। স্থাবর সম্পদের মধ্যে ৭২ লাখ ৯৩ হাজার ৫৯২ টাকার দুটি দালান রয়েছে। আগে ছিল ২১ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকার একটি দালান। এ ছাড়া ৩০ লাখ টাকা দামের ১০ কাঠার একটি রাজউক প্লট রয়েছে। মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে ৭৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। হুইপ ও মন্ত্রী হিসেবে পারিতোষিক পেয়েছেন ২২ লাখ ২০ হাজার ৮০২ টাকা। পাঁচ বছর আগে আইনি পরামর্শক হিসেবে ৩ লাখ টাকা আয় করেছিলেন।

সূত্রঃ মানব কন্ঠ